কুরমান দিশেহারার মতো চেঁচিয়ে উঠলো : ‘এক তালাক, দুই তালাক, তিন তালাক-বাইন।
ব্যস, উথল-পাথল বন্ধ হয়ে গেলো মুহূর্তে। সব নিশ্চপ, নিঃশেষ হয়ে গেলো।
রাগ ভুলে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লো কুরমান। হাজার লাঠি পড়লেও এমন চোট লাগতো না। আঁধার দেখতে লাগলো চারদিকে।
নুরবানুর সেই রাগরাঙা মুখ ফুসমন্তরে ছাইয়ের মতো সাদা হয়ে গেলো। ফকির ফতুরের মতো তাকিয়ে রইল ফ্যালফ্যাল করে। আর মাটি থেকে লাঠিটা তুলে নিয়ে চাপা সুখে হাসতে লাগলো উকিলদ্দি।
লোক জমতে শুরু করলো আস্তে-আস্তে।
কুরমান গা ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়লো। বললে নুরবানুকে, ও কিছু হয়নি, চলে যা ঘরের মধ্যে।
সত্যিই যেন কিছু হয়নি, এমনি ভাবেই আঁচল গুটিয়ে চলে গেলো ঘরের মধ্যে, ঘরের বউ-এর মতো।
কিছু হয়নি বললেই আর হয় না। আস্তে আস্তে বসে গেলো দশ-সালিশ। তালাক-দেওয়া স্ত্রী এখন আলগা-আলগোছ মেয়েলোক। তার উপর আর পূর্ব স্বামীর এক্তিয়ার নেই। এক কথায় অমনি আর তাকে সে ঘুরে তুলতে পারে না। বিয়ে ফস্ত হয়ে গেছে, অমনি আর তাকে নেয়া যায় না ফিরতি। অমন হারামি সমাজ বরদাস্ত করতে পারে না।
উকিলদ্দি দাঁত বার করে হাসতে লাগলো।
‘রাগের মাথায় ফস করে কথা বেরিয়ে গেছে মুখের থেকে, অমনি আমার ইস্ত্রি পর হয়ে যাবে?’ কুরমান কেঁদে উঠলো।
পর বলে পর! এপার থেকে ওপার! একবার যখন বিয়ে ছাড়ার ফারখৎ জারি করেছে তখন আর উপায় নেই। ঘুড়ি কাটা পড়লে নাটাই গুটিয়ে কি ঘুড়িকে ধরে আনা যায়?
‘মুখের কথাটাই বড়ো হবে? মন দেখবে না কেউ?’
মুখের জবানের দাম কি কম? রঙ-তামাশা করে বললেও তালাক তালাক। আর এ-তো জল-জীওস্ত রাগের কথা, গলা দরাজ করে দিন-দুপুরে তালাক দেওয়া।
‘আর দস্তুরমতো সাক্ষী রেখে।‘ ফোড়ন দিল উকিলদ্দি।
‘এখন উপায়? নুরবানুকে আমি ফিরে পাবো না?’
এক উপায় আছে। দশ-সালিশ বসলো ফরমান দিতে। ইদ্দতরে পর কেউ যদি নুরবানুকে বিয়ে করে তালাক দেয় তবেই ফের কুরমান নিকে করতে পারে তাকে। এ ছাড়া আর কুরমানের পথ নেই।
কে বিয়ে করবে? কুরমানকে ফিরিয়ে দেবার জন্যে কে বিয়ে করবে নুরবানুকে? আর কে! দাড়িতে হাত বুলুতে বুলুতে উকিলদ্দি বললে, আমি বিয়ে করবো।
কিন্তু বিয়ে করেই তক্ষুনি-তক্ষুনি তালাক দিতে হবে। কথার খেলাপ করলে চলবে না। দশ সালিশের হুকুম মানতে হবে। এর মধ্যে আছে খাদেম-ইমাম, মোন্না মুনশী, ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট, মানী-গুণী লোক সব। এদেরকে অমান্য করা যাবে না।
একটু যেন বল পেলো কুরমান। কিন্তু তার বাড়িতে থাকতে পারবে না আর নুরবানু। বিরানা পর-পুরুষের ঘরে কি করে থাকতে পারে সমৰ্থ বয়সের মেয়েছেলে? পাশ-গাঁয়ে তার এক চাচা তাছে, বেচারী নাচার, সেখানে সে থাকবে। ইদ্দতের তিন মাস।
এক কাপড়ে কাঁদতে কাঁদতে চলে গেলো নুরবানু। যেন কুরমানকে গোর দেওয়া হয়েছে। পুঁতে রেখেছে মাটির নিচে।
তাছাড়া আর কি? কুরমানের হাতের নাগালের মধ্যে দিয়ে চলে গেলো, লু হাত বাড়িয়ে তাকে সে ধরে রাখতে পারলো না।।
সামান্য ক’টা মুখের কথা এমনি করে সব নাস্তানাবুদ করে দিতে পারে এ কে জানতো! কুরমানের নিজের রাগ নিজেকে যেন কুরে কুরে খাচ্ছে।
দাউল হয়ে কুরমান চলে গেলো দক্ষিণে। নুরবানু ছাড়া তার আর ঘরদুয়ার কি! ঘরের উইয়ে খাওয়া পাটঘড়ির বেড়া ভেঙে-ভেঙে পড়ছে, তেমনি ভেঙে-ভেঙে পড়ছে। তার বুকের পাঁজরা। চলে গেছে দক্ষিণে, কিন্তু মন কেবল উত্তরে ভেসে-ভেসে বেড়ায়।
ধান কাটা সারা হয়ে গেছে, নিজের গাঁয়ে ফিরে আসে কুরমান। গাঁয়ের হালট ধরে নিজের বাড়িতে। ঘরের ঝাপ খোলে। কোথায় নুরবানু? চৈতী মাঠের মতো বুকের ভিতরটা খাঁ-খাঁ করে। কিন্তু রাত করে লুকিয়ে একদিন আসে নুরবানু। যেন একটা অন্যায় করছে এমনি চেহারায়। কুরমানের থেকে অনেক দূরে সরে বসে আঁচলে চোখ চাপা দিয়ে কাঁদে।
কুরমান বুঝি ঝাঁপিয়ে ধরতে চায় নুরবানুকে। ইচ্ছে করে কোলের কাছে বসিয়ে হাত দিয়ে চোখে জল মুছে দেয়।
নুরবানু বলে, না। এখনো হালাল হইনি। ইদ্দত কাবার হয়নি। হয়নি ফিরতি বিয়ে, ফিরতি তালাক।
বলে ‘তোমাকে শুধু একবার দেখতে এলাম। বড়ো মন কেমন করে।‘
বড়ো কাহিল হয়ে গেছে নুরবানু। বড়ো মন-মরা। গায়ের রঙ তামাটে হয়ে গেছে। জোর-জুলুস মুছে গেছে গা থেকে।
এটা-ওটা একটু-আধটু গোছগাছ করে দেয় নুরবানু। ঘরের মধ্যে নড়ে-চড়ে। ‘তোকে কি আর ফিরে পাবো নুরু?’
‘নিশ্চয়ই পাবে। দশ-সালিশের বৈঠকে চুক্তি হয়েছে, কড়ায় ক্রান্তিতে সব আদায়-উশুল হয়ে যাবে। চোখ বুজে এক ডুবে মাঝখানের এই কয়েকটা দিন শুধু কাটিয়ে দেওয়া।‘
‘আমার কি মনে হয় জানিস? ও তোকে আর ছাড়বে না। একবার কলমা পড়া হয়ে গেলেই ও ওর মুখে কুলুপ এঁটে দেবে। বলবে, দেব না তালাক।’
‘ইস!’ নুরবানু ফণা তুলে ফেঁস করে উঠলো : ‘দশ-সালিস ওকে ছাড়বে কেন?
না ছাড়লেই কি, ও পষ্ট গরকবুল করবে। এ নিয়ে তো আর আদালত চলবে। বলবে, কার সাধ্য জোর করে আমাকে দিয়ে তালাক দেওয়ায়।
‘ইস, করুক দেখি তো এমন বেইমানি।‘ আবার ফেঁস করে ওঠে নুরবানু : ‘বেতমিজকে তখন বিষ খাইয়ে শেষ করব। ওর বিষয়ের অংশ নিয়ে এসে সাদি করব তোমাকে।‘
নুরবানুর চোখে কত বিশ্বাস আর স্নেহ।
