এই সময় কোচড় থেকে একটা থলে বের করে তা থেকে স্পিরিটের শিশি, জুট তুলল, কিছু যন্ত্রপাতি মেঝেতে নামিয়ে একটা বিড়ি ধরিয়ে গ্রামোফোনের প্লেট থেকে রেকর্ডটা নামিয়ে নিয়ে সেটাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে নিল। পরে নিজের সঙ্গেই যেন কথা বলছে সেইভাবে বললে, আঃ, কদ্দিনের মাল। তখন কি র্যালা মেয়েটার। একখানা রেকর্ডেই হিরোইন। তাই দেখে ছোট বড়ালবাবু একদিন বললে, বুঝলি সতে, তোকে আর এই মেয়েটাকে নিয়ে দু’নম্বরি করতে হবে না। সুখী গৃহকোণে’ ফাটাবে। অন্য মেয়ে গাইয়েদের পেটে নাথি পড়ল বলে। …তা, কই আর হোলো। ফুটুর ডুম। কোথায় ছিটকে গেল।
বলতে বলতে লোকটা মেঘুমামার দিকে চোখ তুলল। ভুরু নাচিয়ে রেকর্ডটা তার দিকে তুলে ধরে ফের বললে, ওজনটা দেকেচ? ব্ল্যাক লেবেল। সলিড। তঁত নয়, শিরিস নয়, খাঁটি জার্মান বেকা কোম্পানির মাল। কথাটা শেষ করেই লোকটা এবার রেকর্ডটাকে নিয়ে পড়ল। মাঝে শুধু একবার বলল, রেকর্ডটাতে ক্যামন য্যান একটা আতর আতর গন্ধ লুকিয়ে আছে বলে মনে হচ্চো তাতো হবেই। শত হলেও বাইজি বাড়ির গান তো বটে। তার মেজাজই আলাদা।
তারপরই সে হঠাৎ কেমন চুপ মেরে গেল। রেকর্ডটাকে নিয়ে পড়ল। শশী দেখল রেকর্ডের লেবেলটা কেমন আস্তে আস্তে তার পুরনো চেহারা ফিরে পাচ্ছে। তবে একটু বিবর্ণ। বুকটা ধুক ধুক করতে লাগল তার। সত্যিই যদি এবার রেকর্ডটা কথা বলে ওঠে, গান হয়ে মায়ের গলা ভেসে ওঠে? নোকটার হাতের শিরিস কাগজ আর ফোঁটা ফোঁটা স্পিরিটের আলতো চাপের ঘষায় রেকর্ডের ঘূর্ণায়মান খাঁজগুলি ক্রমশ যেন চকচকে, সজীব হয়ে উঠছে। আর তাই দেখতে দেখতে তার গোটা দেহ থিরথির করে কাঁপছে, চোখের দৃষ্টি ঝাঁপসা হয়ে আসছে।
নিস্তব্ধ ঘরে একটা হিসহিস শব্দ। যেন একটা তেজি সাপ কিছু খুঁজে বেড়াচ্ছে সারা ঘরময়। তার চারপাশে অন্ধকার ঘাপটি মেরে স্থির হয়ে আছে।
বিশ্ব চরাচরে ঝলমলে রোদ। সেই ঘোর শশীর কতক্ষণ ছিল খেয়াল নেই, হঠাৎ একটা প্রচণ্ড আওয়াজে তার বুকের স্পন্দন দ্রুত হয়ে গেল। মনে হোল, কানের কাছে কে যেন গোঁ গোঁ করে, ‘আমার’ ‘আমার’ শব্দে উন্মাদের মত চিৎকার করতে শুরু করে দিয়েছে। সঙ্গে মেঘুমামার আর্তনাদ থামান থামান, বন্ধু করে দিন মেশিনটা।
তারও পরে, জ্ঞান ফিরতে, চোখের দৃষ্টি স্বচ্ছ হতে যতটা সময়, শশী দেখল লোকটার হাতে সাপের ফণা ধরার মত সাউন্ড বক্সটা, চোখ দুটো বিস্ফারিত, যেন সাপ খেলা দেখাতে দেখাতে একাট বেদে থমকে, ক্রুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে। চোখের দৃষ্টি স্থির। বললে, মেয়েটার বড্ড তেজ। কিছুতেই কথা কইবে না। সত্যিকারের মা হলে এ্যামনটা কেউ করে? কুলটা, নষ্ট মেয়েছেলে কাহাকা। বেইমান। দিলে খদ্দেরটা হাতছাড়া করে।
বলতে বলতে হাতের যন্ত্রটা ঘূর্ণায়মাণ রেকর্ডের ওপর আছড়ে ফেলল সে।
এবার আর আর্তনাদ নয়, শশীর মনে হোল ‘আমার আমার’ বলে তার মা যেন করুণ সুরে কি বলতে চাইছিল। যেটা অব্যক্ত হয়েই রইল শেষপর্যন্ত।
মুহূর্তে শশী দু’হাতে মুখ ঢেকে হু হু করে কেঁদে ফেলল।
নতুন বইয়ের গন্ধ – শুভমানস ঘোষ
রেগেমেগে সুজয় বেরিয়ে তো পড়ল বাড়ি থেকে। এখন যায় কোথায়? এ তো একদিনের ক্রিকেটের মতন টোকেন রাগ নয়, বাস ধরে ধর্মতলায় গিয়ে ম্যাটিনি-শো দেখে আর এক প্লেট বিরিয়ানি খেয়ে বাড়িতে ফিরে ‘খাব না যাও’ বলে সোজা বিছানায় চলে যাবে। বউয়ের ওপর রাগ দেখানোর ব্যাপারে খাওয়া ব্যাপারটা চিরকালই বেশ কাজে দেয়। তবে তার চেয়েও ভাল হয়, ‘রইল তোর সংসার’ বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে একেবারে মহানগর থেকেই মিলিয়ে যাওয়া। এতে বউকে ভাল রকম জব্দ করা হল, রাগকে রাগ দেখানো হল, আবার সংসারের ক্যাঁচমেচি এড়িয়ে দুদিন ফুরফুরে হাওয়ায় আনন্দ-সফরও হল। একের ভেতর নি।
-আরে সুজয় যে! সাতসকালে হাঁপাতে হাঁপাতে কোথায়?
ভজন দত্ত, মানে ভজাদা। গোঁফদাড়িতে, পান-বিড়ি-গাঁজা-কারণে, আর আধ্যাত্মিক তেজে পঞ্চাশেই বুড়োটে মেরে গেছেন। বিশ বছর কোনো এক মহাতান্ত্রিকের আন্ডারে আধ্যাত্মিক শ্রমদান করে পৈতৃক বাড়ির ভাগ নিতে কিছুদিন হল আবির্ভূত হয়েছেন। এই ভদ্রলোক কী করে বুঝবেন একজন সংসারী মানুষের ঘরে ফিরতে রাত নটার জায়গায় মাত্র দশটা বেজে গেলে বউয়ের কাছ থেকে কী রকম অভ্যর্থনা পাওয়া যায় কী রেটে একটার পর একটা গল্প বলে তবে পার পাওয়া যায়।
—ভাল আছেন ভজাদা? মুখে একটু হাসি টেনে, সুজয় জিজ্ঞেস করল।
—তা তো আছি। কিন্তু তুই চললি কই?
সেটা কি সুজয় নিজেও জানে? চট করে একটা গল্প বনিয়ে দিল, এই একটা সেমিনার আছে।
-কোথায়?
—গোবরায়।
—কি?
না না মগরা, মগরা।
সুজয় আর দাঁড়াল না। বিয়ে করলে সব ছেলেই কি তার মতন গল্প বানাতে শুরু করে? কিন্তু গল্পের বেলুনটা যখন ফাটে তখনই হয় বিপদ। সকালে সুজয় সবে চায়ের কাপে ঠোঁট ঠেকিয়েছে, সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল মঞ্জিরা। বউটা সুজয়ের দেখতে শুনতে ভালই, কিন্তু রাগলেই অবিকল শীত্রে গোড়ায় ওঠা বেগুন। সুজয়ের দিকে সিনেমার টিকিটের একজোড়া কাউন্টারপার্ট বাড়িয়ে দিয়ে রাগে ফেটে পড়েছিল, এটা কী? পকেটের ভেতর লুকিয়ে রেখেছিলে। কী এটা?
জিভে চায়ের ছ্যাকা খেয়ে সুজয় আঁক করে উঠেছিল, টিকিট!
