কিন্তু একি! হাটের থেকে তার জন্যে চুড়ি নিয়ে এসেছে কুরমান। লঙ্কা-পেঁয়াজ তামাক-টিকে না এনে। লজ্জায় গলে যেতে লাগলো নুরবানু।
পাঁচ আঙুলের মুখ একসঙ্গে ঘুচলো করে চেপে ধরে কুরমান! টিপে টিপে আস্তে আস্তে চুড়ি পরিয়ে দেয়। হঠাৎ রাগে মাথা ঘুরে গিয়েছিলো তার। নইলে এমন যার তুকতুকে হাত তার গায়ে সে হাত তোলে কি করে?
‘তুমি কেন মিছিমিছি বাজে খরচ করতে গেলে? এদিকে তোমার একটা ভালো গামছা নেই লুঙ্গিটা ছিঁড়ে গেছে।‘
‘যাক সব ছিঁড়ে-ফেড়ে। তুই শুধু একবারটি হাস আমার মুখের দিকে চেয়ে।‘
পিঠে চুলগুলি খোল পড়ে আছে ভুর করে।
‘তোর চুল বাঁধা দেখিনি কোনোদিন–,
আজ শুধু দেখে না কুরমান, শোনেও। শোনে চুল বাঁধার সঙ্গে সঙ্গে চুড়ির ঠুন-ঠুন।
উকিলদ্দির বাড়িতে তবু না গেলেই নয় নুরবানুর। চারটে টাকা কি কম? কম কি এক বেলার খোরাকি? ধান-পান যদি পায় ভবিষ্যৎ, তাই কি অগ্রাহ্য করবার?
কিন্তু সেদিন নুরবানু উকিলদ্দির বাড়ি থেকে নতুন সাড়ি পরে এলো। ফলসা রঙের শাড়ি। নুরবানুর বর্ণ যেন ফুটে বেরুচ্ছে।
‘এ শাড়ি এলো কোত্থেকে?’ বর্শার মুখের মতো চোখা হয়ে উঠলো কুরমান।
‘আজ যে ঈদ খেয়াল নেই তোমার? ঈদের দিনে মুনিব-গিন্নী দিয়েছে শাড়িখানা।
ঈদের দিন হলেও নরম পড়লো না কুরমান। ফিরনি-পায়েসের ছিটেফোঁটাও নেই, নতুন একখানা গামছা হয় না, ঈদ কোথায়?
না, নরম পড়লো না কুরমান। শাড়ির প্রত্যেকটি সুতোয় দেখতে পাচ্ছে সে উকিলদ্দির ঘোলা চোখ, ঘষা জিভ। ফাঁই ফাঁই করে সে শাড়িটা ছিঁড়ে ফেললো।
এবার আর সে হাটে গেলো না পালটা শাড়ি কিনে আনতে। পয়সা নেই, ইচ্ছেও নেই। ক্ষুদ্র চাষা, তার বউয়ের আবার সাইবানী হবার সখ কেন? চট মুড়ি দিয়ে থাকতে পারে না সে ঘরের কোণে?
সত্যি, এতো সাজ তার পক্ষে অসাজস্ত ছিল। বুঝতে দেরি হয় না নুরবানুর। কিন্তু তখন কি সে বুঝতে পেরেছে শাড়ির ভাঁজে ভাঁজে সাপ রয়েছে লুকিয়ে? গা বেয়ে বেয়ে শেষকালে বুকের মধ্যে ছোবল মারবে? নুরবানু তার কালো ফুলের ছাপ মারা কালো শাড়িই পরে এবার। তার রাত্রে এ নিরিবিলি শান্তির মতোই এ শাড়িখানা। তাই ঘুমের স্রোতে স্বচ্ছন্দে চলে আসতে পারে সে স্বামীর স্পর্শের ঘেরের মধ্যে। ফলসা রঙের শাড়িটার জন্যে তার এতটুকুও কষ্ট নেই।
কুরমান কাজ থেকে ছাড়িয়ে আনলো নুরবানুকে। নিয়ে এলো পর্দার হেপাজতে। উপাসে-তিয়াসে কাটবে বু পাপের পথের পাশ দিয়ে হাঁটবে না। দারিদ্র্য লাগুক গায়ে, তবু অধর্ম যেন না লাগে। অদিন এলেও যেন না অমানুষ বনে যায়।
কিন্তু উকিলদ্দি ছিনে-জোঁক। বয়স হয়েছে কিন্তু বিবেচনা নেই।
ধান কাটতে মাঠে গিয়েছে কুরমান। লক্ষ্মীবিলাস ধান কাটবার দিন এখন। পা টিপে টিপে দুপুরবেলা উকিলদ্দি এসে হাজির। কানের জন্যে ঝুমকো, পায়ের জন্যে পঞ্চম, গলার জন্যে দানাকবজ নিয়ে এসেছে গড়িয়ে।
বললে, কই গো বিবিজান। দেখো এসে কী এনেছি।
বেরিয়ে আসতে নুরবানুর চক্ষু স্থির। রুপোর জেওর দেখে নয়, চোখের উপরে বাঘ দেখে।
অনেক ভয়-ডর নুরবানুর। এক নম্বর মালেক, দুই নম্বর মুনিব। তিন নম্বর দফাদার। চার নম্বর একটা মাংসখেকো জানোয়ার।
‘চলে যান এখান থেকে।‘ চোখে মুখে আঁচ ফুটিয়ে ঝাপসা গলায় বললে নুরবানু।
‘তোমার জন্যে লবেজান হয়ে আছি। এই দেখো, জেওর এনেছি গড়িয়ে।‘
‘দরকার নেই। আপনি চলে যান। নইলে সোর তুলবো এখুনি।‘
কিন্তু সোর তুলবার আগেই কুরমান এসে হাজির।
রোদে সে তেতে-পুড়ে এসেছে, চোখে ঘোলা পড়েছে বোধ হয়। নইলে দেখছে সে কী তার বাড়ির উঠোনে? উকিলদ্দির হাতে রুপোর গয়না আর নুরবানুর চোখে খুশির ঝলকানি, কত না জানি ঠাট্টাবটকেরা, কতো না জানি হাসির বুজরুকি। রঙ সঙ আমোদ-বিনোদ। এই গয়নাতে কত না জানি যোগসাজসের শর্ত।
মাথায় খুন চেপে গেলো কুরমানের, চারপাশে চেয়ে দেখলো সে অসহায়ের মতো। দেখলো ধানের আঁটির সঙ্গে কাচি সে ফেলে এসেছে মাঠে।
‘এখানে কেন?’
ধানাই-পানাই করতে লাগলো উকিলদ্দি। শেষকালে বললে, লক্ষ্মীবিলাস ধান কাটাত গিয়েছিস কিনা দেখতে এসেছিলাম।
‘তা মাঠে না গিয়ে আমরা বাড়ির অন্দরে কেন?’
‘বেশ করেছি। সমস্ত জায়গা-জমি সদর-অন্দর আমার, আমার যেখানে খুশি আমি যাবো আসবো।‘
কুরমান হঠাৎ উকিলদ্দির দাড়ি চেপে ধরলো। লাগলো ঝটাপটি, ধস্তাধস্তি। উকিলদ্দির হাতে যে লাঠী ছিল দেখেনি কুরমান। তা ছাড়া কুরমান আধপেটা খাওয়া চাষা, জোর জেল্লা নেই শরীরে সেটাও সে বিচার করে দেখেনি। উকিলদ্দি তাকে ধাক্কা মেরে ফেলেতো দিলই, তুলে নিল লাঠিগাছটা।।
কুরমানকে দেখেই ঘরের মধ্যে লুকিয়েছিল নুরবানু। এখন মারমুখো লাঠি দেখে। বেরিয়ে এলো সে হন্তদন্ত হয়ে, শিরে পাখির মতো ঝাঁপিয়ে পড়লো উকিলদ্দির উপর। লাঠিটা ছিনিয়ে নিতে চেষ্টা করলো জোর করে। মুঠো আলগা করতে পারে না। শুধু শুরু হয় লটপাট।
কি চোখে দেখলো ব্যাপারটা কে জানে কুরমানের রক্তের মধ্যে ঝড় বয়ে গেলো। এক ঝটকায় টেনে আনতে গেলে নুরবানুকে চুলের কুঁটি ধরে : ‘তুই, তুই কেন বেরিয়ে এসেছিল পর্দার বাইরে। কেন পর-পুরুষের সঙ্গে জাপটাজাপটি শুরু করে দিয়েছিস?’ উকিলদ্দিকে রেখে মারতে গেলে সে নুরবানুকে।
আর যেমনি এলো এগিয়ে, হাতের নাগালের মধ্যে, অমনি উকিলদ্দির লাঠি পড়লো কুরমানের মাথায়। মনে হলো নুরবানুই যেন লাঠি মারলো। মনে হলো কুরমানের মারের থেকে উকিলদ্দিকে বাঁচাবার জন্যেই তার এই জোটপাট। উকিলদ্দির গায়ে পড়ে তাই এত সাধ্য সাধনা।
