সব নয়, এককিলোর বলে সুজয় জিজ্ঞেস করল, এখানে অরুণআংশু সরখেল কোথায় থাকে বলতে পারেন?
–কী হংস বললেন?
—হংস-টংস নয়, অরুণাংশু। রোগা করে কোকড়ানো চুল, গাড়ি আছে। ছবি আঁকে।
—কে, গোদল? আঁকার ইস্কুল করেছে তো? খুব চিনি ওকে। ওই যে দেখছেন মাথায় অ্যানটেনা—ওই বাড়ি। দোকানদার থপাস করে একতাল সন্দেশ দাঁড়িপাল্লায় চাপিয়ে ফের বললে, কী হংস বললেন?
অরুণাংশুদের বাড়ির সামনেই সুন্দর টলটলে ভরা মস্ত একখানা পুকুর। তাতে শালুক-টালুক ফুটে আছে, হংস-টংস চরছে, ঘাটে কলরব করছে মেয়েবউয়ের দল। সুজয়কে দেখে কোত্থেকে কঁক কঁক করে তেড়ে এলে এক রিয়েল রাজহংস। একলাফে তিন পা পেছিয়ে গেল সে। সঙ্গে সঙ্গে পুকুরপাড়ের ধুলো-ওড়া পথের শেষে রেললাইন দিয়ে হাহাকার করে ছুটে এল ট্রেন। ফ্যানটাস্টিক! এখান থেকে তিনদিনের আগে কখনই নয়। অরুণাংশু ঝাড়া হাত-পা লোক। সুজয়ের একের মধ্যে তিন এবার দারুণ জমে যাবে।
–অরুণ আছে? অরুণাংশু?
কয়েক সেকেন্ডেজ্ঞ মধ্যে বেরিয়ে এল একটা ছেলে। গায়ে গেঞ্জি আর নস্যি কালার পাজামা। ডান হাতের আঙুলে, আংটি, গলায় রুপোর চেন। সুজয় কাঁধের ব্যাগ হাতে ঝুলিয়ে বলল, একটু গোদল—অ্যাহ, অরুণাংশুকে ডেকে দেবে ভাই?
ছেলেটা সেকেন্ড কয়েক হাঁ করে থেকে হঠাৎ লাফিয়ে উঠল, আরে সুজয়দা আপনি? আমায় চিনতে পারছে না?
সুজয় আশ্চর্য হয়ে গেল, তুমি অরুণ। কী আশ্চর্য, তোমার দাড়ি গেল কই?
—কেটে ফেলেছি। আসুন আসুন।
অরুণাংশুদের বাড়িখানা প্রকাণ্ড। গলার আওয়াজ পেয়ে ঘরদোর থেকে বেরিয়ে এল বাচ্চা হাফবাচ্চা, বুড়ো-আধবুড়ো মিলিয়ে কম করে হাফ ডজন লোক। তাদের দিকে চেয়ে অরুণাংশু সগর্বে ‘আমার দাদা’ বলে সুজয়কে খাতির করে ঘরে নিয়ে গিয়ে বসাল।
অরুণাংশুর ঘরখানা দেখে তা লেগে গেল সুজয়ের। ঘরের আধাআধি আলুতে বোঝাই। আলুর ফাঁকে ফাঁকে গোটানো আর্ট-পেপার, রং-তুলিরুলার, ড্রইং-খাতা, ল্যান্ডস্কেপ-মা, ছেলে-পাগলা ঘোড়া একটার পর একটা। এই ঘরটা দেখে বোঝা যায় দেহকলার সঙ্গে শিল্পকলার তলে তলে ভালই মাখামাখি আছে।
–সুজয়দা, একেবারে বিছানায় উঠে বসুন। অরুণাংশু খুশি খুশি চোখে সুজয়ের দিকে তাকাল—আমার যে কী আনন্দ হচ্ছে। পা তুলে বসুন। বালিশ দেব?
সুজয় হাত নেড়ে ওকে নিরস্ত করে বলল, দেখলে তো বলেছিলাম না, আম্ব। তবে মাইন্ড ইট এসে যখন পড়েছি সহজে নড়ছি না।
অরুণাংশু হেসে ফেলল—খুব ভাল কথা। থাকুন না।
–বটে? আজ কলকাতা যাবে না?
দাড়ি কেটে ফেললেও এখনও দাড়িতে হাত বোলানোর অভ্যাসটা যায়নি অরুণাংশুর। বলল, এই হপ্তাটা ছুটি নিয়েছি।
—ফাইন! বেছে বেছে ঠিক সময়েই এসে পড়েছি, বলো? বলতে বলতে সুজয় নিজেই একখানা বালিশ টেনে নিল—তোমাদের এখানে কী কী দেখার আছে চটপট লিস্ট করে ফ্যালো তো।
—এখানে? অরুণাংশুর চোখ ঘুরে গেল দরজার দিকে, এখানে এস।
সুজয় বালিশ ছেড়ে সোজা হয়ে বসল। নূপুরের রুমঠুন শব্দ বাজিয়ে ঘরে ঢুকে এল পনেরো-ষোলো বছরের একটা মেয়ে। মুখচোখ, চেহারা, রং-টং এককথায়, বাহ! মেয়েটি এগিয়ে এসে হঠাৎ সুজয়কে প্রণাম করে বসল। সুজয় ‘এ কী এ কী’ বলে নড়েচড়ে উঠে অরুণাংশুর দিকে ফিরল, কে গো?
অরুণাংশুর দাড়ি নেই ভুলে গিয়ে ততক্ষণে দাড়ি চুলকোতে শুরু করে দিয়েছে; লজ্জা লজ্জা ভাব করে বলল, সুজয়দা আপনি জানেন না, এর মধ্যে এটা হয়ে গেল।
অফিসের দু-একজন ছাড়া কেউ জানে না।
সুজয়ের মাথাটা বোঁ করে ঘুরে গেল—হয়ে গেল মানে? তুমি বিয়ে করেছ? এই বুঝি সে? মেয়েটা মাথা নিচু করে মুচকি মুচকি হাসতে লাগল। হুম, ঠিক তো, মাথায় সিঁদুর। নাকের এক পাশেও তার গুঁড়ো লেগে আছে। সঙ্গে সঙ্গে কট অ্যান্ড বোল্ড। সুজয়ের মনে পড়ে গেল মঞ্জিরার কথা।
–কী নাম তোমার?
মেয়েটি মুখ তুলে তাকাল। পালকে ঠাসা সুন্দর একজোড়া চোখ। বলল, মণিকাঞ্চন।
–মণিকাঞ্চন? ফাইন! তোমাদের দুজনকে দেখেই বুঝেছি, মণিকাঞ্চনযোগ কাকে বলে, বলে সুজয় অরুণাংশুর দিকে তাকাল—তোমার তো দারুণ পছন্দ গো, অরুণ। এই না হলে আর্টিস্ট।
অরুণাংশু একগাল হাসল। নিঃশব্দে সুজয়কে থ্যাঙ্কস দিয়ে মণিকাঞ্চনের দিকে ফিরল। সুজয়ের প্রশংসার চোখ দিয়ে এবার সে আবিষ্কার করতে শুরু করল মেয়েটাকে। দেখতে দেখতে আশ্চর্য নরম হয়ে গেল শিল্পীমশাইয়ের চোখ। মুখে নেমে এল অদ্ভুত প্রশান্তি। দৃষ্টিরও সম্ভবত শব্দতরঙ্গ হয়। মণিকাঞ্চন হঠাৎ মুখ তুলে অরুণাংশুর দিকে চেয়ে স্থির হয়ে গেল। এই রকম একটু সময়। তার পরেই লজ্জা পেয়ে ছিটকে বেরিয়ে গেল বাইরে। সুজয়ের গায়ে কাঁটা দিল। এই দৃশ্যটা তার কাছে মঞ্জিরার মতনই ভীষণ চেনা লাগল।
সুজয় ব্যাগ থেকে সন্দেশের প্যাকেট বের করে বলল, অরুণাংশু, আমি খুব খুশি হয়েছি। আমি তো জানতাম না, তা হলে হাতে করে কিছু নিয়ে আসা যেত। তার বদলে এটা নাও।
অরুণাংশু গোলমাল করে উঠল—আবার এ সব আনতে গেলেন কেন সুজয়দা? এসব ফর্মালিটি আপনাকে মানায় না।
মানায় না, মানিয়ে নিতে হয়। এটাই হয়, জীবন।
অরুণাংশু প্যাকেট নিয়ে চলে গেল। ফিরেও এল কিছুক্ষণ পরে। পেছনে মণিকাঞ্চন। ওর হাতে কাঁচের গেলাসে সরবত।
—আপনি লেখক? গেলাসটা বাড়িয়ে দিয়ে মণিকাঞ্চন হঠাৎ সুজয়কে প্রশ্ন করে উঠল।
