কি করছ ভাবী?
পরী ঘাড় ফিরিয়ে দেখল হারিকেন হাতে রুনু এসে দাঁড়িয়েছ। সে হালকা গলায় বলল, ঘুমুবে না বাবি?
ঘুমুব? দাঁড়া একটু। কি চমৎকার জ্যোৎস্না দেখলি?
হুঁ।
আয় রুনু, তোকে একটা জিনিস দেখাই।
কি জিনিস?
ঐ দেখ জামগাছটার কেমন ছায়া পড়েছে। অবিকল মানুষের মত? হাত-পা সবই আছে।
ওমা, তাই তো। রুনু তরল গলায় হেসে উঠল।
পরী বলল; কুয়োতলায় একটু বসবি না কিরে রুনু? চল বসি গিয়ে।
তোমার মেয়ে জেগে উঠে যদি?
বেশিক্ষণ বসব না, আয়।
কুয়োতলাটা বাড়ি থেকে একটু দূরে। তার দু’পাশে দুটি প্রকাণ্ড শিরিষ গাছ। জায়গাটা বড় নিরিবিলি। রুনু বলল, কেমন অন্ধকার দেখেছ ভাবী? ভয় ভয় লাগে।
দূর, ভয় কিসের। বেশ হাওয়া দিচ্ছে, তাই না?
হ্যাঁ।
দু’জনেই কুয়োর বাঁধানো পাশটায় চুপচাপ বসে রইল। ঝিরঝির বাতাস বইছে। বেশ লাগছে বসে থাকতে। পরী কি মনে করে যেন হঠাৎ খিলখিল করে হেসে উঠল।
হাসছ কেন ভাবী?
এমনি। রাস্তায় একটু হাঁটবি নাকি?
কোথায়?
চল না, হাঁটতে হাঁটতে পুকুর পাড়ের দিকে যাই। বেশ লাগছে না জ্যোৎস্নাটা?
রুনু সে কথার জবাব না দিয়ে ভয় পাওয়া গলায় বল, দেখ ভাবী, কে যেন দাঁড়িয়ে আছে ঐখানটায়?
শিরিষ গাছের নিচে যেখানে ঘন অন্ধকার নেমেছে, সেখানে সাদা মত কি–একটি যেন নড়ে উঠল।
কে ওখানে? কথা বলে না যে, কে?
কেউ সাড়া দিল না। রুনু পরীর কাছে সরে এল। ফিসফিস করে বলল, ভাবী, ছোট ভাইজানকে ডাক দাও।
তুই দাঁড়া না, আমি দেখছি। ভয় কিসের এত?
সাহস দেখাতে হবে না ভাবী, তুমি ছোট ভাইজানকে ডাক।
শিরিষ গাছের নিচের ঘন অন্ধকার থেকে একটা লোক হেসে উঠল। হাসির শব্দ শুনেই রুনু বিকট স্বরে চেঁচিয়ে উঠল, বড় ভাইজান এসেছে। বড় ভাইজান এসেছে।
পরমুহূর্তেই সে ছুটে বেরিয়ে গেল বাড়িতে খবর দিতে।
আনিস স্যুটকেস কুয়োতলায় নামিয়ে পরীর পাশে এসে দাঁড়াল। পরী কিছুক্ষণ কোন কথা বলতে পারল না। তার কেন জানি চোখে পানি এসে পড়ল।
টুকুন ভাল আছে, পরী?
হুঁ।
আর তুমি?
ভাল। অন্ধকারে দাঁড়িয়ে ছিলে কেন?
তোমাদের আসতে দেখে দাঁড়ালাম। কি মনে করেছিলে—ভূত? পরী তার জবাব না দিয়ে হঠাৎ নিচু হয়ে কদমবুসি করল। আনিস অপ্রস্তুত হয়ে হাসল।
কি যে কর তুমি পরী, লজ্জা লাগে।
ততক্ষণ হারিকেন হাতে বাড়ির সবাই বেরিয়ে এসেছে। পরী বলল, তুমি আগে যাও। স্যুটকেস থাক, রশিদ নিয়ে যাবে।
আনিস হাসিমুখে হাঁটতে লাগল।
বাড়ির উঠোনে আনিস এসে দাঁড়াতেই আনিসের মা কাঁদতে লাগলেন। তার অভ্যাসই এরকম। যে কোন খুশির ব্যাপারে মরাকান্না কাঁদতে বসেন। কেউ ধমক দিয়ে না থামালে সে কান্না থামে না। আনিসের বাবা চেঁচিয়ে বললেন, একটা জলচৌকি এনে দে না কেউ, বসুক। সবগুলি হয়েছে গাধা। রুনু হাঁ করে দেখছিস কি পাখা এনে হাওয়া কর। আনিসের ছোটভাই আজিজ বলল, খবর দিয়ে আসে নাই। কেন দাদা? কবর দিলে ইস্টিশনে থাকতাম।
আনিস কিছু বলল না। জুতোর ফিতা খুলতে লাগল। আনিসের মার কান্না তখনো থামেনি। এবার আজিজ ধমক দিল।
আহ মা, তোমার ঘ্যানঘ্যানানি থামাও।
সঙ্গে সঙ্গে তাঁর কান্না থেমে গেল। সহজ ও স্বাভাবিক গলায় তিনি বললেন তোর শরীরটা এত খারাপ হল কি করে রে আনিস? পেটের ঐ অসুখটা সারেনি? চিকিৎসা করাচ্ছিস তো বাবা?
সবাই লক্ষ করল আনিসের শরীর সত্যি খারাপ হয়েছে। কার হাড় বেরিয়ে গেছে। গলার ভেতরে বসে গেছে। আনিসের বাবা বললেন, স্বাস্থ্য খারাপ হবে না, মেসের খাওয়া। পাঁচ বছর মেসে থাকলাম, জানি তো সব। বুঝলে আনিসের মা, মেসে খাওয়ার ধারাই ঐ।
পরী একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। আনিসের জন্য নতুন করে রান্না চড়াতে হবে। বু তার ভেতরে যেতে ইচ্ছে করছিল না। পরীর শাশুড়ি এক সময় ঝাঁঝিয়ে উঠলে, ওকি বৌমা, সংয়ের মত দাঁড়িয়ে আছে কেন? রান্না চড়াও গিয়ে। তার আগে আনিসকে চা দাও এক কাপ।
পরী অপ্রস্তুত হয়ে রান্নাঘরে চলে এল। রুনু এল তার পিছু পিছু।
রুনু হেসে বলল, আমি চা বানিয়ে আনছি, তুমি ভাইজানের কাছে থাক ভাবী। পরী লজ্জা পেয়ে হাসল।
তুই তো ভারী ফাজিল হয়েছিস রুনু।
হয়েছি তো হয়েছি। তোমাকে একটা কথা বলি ভাবী।
কি কথা?
রুনু ইতস্তত করতে লাগল। পরী অবাক হয়ে বল, বল না কি বলবি।
বাবা আমার যেখানে বিয়ে ঠিক করেছেন সেটা আমার পছন্দ না ভাবী। ভাইজানকে বুঝিয়ে বলবে তুমি। দোহাই তোমার।
পরী আশ্চর্য হয়ে বলল, পছন্দ হয়নি কেন রুনু? ছেলেটা তো বেশ ভালোই। কত জায়গাজমি আছে। তার উপর স্কুলে মাস্টরি করে।
করুক। আমার একটুও ভাল লাগেনি। কেমন ফ্যাক ফ্যাক করে হাসছিল দেখতে এসে। না না ভাবী, তোমার পায়ে পড়ি।
আচ্ছা আচ্ছা, পায়ে পড়তে হবে না। আমি বলব।
রুনু খুশি হয়ে বলল, তুমি বড় ভাল মেয়ে ভাবী।
তাই নাকি?
হুঁ। ভাইজান হঠাৎ আসায় তোমার খুব খুশি লাগছে তাই না?
পরী জবাব না দিয়ে মুখ নিচু করে হাসতে লাগল।
বল না ভাবী খুব খুশি লাগছে?
লাগছে।
রুনু ছোট্ট একটি নিঃশ্বাস ফেলল। থেমে থেমে বলল, ভাইজানের চাকরিটা বড় বাজে। বৎসরে দশটা দিন ছুটি নেই। গত ঈদে পর্যন্ত আসল না।
পরী কিছু বলল না। চায়ের কাপে চিনি ঢালতে লাগল।
রুনু বলল, এবার তুমি বাসা করে ভাইজানের সঙ্গে থাক ভাবী। মেসের খাওয়া খেয়ে তার শরীরের কি হাল হয়েছে, দেখেছ?
