পরী মৃদুস্বরে বলল, দুই জায়গায় খরচ চালানো কি সহজকথা? অল্প কটা টাকা পায়। চা হয়ে গেছে, নিয়ে যা রে রুনু।
রুনু চা নিয়ে এসে দেখে তার বিয়ে নিয়েই আলাপ হচ্ছে। বাবা বলছে, ছেলে হল তোমার বি.এ. ফেল। তবে এবার প্রাইভেট দিচ্ছে। বংশটংশ খুবই ভাল। ছেলের এক মামা ময়মনসিংহে ওকালতি করেন। তাকে এক ডাকে সবাই চিনে।
আনিসের মা বলছেন, ছেলে দেখতে-শুনতে খারাপ না রঙটা একটু মাজা। পুরুষ মানুষের ফর্সা রঙ কি আর ভাল? ভাল না।
আনিস বলল, রুনুর পছন্দ হয়েছে তো? তার পছন্দ হলে আর আপত্তি কি?
পাশের বাড়ি থেকে আনিসের ছোট চাচা এসেছেন খবর পেয়ে। তিনি বললেন, রুনুর আবার পছন্দ-অপছন্দ কি? আমাদের পছন্দ নিয়ে কথা।
আনিস রুনুর দিকে তাকিয়ে হাসল। লজ্জা পেয়ে রুনু চলে এল রান্নাঘরে।
আনিসের বাবা বললেন, কাল বিকালে না হয় ছেলেটাকে খবর দিয়ে আনি। তুই দেখ।
কাল বিকাল পর্যন্ত তো থাকবে না বাবা। আজ শেষ রাতেই যাব।
সে কি?
ছুটি নিয়ে আসিনি তো। কোম্পানি একটা কাজে পাঠিয়েছিল ময়মনসিংহ। অনেকদিন আপনাদের দেখি নাই। কাজটাও হয়ে গেল সকাল সকাল। তাই আসলাম।
একটি দিন থাকতে পারিস না?
উঁহু। কাল অফিস ধরতেই হবে। প্রাইভেট কোম্পানি, বড় ঝামেলার চাকরি।
আনিস একটা নিঃশ্বাস ফেলল। সবাই চুপ করে গেল হঠাৎ। চার মাস পর এসেছে আনিস। আবার কবে আসবে কে জানে। আনিসের মা কাঁপা গলায় বললেন, তোর বড় সাহেবকে একটা টেলিগ্রাম করে দে না।
আনিস হেসে উঠল। গায়ের শার্ট খুলতে খুলতে বলল, বড়কর্তা যদি কোনমতে টের পায় আমি বাড়িতে এসে বসে আছি তাহলেই চাকরি নট হয়ে যাবে। গোসল করব মা, গা কুটকুট করছে।
কুয়োয় করবি? পানি তুলে দেবে?
উঁহু, পুকুরে করব। পুকুরে মাছ আছে রে আজিজ?
আছে ভাইজান। বড় বড় মৃগেল মাছ আছে।
আনিসের পিছু পিছু পুকুর পারে স্বাই এসে পড়ল। আনিসের বাবা আর মা পারে বসেছিলেন। আজিজ “ভীষণ গরম লাগছে” এই বলে আনিসের সঙ্গে গোসল করতে নেমে গেল। ঝুনু ঘাটের উপর তোয়ালে আর সাবান নিয়ে অপেক্ষা করছে। আনিসের সবচেয়ে ছোট বোন ঝুনু, ঘুমিয়ে পড়েছিল আনিস ভোর রাত্রে চলে যাবে শুনে তার ঘুম ভাঙানো হয়েছে। সেও এসে চুপচাপ রুনুর পাশে বসেছে, শুধু পরী আসেনি। দু’টি চুলোয় রান্না চাপিয়ে সে আগুনের কাছে বসে আছে একাকী।
খাওয়া-দাওয়া শেষ হতে হতে আনেক রাত হল। আনিসকে ঘিরে গোল হয়ে সবাই বসে গল্প করতে লাগল। উঠোনে শীতল পাটিতে বসেছে গল্পের আসর। এর মধ্যে কুণ্ডলী পাকিয়ে রুনু ঘুমুচ্ছে। চমৎকার চাদনি সেই সঙ্গে মিষ্টি হাওয়া। কারুর উঠতে ইচ্ছে করছে না। পরীর কাজ শেষ হয়নি। সে বাসন-কোসন নিয়ে ধুতে গেছে। ঘাটে। এক সময় রুনু বলল, ভাইজান এখন ঘুমোতে যাক মা। রাত শেষ হতে দেরি নেই বেশি। আনিসের বাবা বললেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ যা রে তুই ঘুমুতে যা। রুনু তুই বৌ মাকে পাঠিয়ে দে। বাসন সকালে ধুলেই হবে।
ঘরের ভিত্র হারিকেন জ্বলছিল। আনিস সলতা বাড়িয়ে দিল। টুকুন কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে। আনিস চুমু খেল তার কপালে। পরীর দিকে তাকিয়ে বলল, জ্বর নাকি টুকুনের?
হুঁ।
কবে থেকে?
কাল থেকে? সর্দি জ্বর। কিছু না। ঘাম দিচ্ছে, এক্ষুণি সেরে যাবে। আনিস পরীর দিকে তাকিয়ে একটু হাসল। পরীর লজ্জা করতে লাগল। পরী বলল, হাসছো কেন?
এমনি। পরী তোমার জন্যে শাড়ি এনেছি একটা। দেখ তো পছন্দ হয় কি-না।
পরী খুশি খুশি গলায় বলল, অনেকগুলি পয়সা খরচ করলে তো।
শাড়িটা পর, দেখি কেমন তোমাকে মানায়।
রুনুর জন্যে একটা শাড়ি আনলে না কেন? বেচারির একটাও ভাল শাড়ি নেই।
পয়সায় কুলোলে আনতাম। আরেকবার আসার সময় আনব।
পরী ইতস্তত করে বলল, আমার একা একা শাড়ি নিতে লজ্জা লাগবে। এইটি রুনুর জন্যে থাক। আরেকবার নিয়ে এসো আমার জন্যে।
আনিস খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, বেশ থাক তবে, আজ রাতের জন্য পর না দেখি?
শাড়ির ভাঁজ ভেঙে যাবে যে। রুনু মনে করবে আমার জন্যে এনেছিলে পরে তাকে দিয়েছ।
আচ্ছা, তাহলে থাক।
পরী লজ্জিত স্বরে বলল, বিয়ের শাড়িটা পরবো? যদি বল তাহলে পরি। পরী লজ্জায় লাল হয়ে ট্রাঙ্কের তালা খুলতে লাগল। আনিস বলল, টুকুন দেখতে তোমার মত হয়েছে, তাই না?
হ্যাঁ, আব্বা তাকে ছোট পরী ডাকে। আচ্ছা টুকুনের একটা ভাল নাম রাখ না কেন?
জরী রাখব তার নাম।
জরী আবার কেমন নাম?
তোমার সঙ্গে মিলিয়ে রাখলাম। পরীর মেয়ে জরী।
পরী হেসে উঠল। হাসি থামলে বলল, অন্য দিকে তাকিয়ে থাক শাড়ি বদলাব।
কি হয় অন্য দিকে না তাকালে?
আহ শুধু অসভ্যতা।
আনিস মাথা নিচু করে টুকুনকে আদর করতে লাগল। পরী হালকা গলায় বলল, দেখ তো কেমন লাগছে?
একেবারে লাল পরী।
ইশ, শুধু ঠাট্টা।
.
রান্নাঘর থেকে ধুপধুপ শব্দ উঠছে।
আনিস বলল, এত রাতে ধান কুটছে কেন?
ধান কুটছে না চাল ভাঙছে। তোমার জন্যে পিঠা তৈরি হবে। নিশ্চয়ই রুনুর কাণ্ড।
আনিস পরীর হাত ধরে তাকে কাছে টানল। পরীর চোখে আবার পানি এসে পড়ল। গাঢ়স্বরে বলল, আবার কবে আসবে?
জুলাই মাসে।
কতদিন থাকবে তখন?
অ-নে-ক দিন।
তুমি এত রোগা হয়ে গেছ কেন? পেটের ঐ ব্যথাটা এখনো হয়?
হয় মাঝে মাঝে?
টুকুন কেঁদে জেগে উঠল। পরী বলল, জ্বর আরো বেড়েছে। ও টুকুন সোনা, কে এসেছে দেখ। দেখ তোমার আব্ব এসেছে।
