.
সে রাত্রে শশীকান্ত একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখল।
প্রথমে মনে হোল গোঙানি নয়, কোথা থেকে যেন চাপা নারীকণ্ঠের অস্ফুট কান্না ভেসে আসছে অতি করুণ, অনেকটা বিলাপের মত। কিন্তু এ বাড়িতে তো কোনো মহিলা নেই? কান্নাটা যখন ক্রমশ তার কাছাকাছি হোল তখন গায়ে কাঁটা দিল। মনে হোল, কান্না নয়, ওপাশের টেবিলের ওপর দেয়াল ঘেঁষে রাখা গ্রামোফোনের ঢাকনার ভেতর থেকে করুণ সুরের গান ভেসে আসছে কাঁপা কাঁপা স্বরে। তার নিঃশ্বাস পর্যন্ত স্পষ্ট। তাহলে কি শেষ পর্যন্ত মায়ের গলার গানটা অমন কঁকিয়ে ছিল?
ধড়মড়িয়ে উঠে বসল শশী। সর্বাঙ্গ ঘামে জবজব করছে, কণ্ঠতালু শুকিয়ে এক ধরনের বোবা আওয়াজ বেরুচ্ছে তা থেকে। কান্নার মত কাঁপা কাঁপা সেই গান যেন মুহূর্তে ময়াল সাপের মত তাকে জড়িয়ে ধরবে। সে চিৎকার করে উঠল।
তারপর আর কিছু মনে নেই।
যখন জ্ঞান ফিরল, দেখল পাশে মেঘুমামা।
: কোন ভয়ের স্বপ্ন দেখছিলিস? নইলে অমন চিৎকার করে উঠলি কেন।
প্রথমটা শশী কোন কথা বলতে পারল না। পরে একটু ধাতস্থ হয়ে বলল, স্পষ্ট শুনলুম গ্রামোফোনটার ডালা খুলে গিয়ে তার ভেতর থেকে কান্নার মত একটা গান ভেসে আসছে।
: ও তোর মনের ভুল। মেঘুমামা বললে। গ্রামোফোনের ডালাটা তো বন্ধই আছে। তুই স্বপ্ন দেখছিলি। ওটা ঘরে রাখাই কাল হয়েছে। সকালেই ওটাকে ফের চিলেকোঠায় তুলে দেবো। সেখান থেকে নিশ্চয়ই তোর মা রেকর্ড থেকে বেরিয়ে গান গাইতে গাইতে সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে আসবে না।
সেই কথা শুনে শশী হতবাক হয়ে মেঘুমামার দিকে অপলক চেয়ে রইল।
সেই করুণ চাহনি দেখে কি হোল, মেঘুমামা ফের বললেন, তার আগে না হয় আর একবার চেষ্টা করে দেখা যাবে। কালকেই আমি বৌবাজারের চোরামার্কেটে যাবো। এখনও হয়তো সেখানে কিছু পুরনো রেকর্ডের দোকান আছে। তারা রেকর্ডের পেট থেকে গান বের করার কায়দা জানলেও জানতে পারে।
শশীর সেদিনের সকালটা ঘোরের মধ্যেই কাটল। ব্যবসার ঝপ কদিন থেকেই বন্ধ। মেঘুমামা একটু বেলা চড়তেই বেরিয়ে গেছেন।
প্রায় বারোটা নাগাদ ফিরে এসে বললেন, সব শুনেটুনে এক দোকানদার বললে, অদ্দিনের রেকর্ড, বাজাবো বললেই বাজানো যায়? গান-টান ধুয়ে মুছে কবে পালিয়ে গ্যাছে। ওকে এখন গামছায় বেঁধে জলে ডুবিয়ে রাখুন। তারপর যখন তোর বাসনার কথাটা শুনলে, তখন বসলে, একজনই মাত্র লোক আছে, যে চেষ্টা করলে রেকর্ডের পেট থেকে গান বাজনা সব টেনে বের করতে পারবে। কিন্তু তার বয়স হয়েছে। বাড়ি থেকে প্রায় বেরুতেই পারে না। থাকে বেলঘরিয়ায়। সেখানেই যেতে হবে। তবে আগে জানিয়ে। চোরামার্কেটে গানের ব্যবসা করে করে সেও এখন এক ধরনের উন্মাদ।
পরদিন মেঘুমামা বললেন, লোকটার ঠিকানা নিয়ে এসেছি। আমি বরং তার পাত্তাটা জেনে আসি। ভোর যখন এ্যাত মন পোড়ানী মা’র গান শোনার জন্যে।
দুপুর নাগাদ যখন তিনি ফিরলেন, সঙ্গে সিঁড়িঙ্গে মার্কা চেহারার একটি লোক। মালকোচা মারা ধুতির ওপর দুমড়নো শার্ট। একটু কুঁজো, প্রায় ধনুভঙ্গ চেহারা। গালে কদম রোঁয়ার মত দাড়ি। চোখে সুতলি বাঁধা নিকেল ফ্রেমের চশমা। পায়ে হাউই চটি।
মামা হেসে বললেন, কাকে ধরে এনেছি জানিস? সাক্ষাৎ জহুরি। আসতে কি চায়?
লোকটি হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিয়ে বললে, বাস বাস। আগে মালটা দেখি। তার আগে এককাপ চা খাবো। সঙ্গে দু’টো বিস্কুট। খালি পেটে চা খাওয়া ডাক্তারের বারণ। আমার আবার পেটে গ্যাসের রোগ আছে। এক সময় মাল-টাল চলত তো। ব্যবসাও গ্যাচে, তার সঙ্গে নেশাটাও গ্যাচে। কিন্তু রোগটা শালা পেটে থেকে গ্যাচে।
চা খাওয়ার পর আর এক বায়নাক্কা, এক প্যাকেট বিড়ি আর দেশলাই। সঙ্গে কটা সিগ্রেট। ওঝার কাজ তো। ঝাড়ফুঁক করতে ওসব লাগবে।
চা বিস্কুট এলো, সঙ্গে বিড়ি-দেশলাই এবং সিগারেট। সব আয়োজন দেখে বেশ প্রসন্ন লোকটা। বললে, ঠিক আছে। চার্জটা একটু কমিয়েই নেয়া যাবে। ঐ গাড়ি ভাড়া শুদ্ধ পঞ্চাশ টাকা। এখন কি আর টাকার কোন মূল্য আছে? ছিল তখন। চোর বাজারে ব্যবসা হলে কি হবে, বাঘা বাঘা সব লোক ধরে নিয়ে যেত। কৈ, গ্রামোফোন আর রেকর্ডটা নিয়ে এসো।
শশী আর মেঘুমামা ধরাধরি করে গ্রামোফোনটা কাছে নিয়ে আসতে লোকটা বললে, কুকুর মার্কা যন্ত্র। তাই বল। নইলে অ্যাতো দিন ট্যাকে?
তারপর উবু হয়ে বসার ভঙ্গি করে গ্রামোফোনের চারদিক দেখলে। পরে মুখ তুলে ভুরু কুচকে বললে, ডোনের মাল? কিন্তু কে দিলে তার নাম লেখা নেই তো?
মেঘুমামা বললে, শুনেছি আমার বোনঝিকে তার গান শুনে খুশি হয়ে এক ওস্তাদ এটা দিয়েছে। নাম জানি না।
: সুহাসিনীবালা তোমাদের কে হয়?
: আমার ছোRদি। এর মা।
লোকটা এবার টান-টান হোল। একবার শশীর আপাদমস্তক দেখে নিয়ে বললে, চ্যায়রার তো কোনো মিল দেখছি না?
কথাটা শুনে শশীর মাথায় রক্ত ওঠা উচিত ছিল। কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল। শশব্যন্তে তাকে জিজ্ঞেস করল, আপনি তাকে দেখেছেন?
: একবার সে আমার শ্যালদার চোর বাজারে দোকানে এয়েছিল তার রেকর্ডটার খোঁজে। সঙ্গী কালো চশমা চোখে একটা লোক। গানের মাষ্টার-টাষ্টার হবে। এক কপিই ছিল। চড়া দামে ঝেড়ে দিয়েছি। কত বছরের পুরনো মাল। বাজারে পাওয়া গেলে তো।
শশীর মনে মনে ইচ্ছে হয়েছিল, জিজ্ঞেস করে তার মাকে কেমন দেখতে ছিল। তাহলেও একটা কল্পনা করে নেওয়া যায়। কিন্তু লোকটা ততক্ষণে মেঝেতে বসে পড়ে গ্রামোফোন যন্ত্রটা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। আগা পাস্তালা সেটাকে উল্টে পাল্টে, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে, স্থান বিশেষে কান পেতে কি সব পরীক্ষা করে এক সময় নিজের মনেই বললে মনে হচ্ছে, লিবার-টিবার, যন্ত্রপাতি ব ঠিকই আছে। এখন বরং মালটাকে দেখা যাক।
