‘গা-টা তেতো-তোতো করছে, জ্বর হবে বোধ হয়।‘
গায়ে হাত দিতে যাচ্ছিল নুরবানু। হাত গুটিয়ে নিল ঝট করে। অমন সোনার অ স্পর্শ করার তার অধিকার নেই।
একেক দিন গহিন রাতে কুরমান যায় নুরবানুর ঘরের দরজায়। নুরবানুর চোখে ঘুম নেই। বেড়ার ফাঁকে চোখ দিয়ে বসে থাকে। বলে, কেন পাগলের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছ? লোকে যে চোর বলবে। চৌকিদার দেখলে চালান দেবে।
‘কবে আসবি?’
‘দফাদার লোক নিয়ে এসেছিল। আসছে জুম্মাবার কলমা পড়বে। তারপরেই তালাক আদায় করে নেব ঠিক। এখন বাড়ি যাও।‘
কোথায় বাড়ি! কুরমানের ইচ্ছে করে পাখিটাকে বুকের উমে করে উড়াল দিয়ে চলে যায় কোথাও! কোথায় তা কে জানে। যেখানে এত প্যাঁচ-ঘোঁচ নেই, যেখানে শুধু দেদার মাঠ দেদার আসমান।
শিগগির বাড়ি যাও, কুরমান চোর, কুরমান পরপুরুষ।
জুম্মাবারে বিয়ে হয়ে গেলো, কিন্তু, কই, শনিবারে তো তালাক নিয়ে চলে এলো না নুরবানু।
যা সে ভেবে রেখেছে তাই হবে। একবার হাতের মুঠোর মধ্যে পেয়ে উকিলদ্দি আর ছেড়ে দেবে না নুরবানুকে। গলা টিপে ধরলেও তার মুখ থেকে বার করানো যাবে না ঐ তিন অক্ষরের তিন কথা। বলবে, মরণ ছাড়া আর কারুর সাধ্য নেই আমাদের বিচ্ছেদ ঘটায়। কুরমান খোঁজ নিতে গেলো। দাবিদারের মতো নয়, দেনদারের মতো।
উকিলদ্দি বললে, আমার কোনো কসুর নেই। বিয়ে হয়েছে তবু নুরবানু এখনো ইস্ত্রী হচ্ছে না। ইস্ত্রী না হলে তালাক হয় কি করে?
যতসব ফাঁকিজুঁকি কথা। তার আসল মতলব হচ্ছে নুরবানুকে রেখে দেবে কবজার মধ্যে। অষ্টঘড়ির বাঁদি করে।
কুরমান দশ-সালিশ বসালো। জানালো তার ফরিয়াদ।
ডাকো উকিলদ্দিকে। জবাব কি তার? কেন এখনো ছাড়ছে না নুরবানুকে? কেন এজাহার খেলাপ করছে?
উকিলদ্দি বললে, বিয়েই এখনো সিদ্ধ হয়নি, ফলন্ত-পাকন্ত হয়নি। এখনো মাটির গাঁথনিই আছে, হয়নি পাকাঁপোক্ত। বিয়ে হয়েছে অথচ এড়িয়ে এড়িয়ে চলছে নুরবানু। ধরাছোঁয়া দিচ্ছে না। শুতে আসছে না দরজায় খিল দিয়ে ভেবেছে কলমা পড়ার পরেই বুঝি ও তালাকের কাবিল হলো। তাই রয়েছে অমন কাঠ হয়ে, বিমুখ হয়ে। এমনি যদি থাকে, তবে কাটান-ছিড়েন হতে পারে কি করে?
সত্যিই তো। দশ-সালিশ রায় দিলো। স্বামীর সঙ্গে একরাত্রিও যদি সংসার না করে তবে বিয়ে জায়েজ হয় কি করে? বিয়ে পোক্ত না হলে তালাক চলে না। হালাল হওয়া চলে না নুরবানুর।
উপায় নেই, হালাল হতে হবে নুরবানুকে। তালাক মেনে নিতে হবে ভিক্ষুকের মতো।
ঘরে ঢুকে দরজায় খিল দিলো নুরবানু।
পরদিন ভোরে পাখিপাখলা ডাকার সঙ্গে সঙ্গেই উকিলদ্দি নুরবানুকে তালাক দিলো।
বিকেলের রোদ উঠোনটুকু থেকে যাই যাই করছে, নুরবানু চলে কুরমানের বাড়িতে। কুরমান বসে আছে দাওয়ার উপর। হাতের মধ্যে হুঁকো ধরা কিন্তু কলকেতে আগুন নেই। কখন যে নিবে গেছে কে জানে। চেয়ে আছে-শুনা মাঠের মতো চাউনি। গায়ের বাঁধন সব ঢিলে হয়ে গেছে, ধস ভেঙে পড়েছে জীবনের। ভাঙন নদীর পারে ছাড়া বাড়ির মতো চেহারা।
যেন চিনি অথচ চিনি না, এমনি চোখে কুরমান তাকালো নুরবানুর দিকে। তার চোখে গত রাতের সুর্মা টানা, ঠোঁটে পান-খাওয়ার শুকনো দাগ। সমস্ত গায়ে যেন ফুর্তির আতর মাখা। পরনে একটা জামরঙের নতুন শাড়ি। পরতে-পরতে যেন খুশির জলের স্রোত।
সে জল বড় ঘোলা। লেগেছে কাদা মাটির ময়লা। পচা দামের জঞ্জাল। মড়ার মাংসের গন্ধ।।
সে জলে আর স্নান করা যায় না।
ইদ্দত আমি এখানেই কারবার করবো। দিন হলেই মোল্লা ডেকে কলমা পড়িয়ে নাও তাড়াতাড়ি। নুরবানু ঘরের দিকে পা বাড়ালো। নেবা হুঁকোয় টান মারতে মারতে কুরমান বললে, ‘না। আমার নিকে-সাদিতে আর মন নেই। তুই ফিরে যা দফাদারের বাড়িতে।‘
পঞ্চম রিপু – শৈলেন রায়
টাকার রং কেমন? সাদা না কালো?
না, টাকার কোন রং নেই। না সাদা না কালো।
টাকা রোমাঞ্চকর এক অনুভূতি। টাকার না আছে পাপ না পুণ্য।
গঙ্গাজলের মত। গরু ছাগল মানুষের গলা-পচা শব ভেসে যায় জলে। নোংরা আবর্জনা সব নিয়ে সাগরসঙ্গমে চলে নদী। চির-পবিত্র চিরনতুন। এই জলে পাপী তাপী পুণ্যাত্মা অবগাহন করে। ঘড়ায় জল ভরে বাড়ি নিয়ে যায়। পান করে। দেবতার পুজোয় লাগায়।
হাতিবাগানে এককালে হাতি কেনাবেচা হতো। রাজারাজড়া জমিদার তালুকদার ব্যবসায়ী সেই হাতি কিনতে। দোল দুর্গোৎসবে হাওদাচড়িয়ে সেই হাতি নিয়ে শোভাযাত্রা করতো।
কলকাতার বাবু কালচার আর নেই।
অনেক সিন্দুক শূন্য হয়ে গেছে। মদ মেয়েমানুষ ভাইয়ে ভাইয়ে মামলা মারামারি কাটাকাটি। মহাকালের কশাঘাতে প্রাসাদের মত বাড়িগুলো ভগ্ন জীর্ণ। ধুকছে।
পুরনো বাড়ি ভেঙে নতুন নতুন বাড়ি তৈরী হচ্ছে। দশ তলা বারো তলা। খোপে খোপে মানুষ। রাস্তাঘাট আলো আর থিকথিকে মানুষ। কলহ বিপদ হৈ হট্টগোল।
সেই কলকাতা আর নেই।
বুক ভেঙে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে তেজেন্দ্রনারায়ণের। এতসব তার জানার কথা। কিন্তু জানে। কিছু বই পড়ে, বেশীর ভাগ বৃদ্ধ নায়েবের মুখ থেকে গল্প শুনে।
সে জমিদারী এখন আর নেই। কিন্তু গল্প আছে।
বৃদ্ধ নায়েব বসে থাকেন আর ঝিমোন। বাড়ির কর্তৃঠাকুরণ, তেজেনের ঠাকুমার হুকুমে আফিমের বরাদ্দ বেড়েছে বৃদ্ধ মানুষটির। কর্তাদের আমলে বহু কাজ করেছেন এখন বিশ্রামের সময়। কিন্তু বিশ্রাম বললেই বিশ্রাম হয় না। যতক্ষণ জেগে থাকেন। লাঠি নিয়ে খুট খুট করে এঘর ওঘর ঘুরে বেড়ান।
