বিবির চোখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, ওরও চোখমুখ লাল হয়ে যাচ্ছে। ওর সঙ্গে আমার এমন সম্পর্ক না, যে, এই নিয়ে একটু ঠাট্টা করতে পারি। কেমন অস্বস্তি বোধ করছিলো, আইসক্রিম খাওয়া হতে বললো, “চলেন, স্যার, যাই’। বাধ্য হয়ে উঠতে হলো আমাকে।
৮.
শুয়ে আছি। দেখি, রান্নাঘরের কাজের ফাঁকে ঘরে এলো মিনা, এরকম মাঝে-মাঝে আসে, আঁচল হলদে দাগ, আধ-ময়লা, মুখ ঘামে তেলতেলে, চুল রুখু। খুটখাট করে কী কাজ করে ঘরের মধ্যে। একবার দেখে আমি আবার বই-এর মধ্যে ডুবে যাই।
ও, এই শোনো, একদম ভুলে গিছলাম, গা ঘেঁষে বসলো খাটে, আমার পাশে। আচ্ছা, সত্যি করে একটা কথা বলবে?
বলো না।
ঠিক বলবে কি না, বলো–
আহা, তুমি দেখছি একেবারে প্রেমিকার মতো গা ঘেঁষে আদুরে গলায়–
সঙ্গে সঙ্গে ছিটকে বেরিয়ে গেলো। বুঝতে পারলাম, আমার বলা উচিত হয় নি। সত্যি, আমিই না কতো মধুভাষী বিবির কাছে। কী যেন কেন, মিনার সঙ্গে কথা বলতে গেলেই স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়, ভেতরের বিরক্তি আর অনীহা চেপে বসে কথায়, কথায় সুরে। অবৈধ সঙ্গম ছাড়া সুখ নেই? নিজেরই খারাপ লাগে শেষে, গ্লানি হয়। তখন বারবার খোশামোদ করি আবার। উঠে গিয়ে মিনাকে কাছে এনে বসাই।
শেষে নরম হয় মিনা, স্বাভাবিক হয়, হাসিখুশি মুখে বলে, আচ্ছা, ডালিয়া মেয়েটি কে সত্যি করে বলবে আমাকে? চোখেমুখে কৌতুক আর কৌতূহলের দ্যুতি ঠিকরে পড়ে মিনার।
বসন্তের ছুরি এসে পৃথিবীর মমতলে বিধলে তার যে চিৎকার জ্বলে ওঠে পলাশে আর কৃষ্ণচূড়ায় তেমনি আমূল রক্তিম চমকে উঠি। মুখে ঠিক হাসি টানতে পারি না, কে–কই আমি তো চিনি না!
নাহ, চেনে না— মেয়েলি ভঙ্গিতে হেসে ওঠে মিনা, ঘুমের মধ্যে ডালিয়া ডালিয়া বলে সে কী দীর্ঘশ্বাস!
যাহ! কী বলো! ভেতরে-ভেতরে অবাক হচ্ছিলাম, এখন বুঝলাম কী করে নাম জানলো মিনা, কিন্তু লজ্জায় আমার মুখ-চোখ লাল হয়ে যায়। হাসিতে ভেঙ্গে পড়ে মিনা রক্তোচ্ছাসে সোনালি ফরসা মুখ ভরে যায় ওর, ওকে এমন হাসতে কোনোদিন দেখি নে, গভীর হাসতে হাসতে চোখে পানি এনে ফ্যালে। শল্যবিদ্ধ আমি মুগ্ধ তাকিয়ে থাকি।
৯.
ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে স্টাডি ট্যুরে গতবছর গিয়েছিলাম কক্সবাজারে। একদিন হুহু বাতাসে একজনের ডাকনাম রেখে দিয়েছিলাম। সবার অজ্ঞাতে একদিন বালির ওপর একজনের ডাকনাম লিখেছিলাম ওরই চোখের মতো বড় বড় হরফে। একদিন সারারাত সমুদ্রমেশিন শুধু একজনের ডাকনাম বুনে গিয়েছিলো— মোটেলে বিশাল কক্ষে নিদ্রাহীন নিশা ব্যেপে তার শব্দ শুনেছিলাম। একদিন বনঝাউ-এর বীজ-এর মতো আমার সমস্ত সৈকত ধরে উড়ে-উড়ে গিয়ে পড়েছিলো একটি নাম।
১০.
রাতে, কারফিউ শুরু হওয়ার আগে-আগে ফিরি আড্ডা দিয়ে। আমরা কজন কবিবন্ধু শক্রর অধিক বন্ধু শস্তা রেস্তোরাঁকে মাৎ করে, কাপের পর কাপ চা খেয়ে, ফিরি রোজ রাতে যতোটা রাত করা যায়। ঘুরেঘুরে আসে বিদেশি কটি নাম, বাঙালি কটি নাম, শব্দশাস্ত্র, ছন্দশাস্ত্র গভীর মন্থন করা চলে। ফিরি যখন, শেষ বসন্তের হাওয়া চলছে রাস্তায় রাস্তায়, ছেঁড়া পাতা:আর ঝরা পাতা আর ছেঁড়া কাগজ আর টুকরো চাঁদ ফাঁকা রাস্তায় রাস্তায় বেজে ওঠে নর্তকীর মতো। আমার কানে পাওয়ার হাউসের স্বর ময়ূরের পালকের মতো খুঁজে আছে। আমার কণ্ঠে কবিতার দুটি পঙক্তি বারবার আবৃত্ত হয় : তোমাকে আমার চাই ক্রমাগত অসিত কুকুর। ভিতরে কাঁদে রৌদ্রের অধিক পূর্ণিমায়।
সারা বাড়ি ঘুমিয়ে পড়েছে। দরোজা খুলে দ্যায় কাজের মেয়েটি। অকারণে হাসে কেন-যেন। যেন একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম আমি, মাঝে-মাঝে মদ্যপান করে বাড়ি ফিরলে পা যেমন টলটল করে, সমস্ত চেনা যেমন টলমল করে, মাথায় ভিতরে যেমন ভূমিকম্প হয়, আস্তে-আস্তে কবিতার লাইন যেমন অনন্ত থেকে চলে আসে, মুঠোর মধ্যে সূর্য, কন্ঠে চাঁদ— তেমনি, আশ্চর্য, মদ না খেয়েই যেন কী একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম। যেন আবৃত্ত হতে-হতে তোমাকে আমার চাই ক্রমাগত অসিত কুকুর / ভিতরে আমার কাঁদে রৌদ্রের অধিক পূর্ণিমায়, এই লাইন দুটি পরিণত হয়েছিলো এক গভীর ইদারায়, যার ভিতরে লাফ দিয়ে পড়ার জন্য তৈরি হচ্ছিলাম আমি। মেয়েটার হাসি যেন সেই ইদারার মুখ মুহূর্তে বুজিয়ে দ্যায়, মুহূর্তে বাস্তবে ফিরে আসি। আশ্চর্য, মেয়েটাকে কোনোদিন ভালো করে দেখি নি। এখন আশ্চর্য হয়ে। দেখি ঈশ্বর-রচিত এক প্রাকৃতিক ভাস্কর্য : ফুলকপির মতো স্তন, বাঁধাকপির মতো পাছা। কবিতার শব্দগুলি যেন ঘাসের মধ্যে এদিক-ওদিক নিঃশব্দে লুকিয়ে পড়ে। আমি নিজের ঘরের উদ্দেশে চলে যাই।
১১.
রাত্রিবেলা জেগে ওঠে আমার ঘর— নিঃশব্দায়মান। টেবিল ল্যাম্পের আলোর বলয়ে এসে বসতে না বসতেই কোত্থেকে চলে আসে মায়াবীর মতো জাদুবলে চারটি নিবিড় পঙক্তি :
‘তোমাকে আমার চাই’ ক্রমাগত অসিত কুক্কুর
ভিতরে আমার কাঁদে রৌদ্রের অধিক পূর্ণিমায় :
‘তোমাকে আমার চাই’ এই কান্না রাত্রিনীলিমায়
স্বপ্নে চড়ে ঘুরে-ঘুরে উঠে যায় দূর–বহুদূরে।
লাইনগুলি লিখে ফেলতে দেরি হয় না আমার।
সব বদলে যায় রাত্রিবেলা। ফ্যান ঘুরছে না তো, যেন মনে হচ্ছে গলায় দড়ি বাঁধা হরিণের ক্রমচক্কর। ব্রা-খোলা মিনার স্তন দুটি বাল্বের মতো দীপ্যমান, তার আলো একটা নীলাভকালো গোলাপের পাপড়ির ওপর পড়ে থাকে। আমার ঘরের সবুজ ডিসটেম্পার করা দেয়াল দেখে মনে হয় যে আমি দোতলা অরণ্যশিবিরে আছি। যেন ওআর্ডরোব দুটি ডানা মেলে উড়ে যেতে চায় বিশাল প্রাচীনকালের পাখির মতো। ছাদের ওপর বাতাসে পাতা গড়িয়ে যাওয়ার আওয়াজ বাজে নাচিয়ে মেয়ের পদসঞ্চালনের অতিদ্রুত বৃষ্টির মতো।
