আনিস বলল, আমার কোলে একটু দাও তো পরী। আরে আরে মেয়ের একটা দাঁত উঠেছে দেখছি। কি কাণ্ড। ও টুকুন, ও জরী, একটু হাস তো মা। ও সোনামণি, দেখি তোমার দাঁতটা?
টুকুন তারস্বরে চেঁচাতে লাগলো। তাই দেখে আনিস ও পরী দু’জনেই হাসতে লাগল।
আমার জরী সোনা কথা শিখছে নাকি, পরী?
হুঁ। মা বলতে পারে। আর পাখি দেখলে বলে ফা ফা।
আনিস হো হো করে হেসে উঠল—যেন ভীষণ একটা হাসির কথা। হাসি থামলে বলল, আমার জরী তোমার চেয়েও সুন্দর হবে। তাই না পরী?
আমি আবার সুন্দর নাকি?
না, তুমি ভীষণ বিশ্রী।
আনিস আবার হেসে উঠল। তার একটু পরেই বাইরে কাক ডাকতে লাগল। আনিসের বাবার গলার আওয়াজ পাওয়া গেল। ও আনিস, ও আনিস।
জি আব্বা।
এখন রওনা না দিলে ট্রেন ধরতে পারবি না বাবা।
আনিস টুকুনকে শুইয়ে দিল বিছানায়। পরী কোন কথা বলল না। আনিস বাইরে বেরিয়ে দেখল চাঁদ হেলে পড়েছে। জ্যোৎস্না ফিকে হয়ে এসেছে। বিদায়ের আয়োজন শুরু হল। ঘুমন্ত বুনুকে আবার ঘুম থেকে টেনে তোলা হল। সে হঠাৎ বলে ফেলল, ভাবী আজ বিয়ের শাড়ী পরেছে কেন?
কেউ তার কথার কোন জবাব দিল না। মানুষের সুখ-দুঃখের সাথি আকাশের চাঁদ। পরীকে অহেতুক লজ্জা থেকে বাঁচানোর জন্যেই হয়তো একখণ্ড বিশাল মেঘের আড়ালে তার সকল জ্যোৎস্না লুকিয়ে ফেলল।
লম্বা লম্বা পা ফেলে এগিয়ে চলল আনিস। শেষ রাতের ট্রেনটা যেন কিছুতেই মিস না হয়।
নুরবানু – অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
কুরমান হাটে কাঁচের চুড়ি কিনতে এসেছে।
মেজাজ খুব খারাপ। গা এখনো কশকশ করছে। তবু এ-দোকান থেকে ও দোকানে সে ঘোরাঘুরি করে। সোনালী কিনবে না বেগুনী কিনবে চট করে ঠাওর করতে পারে না।
অন্যদিন হাটে এসে তামাক কিনতো, লঙ্কা-পেঁয়াজ কিনতো, তিত-পুঁটি বা ঘুসো চিংড়ি। আজ তাকে কাঁচের চুড়ি কিনতে হচ্ছে। কিনতে হচ্ছে চুলের ফিতে।।
চুড়ির সোয়া তিন আঙুল জোখা। চুড়ির মধ্যে হাত ঢুকিয়ে-ঢুকিয়ে দেখে কুরমান। জোখা মেলে তো রঙ পছন্দ হয় না, রঙ মনে ধরে তো জোখায় গরমিল।
নুরবানুর কাঁচের চুড়ি সে আজ ভেঙে দিয়ে এসেছে। ফিতে ধরে টানতে গিয়ে খুলে দিয়েছে চুলের খোঁপা। চোট-জখম লেগেছে হয়তো এখানে-ওখানে।
জমি-জায়গা নেই, কর-কবুলত নেই, বর্ষায় চাষ করে কুরমান। তাও লাঙল কিনে আনতে হয় পরের থেকে। ধান-যা-ও হয়েছিল গত সন, পাখিতে খেয়ে নিয়েছে, খেয়ে নিয়েছে ইঁদুরে। এ বছর গাছ হয়েছে তো শিষ হয়নি। ডোবা জমি, নোনা কাটে না ভালো করে। যা ধান হয়েছে দলামলা করে মনিবের খাস খামারে তুলে দিয়ে আসতে হবে। সে পাবে মোটে তিন ভাগের এক ভাগ।
বড়ো দুর্বল অবস্থা তাদের। না আছে থান না আছে থিত। তাই কুরমানের একার খাটনিতে চলে না। নুরবানুকেও কাজ করতে হয়।
নুরবানু মনিবের বাড়িতে ধান ভানে, পাট গুটোয়, কথা কাপড় কাচে, জল টানে। আর মনিব গিন্নীর খেজমত করে। চুল বাছে, গা খোঁটে, তেল মাখে। ভালো মন্দ খেতে পায় মাঝে-মাঝে। দরমা পায় চার টাকা!
কিন্তু শান্তি নেই। মনিব উকিলদ্দি দফাদার, নুরবানুকে অন্যায় চোখে দেখেছে।
প্রথম দিনেই নালিশ করেছিল নুরবানু : মুনিব আমাকে অন্যায় চোখে দেখে।
‘কেন কি করে?’
‘খুক খুক করে কাশে, বাঁকা চোখে তাকায়, আমোদ-সামোদ করে কথা কয়।‘
‘তুই ওর ধারাধারি যাসনে কোনদিন।‘
‘না, আমি ঘোমটা টেনে চলে যাই দূর দিয়ে।‘
কিন্তু দফাদার তাতে ক্ষান্ত হয়নি। একদিন নুরবানুর হাত চেপে ধরলো। সেদিনও কাঁদতে কাঁদতে নুরবানু বললে, হাত ছাড়িয়ে নেবার সময়ে খামচে দিয়েছে।
রাগে শরীরের রগগুলো টান হয়ে উঠলো কুরমানের। বললে, তুই সামনে গেছিলি কেন?
‘কে বললে? যাইনি তো সামনে।‘
‘সামনে যাসনি তো হাত চেপে ধরে কি করে?’
‘আমি ছিলাম টেকি-ঘরে। ও ঘরে ঢুকে বললে, বীজ আছে ককাটি? আমি পালিয়ে যাচ্ছি পাছ দুয়ার দিয়ে, ও খপ করে আমার হাত চেরে ধরলো।
তবু সেদিনও সে মারেনি নুরবানুকে। নিজের অদৃষ্টকেই দোষ দিয়েছিল।
আশ্চর্য গরিবের বউ-এর কি একটু স্নও থাকতে পারবে না? গরিব বলে স্ত্রীর বেলায়ও কি তাদের অনুভব আর উপভোগের মাত্রাটা নামিয়ে আনতে হবে?
‘খবরদার, সামনে যাবি না ওর। ওরা জোরমন্ত লোক, থানা-পুলিস সব ওদের হাতে, ওদের অনেকদূর দিয়ে আমাদের হাঁটা চলা। কাজ কাম সেরে ঝপ করে চলে আসবি।’
কিন্তু আজ ওর হাত-ভরা কাঁচের চুড়ি। ফিতে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বিনুনি পাকানো।
হাসিতে ভেসে যাচ্ছিল নুরবানু, কুরমানের মুখের চেহারা দেখে ঝিম মেরে লো।
‘এব কোত্থেকে?’
‘মুনিব গিন্নী দিয়েছে।‘
কিন্তু জিগেস করি, পয়সা কার? এ সাজানোর পেছনে কার চোখের সায় রয়েছে লুকিয়ে? আজ কাঁচের চুড়ি, কাল আংটি-চুংটি। নোনা জমি এমনি করেই আস্তে আস্তে মিঠেন করে তুলবে। হাত ধরেছিল, ধরবে এবার গলা জড়িয়ে।
‘খুলে ফেল শিগগির।’ গর্জে উঠলো কুরমান।
সাজবার ভারী সখ নুরবানুর। একটু সে হয়তো টাল মাতাল করেছিল, কুরমান হাত ধরে হেঁচকা টান মারলো। পট পট করে ভেঙে গেলো কতগুলি। হেঁচকা টান মারলো খোঁপায়। একটা কুণ্ডলী পাকানো সাপ কিলবিল করে উঠলো।
ডুকরে কেঁদে উঠলো নুরবানু। চুরি ধারে জায়গায় জায়গায় হাত কেটে গিয়েছে। চামড়া ছিঁড়ে বেরিয়ে এসেছে রক্ত।
ঘরের পুরুষের এমন দুর্দান্ত চেহারা দেখেনি সে আর কোনদিন। বাবা, ভয় করে। দরকার নেই তার চুড়ি-খাড়ুতে, কিষাণের বউ সে, ঠুটো পাথর হয়ে থাকবে। সাধ-আমোদে তার দরকার কি।
