সে কথা এখন থাক।
.
২.
সুন্দরবন তখন পার্কটি পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
গড়ের মাঠ জুড়ে ছিল নলখাগড়ার জঙ্গল। সেই জঙ্গলে বুনো শুয়োর হরিণ বিষধর সাপ ময়াল গোখুরো কেউটে। আর ছিল বাঘ। হলুদের ওপর কালো ডোরা কাটা। হেস্টিং সাহেব এই বনে হাতিতে চড়ে বাঘ শিকার করতে এসেছিল। এসব। ইতিহাসের কথা। কিন্তু ইতিহাস নিয়ে বিশদ আলোচনা করা এ গল্পের বিষয়বস্তু নয়।
এ হচ্ছে এক নারী পুরুষের কাহিনী।
চৌধুরীদের ঘটক ঘুরতে ঘুরতে সিংহ বাড়িতে এসে উপস্থিত একদিন। রতিকান্ত তখন ব্রেকফাষ্ট শেষ করে খবরের কাগজ পড়ছিলেন।
ছাতা হাতে ঘটক এসে দাঁড়ালো। মাথায় বড় টিকি শ্বেতচন্দন দিয়ে কপাল লেখা। মাথা নুইয়ে হাতজোড় করে বিনয় বিগলিত কণ্ঠে বললে, একটা নিবেদন ছিল কত্তা।
তখন পর্যন্ত ঘটকদের খাত্রি ছিল। ছেলেমেয়েদের বিয়ের জন্য কাগজে কাগজে বিজ্ঞাপন দেওয়ার রীতি তেমনভাবে চালু হয়নি।
কর্তামশাই রতিকান্ত সিংহ রাশভারী মানুষ। মুখে খুশি প্রকাশ না করলেও তার চোখে খুশির আলো ঝিলিক দিয়ে উঠলো। তার একমাত্র কন্যা নারায়ণীর বিয়ের জন্য তিনি কিঞ্চিৎ উতলা হয়ে উঠছিলেন। মার শরীর ভাল যাচ্ছে না। নাতনীর বিয়ে দেখে যেতে চান। রতিকান্ত মাতৃভক্ত সন্তান। মা-মরা মেয়েটিকে আদরে আল্লদে বড় করে তুলেছেন। কিন্তু বড় করলেই তো হবে না। চাই উপযুক্ত পাত্র।
নারায়ণী যেভাবে বেড়ে উঠেছে সেখানে শাসনের বালাই নেই। শুধুই আদর দিয়ে যাওয়া। দুদিন পর তো শ্বশুর বাড়ি যেতে হবেই। সুতরাং যতটা আদরে। আহলাদে কন্যাকে রাখা যায়।
কর্তা প্রশ্ন করলেন, পাত্র কি করে?
কিছু করার দরকার পড়ে না হুজুর। ফেলে ছড়িয়ে খেলেও সাত পুরুষের বাইরে বেরোতে হবে না চাকরির ধান্দায়।
বসে বসে খেলে কুবেরের ভাণ্ডারও শূন্য হয়ে যায়।
খুব সত্যকথা হুজুর। যে চৌবাচ্চায় জল ঢোকে না সে চৌবাচ্চার জলে চান করা বাসন মাজা করতে গেলে শূন্য তো হবেই। এ চৌবাচ্চার জল ঢোকার নল বেরোনোর নলের চেয়ে বল মোটা। ঘটক হি হি করে হাসতে লাগলো।
রতিকান্ত পার্কটি পাড়ার মানুষ। সাহেব কম্পানিতে বড় চাকরি করেন। মোটা টাকা মাইনে পান। কিন্তু জমানো টাকা বলতে তেমন কিছু নেই। সাহেব সুবোদের সঙ্গে ওঠা বসা, ক্লাব পার্টি এ সবের পেছনে গুচ্ছের টাকা খরচ হয়ে যায়। মেয়ের জন্যেও খরচ বড় কম নয়। মা মরা মেয়েটিকে, তিনি সব দিক দিয়ে আধুনিকা করে গড়ে তুলছেন। শুধু রূপ থাকলেও হয় না চাই শিক্ষা দীক্ষা। লরেটো হাউসে ভর্তি করে দিয়েছে। সাহেবরা দেশ ছেড়ে চলে গেছে কিন্তু সাহেবিয়ানা যায় নি। দেশীবাবুরা এখন সাহেবদের থেকেও বেশী সাহেব। তাদের ইংরেজি বলন চলন যে কোন আসল ইংরেজকেও লজ্জা দিতে পারে। পার্টিতে দেশী সাহেবরা যেভাবে সুটেট বুটেট হয়ে বিলেতি বাজনার তালে তালে মদ খেয়ে নাচে বিলেতি সাহেব তা দেখলে চোখ ছানাবড়া করে তাকিয়ে থাকবে।
নারায়ণীকে এটুকু বয়সে, সবে আঠেরোয় পা দিয়েছে সে, বিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে ছিল না রতিকান্তর। কিন্তু মা জমিদার বংশের ঐতিহ্য নিয়ে এ বাড়ির বৌ হয়ে এসেছিলেন, তখন থেকেই সংসার পরিচালনার ভার নিজের হাতে তুলে নিয়েছিলেন তিনি। রতিকান্তর বাবা ছিলেন নেহাতই গো-বেচারি গোছের মানুষ। সরকারি চাকুরি করতেন। মোটা টাকা মাইনে পেতেন। জীবনপাত করে আপিসের কাজ চালিয়েছেন। আপিস নিয়ে সদা ব্যস্ত এই মানুষটির সংসারের দিকে নজর দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে নি। সংসার জুড়ে রয়েছেন গিন্নী। দশভুজার শক্তি নিয়ে তিনি সংসার পরিচালনা করেছে তারপর সুযোগ্যা পুত্রবধূর হাতে সংসারের ভার তুলে দিয়ে তিনি অবসর নিয়েছে। অবসর নিলেও নিশ্চিন্ত হতে পারেন নি; ক্রমাগত রোগে ভুগতে ভুগতে রতিকান্তর বৌ মারা গেলেন।
মেয়েদের সব বয়সই পুতুল খেলার বয়স।
ঠাম্মা নতুন করে আবার নারায়ণীকে নিয়ে পড়লেন। নাতনী বিলেতি স্কুলে পড়ছে পিয়ানো বাজাচ্ছে, বিটোভেন মোসার্ট। সঙ্গে সঙ্গে মাষ্টার রেখে নাতনীকে গান শেখাচ্ছেন। অতুল প্রসাদ রজনীকান্ত রবীন্দ্র সঙ্গীত। নজরুলের গান। যতদিন শরীরে শক্তি ছিল নারায়ণীকে হাতে ধরে রান্নাও শিখিয়েছেন। তারপর একদিন রতিকান্তকে বললেন, ঘোড়াকে মাঠে নামার উপযুক্ত করে দিলাম। এবার বাজিমাৎ করার দায়িত্ব তোর।
রতিকান্ত মার কথার খোঁচা বুঝতে পারে না। তিনি যে নিয়মিত রেসের মাঠে যান মা সে কথা জানেন। জানলেও ঘোরতর আপত্তি তোলেন না। পুরুষ মানুষের সর্বক্ষণ ঘরমুখী হয়ে থাকা তার পছন্দ নয়। তাঁর স্বামী ছিলেন সুবোধ বালক সম্প্রদায়ভুক্ত। এই অতিভালত্ব তাকে একদিকে যেমন সুখ দিয়েছিল অন্যদিকে মনে মনে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বিদ্রোহিনী। মুখে কোনদিন সেই বিদ্রোহ প্রকাশ না করলেও তিনি চেয়েছিলেন বাবা-দাদাদের মত তার স্বামীও যথার্থ পুরুষ হয়ে উঠুক। কিন্তু নদীর গতিপথ হয়তো বদলানো চলে কিন্তু মানুষের মনের গভীরে যে আর একটা মন আছে সেই মনকে শত চেষ্টা করলেও বশে আনা যায় না। অধিকাংশ সময় সেই মন থাকে ঘুমিয়ে, খোঁচা দিয়ে তাকে জাগাবার চেষ্টা করো, সে হয়তো ক্ষণকালের জন্য জেগে উঠবে কিন্তু তার জীবন স্রোতে পরিবর্তন আসবে না। যদি বা আসে সেই পরিবর্তন হবে ক্ষণস্থায়ী।
