সুজয় গেলাসটা ধরে বলল, লেখক কি না জানি না লিখি এই পর্যন্ত। তুমি গল্প টল্প পড়ো?
মণিকাঞ্চন উচ্ছ্বসিত হল-হা হা, পড়ি। আমার গল্প পড়তে খুব ভাল লাগে। অরুণাংশু অবাক হল, এটা তো জানতাম না।
সুজয় জোরে জোরে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে বলল, এই তো শুরু হল। এইবার একে একে কত বেরোবে। বলে মণিকাঞ্চনের দিকে ফিরল—আমাদের অরুণাংশু ভাইকে কেমন লাগছে মণিকাঞ্চন? ও কিন্তু বড় অভিমানী ছেলে। খুব সেন্টিমেন্ট।
মণিকাঞ্চনের চোখে আগ্রহ ঝিলিক দিল— তাই? রাগি নয় তো? আমার ভয় করে।
—ভয় করে? তা হলে তো তুমি ভিতু। অরুণাংশু ঠাট্টার চালে বলে উঠল।
–একটু একটু। তুমি বুঝি খুব সাহসী।
–একটু একটু।
এ দুটো যে রীতিমতন প্রেমালাপ জুড়ে দিয়েছে। সুজয় মুচকি হেসে গেলাসের দিকে তাকাল। এখন ওরা দুজন দুজনের কাছে নতুন বইয়ের মতন। পাতায় পাতায় কত চমক, কত বিস্ময়! সুজয়ের বুকটা হঠাৎ কেমন টনটন করে উঠল। তার নিজের বইটা পুরনো হয়ে গেছে বলে? আর তার জন্য এদের রুদ্ধশ্বাস দুপুর আর রোমাঞ্চকর রাতগুলোর বারোটা বাজাতে থাকব?
–কী হল সুজয়দা? গেলাসে কিছু পড়েছে?
সুজয় সচকিত হয়ে উঠল। গেলাসের ওপরটা ফেনা ফেনা, একদম তলায় গুলে আসা চিনির মধ্যে একা পড়ে আছে একটা লেবুর বীজ। একেবারে একা। সেদিকে চেয়ে থাকতে থাকতে সুজয় টের পেল ধড়াধড় পড়ে যাচ্ছে একটার পর একটা উইকেট।
–গেলাসে নয়, মনে পড়েছে। সুজয় মুখ তুলে অরুণাংশুর দিতে চাইল —হ্যাঁওড়ার ট্রেন ক’টায় অরুণাংশু?
অরুণাংশুদের ম্যানেজ-ট্যানেজ করে বাড়ি ফিরতে তিনটে বেজে গেল। মঞ্জিরাই দরজা খুলল। ওর চেহারাই বলে দিচ্ছে সারাদিন ধরে ওর ওপর দিয়ে ঝড় বয়ে গেছে। চুল বাঁধা দূরের কথা, চান-খাওয়াও করেনি নির্ঘাত। মুখখানা শুকিয়ে ছোট হয়ে গেছে। দরজা দিয়ে সুজয় মঞ্জিরার কাঁধে হাত রাখল—শোনো মঞ্জু…….
মঞ্জিরা আঁচলের পাখার গন্ধ ছড়িয়ে হনহন করে চলে গেল ভেতরে। তার মানে নো কম্প্রোমাইজ। মেয়েরা কেন যে এত অবুঝ হয়।
সুজয় বাথরুম সেরে ঘরে এল। আলমারির রঙের চোকলা উঠে গেছে এখানে সেখানে। টেবিলটা লণ্ডভণ্ড হয়ে আছে। সোফার কুশনের তুলো বেরিয়ে পড়েছে। পাপু মানুষ হচ্ছে। বিছানায় হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে ছিল মঞ্জিরা। বলে উঠল, রান্নাঘরে খাবার ঢাকা আছে।
বিছানায় পাশবালিশ আঁকড়ে অঘোরে ঘুমোচ্ছে পাপু। সুজয় এগিয়ে গিয়ে আর একবার চেষ্টা চালাল-শোনো……
মঞ্জিরা সুজয়ের হাতটা টেলে সরিয়ে দিল জোরে। এত রাগ? তার মানে ও ধরেই নিয়েছে সুজয় অন্য মেয়ের সঙ্গে সিনেমায় যায়? এ তো মহা জ্বালা। তবু সুজয় আর একটা চান্স দিল মঞ্জিরাকে—আরে তাকাও না আমার দিকে!
—সরে যাও সরাও হাত! মঞ্জিরা মুখ তুলল এতক্ষণে।
সুজয় গুম হয়ে গেল এবার। মেয়েদের মাথাটা কি পুরোপুরি ওয়ান ওয়ে……একবার যেটা ঢোকে বেরোয় না কখনও? তার মানে সমস্ত জীবন এই অবিশ্বাস আর সন্দেহের কাটার বিছানায় শুয়ে থাকো। ভাবতে ভাবতে সুজয়ের গলা। চড়ে গেল—তুমি আমায় কী ভাবো বলো তো? কী?
হঠাৎ মঞ্জিরার মুখ ঘুরে গেল সুজয়ের দিকে। সেই সঙ্গে বদলে গেল তার গলা, চোখের ভাষাও–বোকা!
–বোকা? সুজয় হাঁ হয়ে গেল।
—বোকা তো। একেবারে ছেলেমানুষ। বলতে বলতে মঞ্জিরার চোখদুটো নরম আর সুন্দর হয়ে উঠল রাস্তায় রাস্তায় খুব ঘুরেছ?
সঙ্গে সঙ্গে সুজয় গলা কঠিন করে ফেলল, সঙ্গে মানসী ছিল।
মঞ্জিরা ভেঙে পড়ল—তুমি তো জানো আমাকে। চেনো ভাল করে। তবু কেন রাগ করো? বাড়ি ছেড়ে চলে যাও? দিদি-জামাইবাবুর মধ্যে এত ঝগড়া হয়, কই
জামাইবাবু তো কখনও বাড়ি ছেড়ে যায় না। তাকাও না আমার দিকে!
সুজয় ক্লিন বোল্ড হয়ে গেল। আর রাগ নেই, চেয়ে আছে মঞ্জিরার মুখের দিকে। মঞ্জিরা তার গায়ে হাত বুলিয়ে বলল, তোমায় খুব কষ্ট দিই, না? মাঝে মাঝে কী যে হয় আমার? পরে এত কষ্ট হয়, এত কষ্ট হয়। আমারও কষ্ট, ছেলেরও কষ্ট। সারাদিন কেঁদে কেঁদে এই ঘুমল।
আবার একটা উইকেট পড়ল। ছেলের কপালে আলতো চুমু দিয়ে সুজয় বলল, সত্যি বেচারির মুখটা কেমন শুকিয়ে গেছে। কেন যে ঝগড়া করি আমরা? পাপু খুব কাঁদছিল।
—খুব। খালি বলে বাবা কোথায় গেল আর বাবা কোথায় গেল। একটা ছেলে না? ভীষণ অভিমান।
সুজয় মঞ্জিরার চুলে মুখ ডুবিয়ে দিল। চুলের মধ্যে ভুরভুর করছে খুব চেনা গন্ধ একটা। কীসের গন্ধ? বলল, একটাই ভাল কী বলো? কেউ কাউকে ছেড়ে যেতে পারব না।
মঞ্জিরা কেঁপে উঠল একেবারে। বলল, ছেড়ে যাবে? ইশ? দেখি তো কেমন ছেড়ে যাও। বলে আচমকা সুজয়ের বুকে মুখ গুঁজে কান্নায় ভেঙে পড়ল।
সুজয় চমকে উঠল। এই তো মনে পড়েছে তার। বই, বই! কী আশ্চর্য, মঞ্জিরার গায়েও অবিকল নতুন বইয়ের গন্ধ। ফরফর করে উড়ছে তার একটার পর একটা পাতা।
দেখতে দেখতে সুজয় একদম অল-আউট হয়ে গেল।
নিশিকাব্য – হুমায়ূন আহমেদ
পরী মেয়েকে ঘুম পাড়িয়ে বাইরে এসে দেখে চমৎকার জ্যোৎস্না হয়েছে। চিকমিক করছে চারদিক। সে ছোট্ট একটি নিঃশ্বাস ফেলল। এরকম জ্যোৎস্নায় মন খারাপ হয়ে যায়।
বেশ রাত হয়েছে। খাওয়া-দাওয়ার পাট চুকেছে অনেক আগে। চারদিন ভীষণ চুপচাপ শুধু আজিজ, সাপ খেলানো সুরে পরীক্ষার পড়া পড়ছে। পরীর এখন আর কিছুই করার নেই। সে একাকি উঠোনে দাঁড়িয়ে রইল।
