আমি কিন্তু ভাবি নি, স্যার, আপনি শেষ পর্যন্ত আসবেন। বিবি বলে। তার মুখে এক ধরনের সুশাস্তি খেলে যায়।
চলে এলাম। আমি কিন্তু সহজে কোথাও যাই না। আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে তো যাই-ই না, বন্ধুবান্ধবের বাড়িতেও খুব কম।
আমি জানি।
তবু তোমাদের বাড়ি কেন যে চলে এলাম হঠাৎ।
বিবির মুখে প্রত্যাশিত খুশির বদলে প্রশ্ন কীর্ণ হয়ে উঠলো। দ্রুত জিজ্ঞেস করলো, কেন, খারাপ লাগছে?
না—বাহ–খারাপ লাগবে কেন? বিবির মুখে লু কীরকম বিমর্ষ সৌন্দর্য। ভেবেছিলাম, ওকে হাসিখুশি দেখাবে খুব। তা না। তবু ওর ভেতরে যে একটা হিরে জ্বলছে, তা-ও বোঝা যায়।
বিবি দাঁড়িয়েই থাকে। সোফা ধরে একটু আলগা হয়ে। আমি বসে থাকি। কী বলবো, ভেবে পাই না। উঠে, একটা বুক-কেসে কিছু বই ছিলো, দেখি। একেবারে সাধারণ বই-টই। তারপর দু-চারটে মামুলি কথা হয়। পড়ার বইটই-এর ব্যাপারে একটু পরামর্শ দিই। জেনেও বিবি আবার জিজ্ঞেস করে নেয় কলেজ কবে খুলবে।
যাবার সময় সত্যিই বিবিকে বেশ বিমর্ষ লাগে। বলে, এর মধ্যে আবার একদিন আসবেন তো, স্যার, কলেজ বন্ধ থাকতে-থাকতে?
দেখি।
দেখি কেন, আসবেন স্যার। আসবেন। একটু কি কাকুতি ফুটলো বিবির গলায়? যেমনই দেখাক তাকে, একেবারে বাচ্চা মেয়ে সে না–কিন্তু আবদারে বোধহয় সব মেয়েই ছোটো খুকিটির মতো হয়ে যায়।
সরাসরি আর ‘না’ করতে পারলাম না, এমনকি নৈর্ব্যক্তিক সুরেও না। বললাম— হয়তো একটু ইতস্তত করেই, কিন্তু ভদ্রতা বাদ দিয়ে নয় বললাম, তুমি একদিন এসো। বিবি কি জানে না, ঘরে তরুণী স্ত্রী আছে আমার? বিবি কি জানে?
আমার কথা থাক। আপনি এর মধ্যে আর একদিন আসছে। সব মেয়ের মধ্যেই কীরকম একটা শান্তির সুর— অঙ্কের শাস্তির সুর লেগে থাকে। আমি তো কোনোদিন পারি না। মিনাকেও দেখি। আশ্চর্য শান্তি ও সুরসাম্য। সকাল থেকে রান্নাঘরে, দুপুরে যথারীতি যথাসময়ে স্নানাহার করে রেডিওর কমার্শিয়াল সার্ভিস শুনতে-শুনতে চুল এলিয়ে ফ্যানের হাওয়ায় ঘুমিয়ে পড়া। আমি পারি না। একটা সফল দিন যাপনের পরেও, দেখি, আমার চোখে ঘুম নেই, ঘন্টার পর ঘণ্টা নিদ্রাহীন চলে যায়, কবিতা লিখতে লিখতে ঠিক শব্দ খুঁজে না-পেয়ে মাথার চুল ছিড়তে ইচ্ছে হয়, আবার একটি কবিতা লিখে শেষ করে তৃপ্তিময় পড়তে-পড়তে দ্বিতীয় কবিতার কাঁটায় বিধে ভেতরে রক্তক্ষরণ শুরু হয়ে যায়। এই সবই ভেবে নিলাম এক মুহূর্তে।
বেরিয়ে আসার সময়েও বিবি যখন বলে আপনার জন্যে অপেক্ষা করবো, স্যার— তখন ধক করে ওঠে বুকের ভেতরে। অসম্ভব-বেদনায় আর অসম্ভব-আনন্দে বিহ্বল হয়ে ‘আচ্ছা’ বলে বেরিয়ে আসি।
৫.
ধবল অশ্বের মতো দিন। বছর ফুরিয়ে আসছে। চৈত্র শেষ হাড়ে হাড়ে সূচিত হয়ে গেছে। লাইব্রেরিতে গিয়ে ঠাণ্ডায় বসে থাকি। ম্যাগাজিনের পাতা পাল্টাই। বিদেশি কবিতার সুস্বাদ রঙিন শরবতের মতো পান করি। বিদেশি কাগজের ঘ্রাণ নিই সোফার আরামে ডুবে গিয়ে। আমার পাশে একটি কিশোর লুকিয়ে ম্যাগাজিনের পাতা থেকে ব্লেড দিয়ে এক নিতম্বিনীর ছবি কাটছে। আমি আড়চোখে দেখি। একটুও উত্তেজিত হই না। মুচকি হাসি। কবিতার শব্দে মৌমাছির মতো উড়ে-উড়ে বসে আমার চোখ। তিরিশ পেরিয়ে এসে আস্তে আস্তে জীবনের সবকিছু, নিরুত্তেজ শান্তিতে দেখতে পাই, অনেকটা মেয়েদের মতো নিরুত্তেজ শান্ত নির্মোহ দৃষ্টিতে, নিরাসক্ত নক্ষত্রের মতো। বয়সের দান? তবু পুরোপুরি সুস্থ ও শান্ত হতে পারছি কই। ভেতরে ছুটছে ঘোড়া, কবিতার শব্দ থেকে শব্দে তার খটাখট খটাখট শব্দ উঠছে, বুকের নক্ষত্র অব্দি ধুলো উড়ছে।
হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যায়। পৃথিবীর আদিম আঁধার নেমে আসে সভ্যতার কেন্দ্রমণি এই গ্রন্থাগারে। নিউইয়র্কের হাজার-হাজার আলো-জ্বলা রাত্রিতে ব্রাজিলের গভীর অরণ্যের অন্ধকার। হঠাৎ সচেতন হয়ে উঠি, এতোক্ষণ তাহলে একটা ধ্বনিময়তার মধ্যে ছিলাম। আমি চলে যাবার পর এমনিভাবে কি জেগে উঠবে আমার লেখা? তারপরই নিহিত ঝিঝিদলের ঝংকার শুরু হয়ে যায়। আলো জ্বলে ওঠে। ওদের নিজস্ব জেনারেটর চালু হয়ে গেছে। কিন্তু আমি তখন কোথায়?
৬.
পিকনিক করতে গেছি কোন্ দূর বনে। আমরা ক’জন। ডালিয়া একসময় চলে আসে ভিড়ের ভিক্স থেকে আমার পাশে। কলাগাছের দঙ্গলে অন্ধ চামচিকে ঘোরে। ওমা! ডালিয়া আমাকে জড়িয়ে ধরে। কলাগাছের বনে ওড়ে অন্ধ চামচিকে।
৭.
চৈত্রমাস হা-হা করছে নগরীর পথে-পথে।
বিবি আর আমি গিয়ে বসি আইসক্রিমের ঠাণ্ডা দোকানে। মেয়েদের নিয়ে বসবার ভেতরের রুমটায় দুটি ছেলেমেয়ে এমন ভঙ্গিতে বসে যে, বাধ্য হয়ে বাইরে বসতে হয়। দুপুরবেলা এখন ভিড় নেই।
এখানে আবার কেউ দেখবে না তো? কেন তোমার ভয় লাগছে নাকি?
আমি সকৌতুকে জিজ্ঞেস করি।
না, আমার কী। আপনাকে নিয়েই তো ভয়। আপনি আবার, স্যার, অধ্যাপক মানুষ। কে কোথায় ছাত্র-টাত্র দেখে–।
ওরকম ভয় যে নেই, সত্যি কথা যদি বলতে হয় তাহলে তা আমি বলতে পারি না। ভেতরের রুমটায় বসতে পারলেই ভালো হতো। কিন্তু যা অবস্থা। আইসক্রিম খেতে-খেতে বারবার ভেতরে গিয়ে পড়ছে চোখ ভালো করে তাকাতে পারছি না। ছেলেটা বসে বসে কী করছে, কোথায় হাত দিচ্ছে জানি না, কিন্তু মেয়েটা বসেবসেও বারবার পা-টা লম্বা করে শুয়ে পড়ার মতো করছে। শীৎকারের ধ্বনি কি ভেসে এলো একবার? আমি তো ভাবতেই পারি না। ইউনিভার্সিটির ছেলেমেয়ে নাকি? প্রেমিক প্রেমিকা নাকি? আমরাও তো একসময় ইউনিভার্সিটিতে পড়েছি। মেয়েদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে শুধু বুকের ভেতর না, পা অব্দি কাঁপতো।
