আগে তে-তলা অবদি উঠতে পারতেন হলধর। এখন পায়ে আর সে জোর নেই। এক তলায় ঘুরে বেড়ান আর চাকর ঝিদের ওপর খবরদারি করেন।
সন্ধ্যের আগে নিজের ঘরে ঢুকে যান। বসে থাকেন একটি কিশোরের প্রতীক্ষায়, তেজেন্দ্রনারায়ণ গুটিগুটি ঘরে ঢোকে। তার নির্দিষ্ট চেয়ারে এসে বসে। বলে, গল্প বলল দাদু।
গল্প বলেন হলধর। চৌধুরী বংশের গল্প। কী পরাক্রান্ত ছিলেন তেজেন্দ্র নারায়ণের পূর্বপুরুষেরা।
বিশাল বৈঠকখানায় টাঙানো অয়েলপেন্টিং। কেউ বসেছে সাদা ঘোড়ায় কেউ বা কালো ঘোড়ায়। কেউ বা দাঁড়িয়ে আছেন। মাথায় উষ্ণীষ কোমরে খাপে মোড়া বাঁকা তলোয়ার। ঠোঁট-জোড়া বিরাট গোঁফ।
উদ্ধত দাম্ভিক সব পুরুষ। তেজেন্দ্রনারায়ণের পূর্বপুরুষ।
তুই তোর বাপ দাদার মত হলি না কেন দাদু। এ প্রশ্ন নয়, বৃদ্ধ নায়েবের ক্ষেদ।
বালক তেজেন্দ্র উত্তর দিতে পারে না।
উত্তর তার জানা নেই।
সে বলে, তুমি গল্প বলো দাদু।
তেজেন্দ্র শান্ত ধীর স্থির। সংযত। সে গল্প শুনতে বড় ভালবাসে।
গল্প বলেন হলধর। গভীর মনোযোগ দিয়ে শোনে তেজেন্দ্র।
এত বড় বাড়ি, বলতে গেলে অট্টালিকা। কিন্তু মানুষের সংখ্যা কম। কর্তা মা, গিন্নী ঠাকরুণ এবং বংশের কুলপ্রদীপ তেজেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী। বাকী সবাই কাজের লোক। আর একটি মানুষ হলধর বিশ্বাস। এককালে তাকে বাইরের লোক হিসেবেই ভাবা হতো। এখন তিনি ঘরের মানুষ। বিশ্বস্ত বিচক্ষণ।
বিরাট এক ইতিহাস বহন করে বেড়াচ্ছেন নিজের ন্যুজ পিঠে।
লোকে বলে টাকার কুমীর। সঠিকভাবে কেউ জানে না চৌধুরীদের কত টাকা। জলধর জানেন। যতদিন ক্ষমতা ছিল তিনি একটা অলিকা তৈরী করেছেন। সেই তালিকা কর্তামাকে দিয়েছে। কর্তামা দিয়েছেন পুত্রবধূকে। বিধবা পুত্রবধূ সেটি দিয়েছেন তেজেন্দ্রকে। সে তালিকার ওপর চোখ বুলিয়ে সিন্দুকে তুলে রেখেছে। তা। নিয়ে মাথা ঘামায় নি।
আছে, থাক। ফেলে দেবার মত বস্তু তো নয়। মাথায় নিয়ে নাচানাচি করার মতও কিছু নয়। আদরের ধন আদরেই আছে।
ব্যাঙ্কে, সিন্দুকে, জমিজমায়, ভাড়া-দেওয়া বাড়িতে।
সংসার চলছে নদীর মত। ধীর সংযত শান্ত।
এই শান্ত পরিবেশে তেজেন্দ্র বড় হতে লাগলো। স্কুল থেকে কলেজ। কলেজ থেকে ইউনিভারসিটি। ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশ ভিন্ন ভিন্ন মানুষ। সহপাঠী পাঠিনী। অনেকে ভাব জমাতে এগিয়ে এল। তেজেন্দ্র নির্লিপ্ত। সে সবার সঙ্গে হেসে কথা বলে। পারতপক্ষে কারও মনে আঘাত দেয় না। ছেলেরা বলে দাম্ভিক। মেয়েরা মনে মনে গালপাড়ে, মাকাল ফল একটা। দেখতেই যা। পাখিও এ ফলে ঠোঁট ছোঁয়ায় না।
তেজেন্দ্রর কানে আসে, মেয়েরা তার নাম দিয়েছে, মিষ্টার মাকাল।
সে মনে মনে হাসে। মনের হাসি মুখে প্রকাশ পায় না। যতদিন পর্যন্ত হল বেঁচে ছিলেন মনের কথা হলধরদাদুকে বলতে তেজেন্দ্র। শুধুমাত্র হলধরকেই।
হলধর একদিন কষ্ট করে ওপরে উঠলেন। কর্তামা গত হয়েছেন। গৃহকর্তী এখন তেজেন্দ্রর মা বিভাবতী। তিনি ওপরে থাকেন। নীচে বড় একটা নামেন না। হাঁটুতে ব্যথা। চলাফেরা যা করেন ওপরেই করেন। কর্তা যতদিন বেঁচে ছিলেন তার ছায়ায় বাড়িময় বিচরণ করতেন। চাকর ঝিদের দিয়ে কাজ করাতেন। বাড়িঘর পরিষ্কার করাতেন। রান্নার ঠাকুরকে দরকার মত নির্দেশ দিনে। নিজেও মাঝে মধ্যে হাতা খুন্তি ধরতেন। কর্তা ভোজনবিলাসী ছিলেন। স্ত্রীর হাতের রান্না খেতে তিনি খুব ভালবাসতেন। বিভাবতী ভালবাসতেন তার সুরসিক স্বামীটিকে।
স্বামীর মৃত্যুর পর বিভাবতীর জগৎ আলোশূন্য হয়ে গেল। বাঁচার স্পৃহা তিনি হারিয়ে ফেললেন। কিন্তু মৃত্যু কারও আজ্ঞাবহ ভৃত্য নয় যে ডাকলেই হুজুর বলে ছুঁটে আসবে। তাছাড়াও একটা ব্যাপার আছে তেজেন্দ্রকে একা ফেলে রেখে স্বর্গে গেলেও তার সুখ নেই। একথা তিনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করে নিয়েছিলেন।
সংসার আবার আগের মত চলতে লাগলো। ধীর সংযত শান্ত।
হলধর বললেন, আর দেরী করা ঠিক হবে না বউরানি। শরীরের গতিক ভাল ঠেকছে না আমার। যদি কিছু হয়ে যায় তেজেন্দ্রকে নিয়ে তুমি বিপদে পড়বে। এখনই ওর বিয়ে দেওয়া দরকার। আমি থাকতে থাকতে।
হলধরের কথায় সম্মতি জানানোই বিভাবতীর রীতি। তিনি বললেন, ওর বিয়ের ব্যবস্থা করুন।
ব্যবস্থা করুন বললেই কনে জোগাড় করা যায় না। বিচক্ষণ জলর মন করলেন, তেজেন্দ্রর মধ্যে যে তেজ রয়েছে সেই তেজ বহির্মুখী নয়। সে তেজকে দেখা যায় না। তাকে অনুভব করতে হয়। সুতরাং এমন মেয়ে চাই, যে হবে রূপসী বিদূষী তীক্ষ্ণবুদ্ধি সম্পন্ন। তার মনে থাকবে ভালবাসা। সেই ভালবাসা দিয়ে সে ভরিয়ে তুলবে তেজেন্দ্রর শান্ত নিস্পৃহ মনকে। ভালবাসার তেজে জ্বলে উঠবে তেজেন্দ্র! হলধর খুবই বুদ্ধিমান। জমিদারী কাজে অত্যন্ত বিচক্ষণ। এ সংসারের হিতকামনায় তিনি জীবন পর্যন্ত বিসর্জন দিতে পারেন। বিশেষ করে তেজেন্দ্রর স্বার্থে।
তিনি ঘটক লাগালেন। ঘটক একজন দুজন না ছ’জন। তারা দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়লো। সেরা পাত্রী চাই। রূপে লক্ষ্মী, গুণে সরস্বতী। যদি প্রয়োজন পড়ে গরীব ঘরের মেয়েকে টাকা দিয়ে তুলে আনবেন। শাঁখা সিন্দুরটুকু হলেই চলবে বাদবাকী খরচাপাতি হাতিবাগানের চৌধুরীদের।
হলধরের হিসেবে একটু ভুল ছিল। তিনি কড়ি দিয়ে তেজেন্দ্রর সুখ শান্তি কিনতে চেয়েছিলেন। অর্থ দিয়ে অনেক কিছুই কেনা যায় এ কথা যেমন সত্য কিন্তু তার বাইরে আর একটা বস্তু রয়েছে। সে বস্তুটিকে দেখা যায় না বোঝা যায় না। এমনকি ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুত্বও করা যায় না। মাথার ওপর যিনি রয়েছে, সেই বিধাতা পুরুষটি ভয়ানক রকমের খামখেয়ালি। নাকি তিনি খামখেয়ালীপনা করেন না। আমরা তাঁকে বুঝতে পারি না। চাইও না হয়তো।
