—টিকিট? মঞ্জিরা গর্জন ছেড়েছিল—এই যে কাল তুমি বললে কোথায় কোন্ প্রোফেসর না পাবলিশারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলে।
–বলেছিলাম নাকি? সুজয় ব্যাপারটা হাল্কা করার চেষ্টা করল— দূর অত হিসেব করে কথা বলা যায় সবসময়? কাল মানসের সঙ্গে সিনেমার গেছিলাম। সিনেমার কথা শুনলে তুমি যেমন ক্ষেপচুরিয়াস হয়ে যাও, তাই…
—আবার মিথ্যে কথা? মঞ্জিরা টিকিট দুটো কুচিকুচি করে বলল, মানস না মানসী? কার সঙ্গে কাল সিনেমায় গিয়েছিলে? আমি ঘর সামলাব, ছেলে সামলাব, বাবু সিনেমা হলে বসে প্রেম করবেন।
সুজয় কাপ-ফাপ উলটে দিয়ে তড়াক করে লাফিয়ে উঠল। সুজয় স্ব সহ্য করতে পারে, কিন্তু চরিত্রদোষের অপরাধ কভি নেহি। আসলে এ ব্যাপারটায় কিছু করে দেখাতে গেলে যে রকম চেহারা আর সাহস থাকা দরকার তার কোনোটাই ওর নেই। তাই এই নিয়ে কেউ বদনাম করলে ওর মাথায় রক্ত চড়ে যায়। আর যখনই সুজয়ের মাথায় রক্ত চড়ে এখনই ওর বউয়ের মাথাটাও যায় বিগড়ে। ফলে কিছুক্ষণ ভীষণ অবস্থা। কালাশনিকভ, কামান, রকেট-লঞ্চর ব একসঙ্গে চলছে। আর তার পরেই….
চৌরাস্তার মোড়ে পোকার মত কিলবিল করছে একগাদা অটোরিক্সা। সুজয় ঘাড় গুঁজে তার একটায় চড়ে বসল। ইন্টারনেটের যুগে পৃথিবীটা দিনে দিনে ছোট হয়ে আসছে। তার সঙ্গে কমে কমে যাচ্ছে মানুষের মাথার মাপ। ভাবতে ভাবতে সুজয়ের মনে পড়ে গেল তার পুত্ররত্ন পাপুর কথা। গত জুলাইয়ে তিনে পা রাখলে কী হবে, অটোরিক্সার ওপর কীসের এত টান কে জানে। খেতে বসে ভূত রাক্ষস রাজারানি আঙুরফল টক, এমনকী, লেটেস্ট শক্তিমানও চলবে না, ওকে অটোর গল্প বলতে হবে।
সুজয়ের মনটা খারাপ হয়ে গেল। একের ভের তিনে এই একটাই অসুবিধে, ছেলেটা। আরও সমস্যা, ছেলে এই একপিসই। দুটো হলে একটাকে বউকে ধরিয়ে দিয়ে উঁটের মাথায় বলে দেওয়া যেত, নিজের পথ নিজে দেখে নাও। ডিভোর্স হলেও কাঁচকলা। একটা তো আমার কাছে রইলই। বলে কিনা মানসী! ইস কেন যে আর একবার ট্রাই করিনি।
-হাওড়া?
সুজয় তাকিয়ে দেখল এক গুরুগম্ভীর ভদ্রলোক বকের মুখ বাড়িয়ে তাকে দেখছেন।
—হুঁ। সুজয় ঘাড় নাড়ল।
–কখন ছাড়বেন?
সামনের সিটে বসে আছে বলে ভদ্রলোক সুজয়কে ড্রাইভার ভেবেছেন। সুজয় গম্ভীরভাবে উত্তর দিল, এই লোক হলেই ছাড়ব।
ভদ্রলোক অটো কাঁপিয়ে ভেতরে ঢুকে স্কুম ছাড়লেন, নে নে ডাক। আমার তাড়া আছে।
ড্রাইভার কনফার্ম হতেই একধাক্কায় তুই। মানুষের মাথার মাপই কি শুধু কমছে? সুজয় বেঁকে গেল ভদ্রলোকের দিকে, ট্রেন ধরবেন নাকি?
ভদ্রলোকেরা সাধারণত অটোয় উঠেই সিগারেট ধরিয়ে ফেলেন। পাশের লোকের অসুবিধা হচ্ছে কি না ফিরেও তাকান না। ইনিও সুজয়ের নাক তাক করে একরাশ এঁটো ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, হুঁ, কর্ড। বেরিয়ে গেলে একগাল মাছি।
সুজয় নড়েচড়ে বসল। গুড়াপ স্টেশনটা কর্ড লাইনে না? ওখানেই তো ওদের অরুণাংশু থাকে। বড় ভাল ছেলে অরুণাংশু। সুজয়ের অনেক জুনিয়র। ছেলেটা কলকাতার একটা পত্রিকা-অফিসে ছবি আঁকে। হাতটা ভারি চমৎকার। কতবার বলেছে তার বাড়িতে যেতে। সুজয় ঘড়িটা দেখল, অরুণাংশু এগারোটা নাগাদ বাড়ি থেকে বেরোয়। দেখিই না একেবার ট্রাই করে।
—এই যে কাকু, আপনি সামনে গিয়ে বসুন তো।
অটোরিক্সার ড্রাইভার এতক্ষণে দেখা দিয়েছেন। জিনস-টিনস পরা শৌখিন ছোঁকরা। তার পেছনে কুচোকাচা সমেত পুরো এক ব্যাটেলিয়ন অবাঙালি গৃহবধূ। অটোর এই এক মজা। কেউ নেই, পিঁপড়ে কেঁদে বেড়াচ্ছে। তারপর এল তো এল বাঁধ ভেঙে, কুল উপচে, দলে দলে, পালে পালে। অটোওয়ালারা মহানুভব, কাউকে ফেলে যেতে রাজি নয়।
ভদ্রলোক ‘হুঁহু’ বলে ভয়ানক এক নাকঝাড়া দিয়ে সুড়সুড় করে নেমে সুজয়ের পাশে বসলেন। বসলেন মানে অর্ধেক ভেতরে, অর্ধেক বাইরে। এইবার সুজয়ের হাসির পালা। হাসতে হাসতে ভদ্রলোককে বলল, বুঝলেন তো এখন কেন আমি ভেতরে বসিনি? সিগারেটটা ফেলুন এবার।
গুড়াপে পৌঁছতে সাড়ে দশটা বেজে গেল। সুজয়ের যতদূর মনে পড়ে অরুণাংশু প্ল্যাটফর্ম ধরে কিছুটা গিয়ে একটা লেভেল-ক্রসিংয়ে কথা বলেছিল। তার আশেপাশেই ওর বাড়ি। সুজয় হাঁটতে শুরু করল। হাঁটতে হাঁটতে লোকজনের মুখগুলো ভাল করে লক্ষ করছিল। অরুণাংশুর বেরিয়ে পড়ার টাইম হয়ে গেছে।
ঠিক দুমিনিট লাগল লেভেল-ক্রসিংয়ে পৌঁছতে। লোকজন-দোকানপাট গাড়িঘোড়ায় জায়গাটা জমজমাট। পাকাবাড়িও বিস্তর চোখে পড়ছিল। সুজয় একটা দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল। দোকানের শো-কেসে মাখা-সন্দেশ, আর বারকোষে। পেটাই পরোটা ছাড়াও রকমারি মিষ্টির সঙ্গে প্রচুর ভিমরুল আর মাছি চোখে পড়ছিল। সুজয় দোকানদারকে পাঁচশো মাখা-সন্দেশ বলতে না বলতে ভুবন অন্ধকার করে দিয়ে সামনে ব্রেক কষে দাঁড়াল একটা ট্রেকার। গাড়ির চাকাগুলো ছাড়া আর কিছু দেখাত যাচ্ছিল না। পেছনের ফুটবোর্ডেও মেয়েরা ঝুলছিল। পাপু যদি দেখ! সুজয়ের মনটা ধাপ হয়ে গেল আর একটা বাচ্চা যদি থাকত তাহলে এভাবে একা একা রাস্তায় ঘুরতে হত না। বউটাও যা খুশি বলে যেতে পারত না। বলে কিনা মানসী? সুজয়। দোকানদারকে লক্ষ করে গলা ছেড়ে দিল এই যে বড়দা, ওটা পুরো এককিলো করে দিন। যত্ত।
দোকানদার সুজয়কে দেখলেন, আজ্ঞে সব?
