: মার তো তা হয়নি?
: না। ঐ কাশী মাষ্টার এসে খোঁচাতো। চরি, তোর ভারি মিষ্টিগলা। সংসার করছিস বলে গান ছাড়িসনি। বলিস ভো ওস্তাদজিকে ডেকে আনি। সেই শুরু। একদিন অফিস ফেরতা তোর বাবা দেখে বিরাট পাগড়িওলা একটা লোক বাইরের ঘরে বসে। সামনে ডুগি বলা, হারমোনিয়াম,ভোর মা ও কাশী মাষ্টার। ওস্তাদের মুখে গান, হাতে পানের ডিবে। রেকাবিতে পিরিচ পেয়ালা। পান মশলা।
অশাস্তির সেই শুরু। একদিন কাশী মাষ্টারকে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়া। হোল। তার ডুগিলা ফাঁসিয়ে, হারমোনিয়ামটাকে আছাড় মেরে কাশী মাষ্টারের পেছন পেছন্ন রাস্তায় ফেলে দেয়া হোল। সেগুলি তারই ছিল। তোর বাপ বলে, গেরস্ত বাড়িকে বাঈজি বাড়ি বানিয়ে ফেলেছে।
সেই থেকে তোর মা’র যেন জিদ চেপে গেল। তখন তোর বয়স দেড় কি দুই। সে নিজেকে গুটিয়ে নিল সংসার থেকে। দুমুঠো ভাত রাঁধা, গান আর তুই। মা বললে, এ আমাদের জন্যে নয়। সংসার কর। নইলে সংসারটা ভেসে যাবে। বাবারও তাই মত। এই সময় চরি তোকে মাঝে মাঝেই এখানে রেখে যেতে লাগল। তাই নিয়ে দু’বাড়িতে অশান্তি। একদিন কে খর দিলে, তোর মাকে চিৎপুরের গরানহাটায় দেখা গেছে। সেখানে তখন গ্রামোফোন কোম্পানির রিহার্সাল রুম ছিল। খারাপ পাড়ার মেয়েদের যাতায়াত খুব। ততদিনে তোর মাও একরকম বেপরোয়াই। তার কিছুদিন পরেই তাকে তোর বাবা বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়।
মেঘু মামা একটানা অতগুলি কথা বলে থামলেন। অনেক পরে গলা নিচু করে ফের বললেন, সেই সময়টা চরির খুব খারাপ গেছে। পরের গলগ্রহ হয়ে থাকতে হয়েছে। লোক লজ্জা আর সমাজের ভয়ে তোর দাদুও মেয়েকে আশ্রয় দিতে সাহস পায়নি। মেয়েও তেমনি জেদি। দ্বিতীয়বার আর সে বাড়ির চৌকাঠ মাড়ায়নি। অনেকদিন পরে শুনেছিলুম চরি তার কোন্ গাইয়ে বান্ধবীর সঙ্গে নবদ্বীপে গিয়েছিল। সেখান থেকে কাশী। তার পরেরটুকু জানা নেই। তোর দিদিমার কথায় আমি নবদ্বীপ পর্যন্ত গিয়েছিলুম। তবে কাশীতে খোঁজ করতে যাওয়া হয়নি।
শশী বলল, কত বছর আগে তুমি নবদ্বীপ গিয়েছিলে?
: বছর কুড়ি হবে। মেঘুমামা বললেন। তখনও বিধবা থেকে নানা জাতের। অসহায়, পরিত্যক্ত মেয়েদের ওখানে আশ্রয় নেয়া চলছিল। তাদের জন্য নানা আশ্রমও ছিল। শুনেছিলুম তোর মা দু’বেলা বড় রাধেশ্যাম ছোট রাধেশ্যামের মন্দিরে কেত্তন করে দুমুঠো অন্নের সংস্থান করতো।
: তোমার সঙ্গে দেখা হয়েছে?
মেঘুমামা সে কথার উত্তর দিলেন না।
: কোনো কথা? কি কথা!
এবারও কথা বললেন না তিনি।
.
সেরাতে ঘুমতে পারেনি শশী। সর্বাঙ্গে তার জ্বালা। তিন সাড়ে তিন বছরের চোখ দিয়ে মা’কে মনে করার চেষ্টা তাকে সারা রাত তাড়িয়ে বেড়াল। কিন্তু কিছুতেই মনে পড়ল না। রেকর্ডের লেবেল, তার ভেতরে গানের কথার মতই। সবটা অস্পষ্ট, ধূসর হয়ে রইল।
দিদিমা মারা যাবার পর এবাড়িতে আর কোন আলতা-সিঁদুর পরা মেয়ে-মানুষের পায়ের চিহ্ন পড়েনি। কুলটার ছেলেকে কেউ মেয়ে দেবে না ভেবে সেও বিয়ে করেনি। নিঃসন্তান মাসী মারা যেতে মেঘুমামা হঠাৎ বিবাগী হয়েছিলেন। ইদানীং শশীর সঙ্গী হয়েছে। দু’জনে মিলে দাদুর রাবার স্টাম্পের ব্যবসাটা দেখে। এখন, সেই ব্যবসা তামাদি হবার মুখে। ও আর চলে না। তাই থেকেই কোনক্রমে দু’জনের দুমুঠো হয়ে যায়। নিজেরাই হাত পুড়িয়ে খায়।
সকালে উঠে শশীকান্ত মামাকে বলল, মা’র কোন ছবি আছে কোথাও?
মেঘুমামা যেন আকাশ থেকে পড়লেন। বললেন, তখন কি এখনকার মত এত ছবি তোলা সহজ ছিল না রেওয়াজ ছিল? খুব ছোটবেলায় আমাদের সবাইকে নিয়ে অবশ্য একটা গ্রুপ ফটো তোলা হয়েছিল কি কারণে। তাতে শ’খানেক মুখ। তোর মা তখন কোলের শিশু। শুনেছিলুম বিয়ের পরে শখ করে তোর বাবা স্টুডিওতে গিয়ে জোড়ে ছবি তুলেছিল। তোর মা’কে তাড়িয়ে দেবার পর বৌর সেই হাসি হাসি মুখের। ছবিটা আচড়ে ভেঙে ফেলে দিয়েছে। তবে কয়েকবার নাকি রেকর্ডের বিজ্ঞাপনের সঙ্গে খবরের কাগজে তোর মা’র ছবি বেরিয়েছিল। শোনা কথা, আমি দেখিনি। তখন রেকর্ড কোম্পানির শিল্পীর ছবি ছাপার রেওয়াজ ছিল।
: তুমি কি মার রেকর্ডের গান দুটো আগে শুনেছিলে?
: অনেকদিন আগে। এখন আর মনে নেই।
: একটা দুটো কথা?
মেঘুমামা চুপ করে একটু আনমনা হলেন। পরে বললেন, ঐ যুথিকা রায়ের ‘চরণ ফেলিও ধীরে ধীরে প্রিয় আমার সমাধি পরে’ গোছের হবে। আর উল্টো পিঠের গানটা…..ঐতো, মিস লাইট না তারকবালার গাওয়া ‘শেফালি তোমার আঁচলখানি’র মত। ঠিক মনে সেই। এইগান বাজানো নিয়ে দিদির মুখে একটা ঘটনা শুনেছি। ওস্তাদ যেদিন গ্রামোফোন যন্তরটা তোর মাকে খুশি হয়ে উপহার দেয়, সেদিন তোর মা’র গানের রেকর্ডটা ওস্তাদ সেখানে বাজিয়ে খুব বাহবা দিয়েছিল তোর মাকে। তাই শুনে পরদিনই তোর বাবা চণ্ডালের মত আর সব রেকর্ডগুলি আছড়ে ভেঙে ফেলেছিল। শুধু তোর মারটা পারেনি। সেটা সে আগেই সরিয়ে ফেলেছিল। সেটা গ্রামোফোন যন্তরটার সঙ্গে পাওয়া গেছে।
: মাকে সবাই কুলটা বলত কেন। গান গাইলেই কি তাকে সমাজে অপাংক্তেয় করে কুলটা বলতে হবে? গানের সঙ্গে স্বভাব-চরিত্রের কি সম্পর্ক। ঘরে থাকলেই কি সে সতী হোত?
: তখনকার সমাজব্যবস্থাই সেরকম ছিল। অথচ চার দেয়ালের মধ্যেও তো চোরা অসতী কম ছিল না। আসলে এসবই ইর্ষা থেকে, পরশ্রীকাতরতা তার ওপর মেয়েছেলেদের পায়ে শেকল বেঁধে রাখার চেষ্টা। সেকালের অমন সব মেয়ের কপালেই যেটা জুটেছে। কেউ উতরে গেছে, কেউ তলিয়ে গেছে। এক শ্রেণীর পুরুষও বাদ যায়নি তা থেকে। তাদেরও সমাজে চিহ্নিত হতে হয়েছে। তবে মেয়েদের মত নয়। আর পাঁচজনের থেকে আলাদা হতে গিয়ে তাকে অনেক খেসারত দিতে হয়েছিল। সমাজের নিচু স্তরে মেয়েদের তুল্য হতে হয়েছে।
