বলে, নিজের পেটের মেয়েকে অভিশাপ দিতে দিতে দিদিমা নিঃশব্দে কাঁদতেন। কাঁদতেন, আবার প্রশংসা করতেন। ভারি মিষ্টি গলা ছিল চরির। চরি অর্থে চারুবালা। মিষ্টি করে কথা বলত বলে ওর বাপ ঐ নাম রেখেছিল। ছোটবেলা থেকেই ঈশ্বর তাকে ঐ গুণটি দিয়েছিলেন। রেকর্ডের নাম সুহাসিনী। সুহাসিনীবালা। তখন ওটাই রেওয়াজ ছিল। নামটা দিয়েছিল কাশী। ওর গানের মাষ্টার। ছোটবেলায় যখন তিনি ‘যবে তুলসীতলায় প্রিয় সন্ধ্যবেলায়’ গুণগুণ করে গাইতেন, চরি তখন তাঁর সঙ্গে গলা মেলাতো। কার গান তিনি জানেন না, রেডিও থেকে শোনা। কিন্তু মেয়ের গলায় যেন ভারি ভাল লাগত। সেই থেকে চরির গান শেখা। কিন্তু সেটা আর বেশিদিন হয়ে ওঠেনি তের পেরিয়ে চোদ্দয় পা দিতেই ভাল পাত্র পেয়ে ওর বাবা মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিলেন।
এসব কথা শশীর বড় হয়ে শোনা। যখন এগারো বারো বছর বয়স। তখন মাকে দেখবার ইচ্ছা বা রেকর্ডে কণ্ঠস্বর শুনবার বাসনা, কোন কিছুই অনুভব করার মত তেমন করে মন তৈরি হয়নি তার।
তারপর থেকে কোথায়, কোন্ অতলে তলিয়ে গিয়েছিল মায়ের স্মৃতি। বড় হয়ে যে বাপকে সে কাছে পেয়েছিল, তিনি তখন প্রায় বদ্ধ পাগল। দিদিমা তখন নেই। দাদা তার আগেই মারা গেছেন। তাকে তার মনেও পড়ে না। সেই সময় মেঘু মামা তাকে একদিন বাপ চেনাতে রিষড়ায় নিয়ে গিয়েছিল। প্রথমটা দেখে মনেই হয়নি বদ্ধ পাগল। গেরুয়া বসন, গলায় মোটা রুদ্রাক্ষের মালা, হাতে মোটা বালা, কপালে ধ্যাবড়ানো রক্ততিলক। মেঘুমামা কাছে গিয়ে নিশিবাবু, এই আপনার ছেলে শশী, শশীকান্ত বলে তাকে এগিয়ে দিতেই তিনি লাল টকটকে চোখ তুলে সস্নেহে হেসে বলেছিলেন, ওমা, তাই নাকি! আমার ছেলে? বাঃ, বেশ ডাগরটি হয়েছে তো? বাপকে দেখতে এসেছ? বেশ বেশ।
তারপরই প্রচণ্ড হুংকার, কুলটার ছেলে। আমার সুখের সংসারে আগুন লাগাতে এসেছিস? বেরো বেরো। ওরে কে আছিস, কুলটার ছোঁড়াটাকে গলা ধাক্কা দিয়ে গেটের বাইরে বের করে দিয়ে গোবরজল ছিটিয়ে দে।
তারপরও শশী বারকয়েক তাকে দেখতে গিয়েছিল। শত হলেও জন্মদাতা বাপ তো বটে। সেইসঙ্গে একটা কৌতূহলও ছিল। মানুষটার এই অবস্থা হোল কি করে।
যতবার গিয়েছে, সম্মা আদর করে তাকে কাছে টেনে নিয়েছেন, গায়ে মাথায় সস্নেহে হাত বুলিয়ে দিয়েছেন, যত্ন করে ভাল-মন্দ খাইয়েছেন। এপক্ষের ছেলে মেয়েদের ডেকে বলেছেন, প্রণাম কর তোদের বড়দা হয়।
তারও পরে একদিন মুখ ফুটে কারণটা বলেছেন। তুমি এখন বড় হয়েছ, তাই বলা যায়। তোমার বাবা এই বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই আমাকে সন্দেহ করতে শুরু করেন। সন্দেহ থেকে ভয়। ভয়, তোমার মা ফিরে এলে আমরা দু’জনে মিলে ওকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলবো। তোমার বাবা বলতেন, কুলটাকে আমার একদম বিশ্বাস নেই। সে সব করতে পারে। যে নিজের পেটের সন্তানকে বুকের দুধ না দিয়ে……না, থাক। সে সব কথা তোমার ভাল লাগবে না। তবে এটুকু বিশ্বাস কর, আমি তা বিশ্বাস করিনি। তোমার মা তোমার বাবার অনুমতি না নিয়ে গ্রামোফোন রেকর্ডে গান গেয়েছিল বলে তোমার বাবাই তাঁকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেন। বাকিটা তোমার মামার কাছ থেকে জেনে নিও।
সে কাহিনী অবশ্য মেঘুমামা তখন বলেননি। বলেছিলেন অনেক পরে। ছাদের চিলেকোঠা পরিষ্কার করতে গিয়ে চোঙওলা পুরনো গ্রামোফোনটা আবিষ্কারের সময়। তার মধ্যে একটা রেকর্ডও ছিল। সেটা তার মা’র গানের। বলেছিলেন, এটা তোর মা’কে সেকালের এক বড় ওস্তাদ গান শুনে খুশি হয়ে দিয়েছিলেন। সঙ্গে তার ট্রেনিঙে গাওয়া সেকালের কয়েকজন মেয়ে শিল্পীর গানের কিছু রেকর্ড। সঙ্গে তোর মা’র রেকর্ড। ঐ একটা রেকর্ডই বেরিয়েছিল টুইন কোম্পানি থেকে। তাই থেকে আত্মীয়-স্বজনরা তারে কুলটা বলেছিল।
এতকথার পরেও মেঘুমামা মা। পরবর্তী জীবনের কথা খুলে বলেননি। শুধু বলেছিলেন, এই গ্রামোফোনটা তোর বাবাই এবাড়িতে পৌঁছে দিয়েছিলেন দ্বিতীয়বার সংসার করার পর। এটায় নাকি পরিবারের শুচি নষ্ট করবে, গেরস্তের অকল্যাণ করবে। বাড়িতে পাপ ঢুকবে।
শুনে বাপের ওপর ঘৃণা হয়েছিল শশীর। খুন চড়ে গিয়েছিল মাথায়। মেঘু মামাই তখন তাকে শান্ত করেছিল। বলেছিলেন, এসব তখন ভাল চোখে দেখত না মানুষে। ঘরের মেয়ে বাইরে গান গাইলে, থিয়েটার-টিয়েটার করে সমাজে ইজ্জত নষ্ট হোত। মেয়েকে বিয়ে দিতে কষ্ট হোত। এটা রেডিও চালু হবার পরও অনেকদিন ছিল। অথচ মানুষ তাদের গান শুনে, থিয়েটার দেখে প্রশংসাও করত। তবে নিজের বাড়ির মেয়েকে বাদ দিয়ে। একটু শিক্ষিত, রুচিশীল, যাদের ঘরে গ্রামোফোন, রেডিও ঢুকেছে, তারা অবশ্য অতটা বলত না। তবে সে আর ক’জন। ঐ শিক্ষিত, পয়সাওলা, জমিদার-টমিদারদের বাড়িতেই ঐসব শোভা পেত। আমাদের ছোটবেলায় পরের বাড়ির জানালার খড়খড়ি তুলে গোপনে রেডিও রেকর্ডের গান, নাটক শুনতুম। গ্রামোফোন রেডিও দেখে চক্ষু সার্থক করতুম। সে যে কি থ্রিল! বোঝানো যাবে না।
শুনে কিছুক্ষণ শশী চুপ করে রইল। তারপর এক সময় গলা নামিয়ে বলল, যারা গাইতে তারা বাই সত্যি সত্যি কুলটা ছিল?
মেঘুমামা সঙ্গে সঙ্গে সে কথার উত্তর দিলেন না। পরে বললেন, কুলটা হতে যাবে কেন? ঐ লোকের ধারণা। মেয়েদের গানবাজনা তো তখন বাইরের জন্যে ছিল না। শখ করে কিংবা বিয়ে-পার করানোর জন্যে বাড়ির লোকেরা মাষ্টার রেখে মেয়েদের দুচারটে শ্যামাসঙ্গীত ধরনের ভক্তিগীতি শেখাতো। বিয়ে হয়ে গেলে সব শিকেয় উঠত।
