জুলেখা ছুটে এল শোবার ঘর থেকে, অমন করছ কেন? কী হয়েছে?
দু-চোখে আগুন জ্বেলে তাকাল ফরিদ, কী হয়েছে? বুক-কেসের উপর ফটো কই? তোমাদের কাছে খারাপ লাগত, তাই সরিয়ে দিয়েছ, না? এ ঘরে বসে গল্প করতে, জোড়া ছবি চোখে কামড়াত, আমাকে পাশে দেখতে খারাপ লাগত, আর একজনের জায়গা ঐখানে কিনা।
জুলেখা আস্তে-আস্তে বলে উঠল, ক্ষীণ ঠাণ্ডা, নিপ্রাণ শোনাল তার গলা, বুক কেসের উপর জোড়া ছবি কখনো ছিল না। তুমি শোবার ঘরে রাখতে বলেছ। ড্রেসিং টেবিলের উপর সবসময়েই রাখা আছে।
ফরিদ জবাব না দিয়ে ছিটকে শুধু ঘর থেকে গেল বেরিয়ে। দপদপ করছে মাথা, জ্বলছে সারা শরীর, মনে পড়ছে জোড়া ছবি শোবার ঘরে রাখা। তবু জুলেখা গল্প করেছে তো ওখানে বসে কতদিন, হেসেছে মদির হয়ে, আদর করেছে রাস্কেলটাকে; ঘরে পা দিলেই ঐসব স্মৃতি প্রেতের মতো তাকে হানা দিয়ে ফেরে, সে কী করবে, কী করবে।
অফিসে বস তাকে ডেকে পাঠাল। একহারা গড়ন, একটু গম্ভীর মুখ।
চশমা চোখ থেকে নামিয়ে জিজ্ঞেস করল, জরুরি ফাইলটা এখনো ছেড়ে দিলেন না আপনি। আশ্চর্য!
অন্য সময় হলে বলত না ফরিদ। কিন্তু এখন মেজাজ তার খারাপ, সকালবেলার ছাপ দগদগ করছে মনে, তাই বলেই বসল আচমকা, ফাইল তো আমি ছেড়ে দিয়েছি অনেক আগেই। ঐ তো আপনার টেবিলের কোণে।
বস-ওর গম্ভীর মুখ তীক্ষ্ণ হল একটু। চশমা না-থাকায় চোখ ঝাঁপসা, তাই চোখে মনের প্রতিফলন নেই, দ্যোতনাও নেই।
একটু বিরতি নিয়ে শুধু বললেন, আচ্ছা আপনি আসুন।
তিক্তবিরক্তিতে ফরিদ এল বেরিয়ে। সেইসঙ্গে চাপা একটা অপমান বোধ শিরায় শিরায় ছড়িয়ে গেল। কোনো কিছুই ঠিক জায়গায় নেই বলেই তার বোধ হল। স্ত্রীর নয়, সে নয়, সবাই কেমন বিশৃঙ্খল হয়ে আছে। স্ত্রী আর নয় এখন বন্দরের মতো নিরাপদ। বস নয় এখন ভদ্র যান্ত্রিক নিখুঁত প্রতিনিধি।
নিজের ঘরে এসে চোখ বুজে বসে থাকল ফরিদ কতক্ষণ। ফ্যান ঘুরছে, শব্দ উঠছে ধাতক নিয়মিত স্পন্দনে। পাশের ঘরে কাদের কথা কোলাহল হয়ে উঠছে। ঝিরিঝিরি বাতাসের প্রার্থনা জাগল ফরিদের, ঠাণ্ডা, শীতল, দীঘল নদীর স্রোতের মতো ঝিরিঝিরি বাতাস গাছে, পাখি পাখালিতে ঢেউ তুলে-তুলে মিলিয়ে যায় কেবলি, যেখানে শান্তি, সান্ত্বনা।
পায়ের শব্দ শুনে চোখ মেলে তাকাল ফরিদ। আনোয়ার, তার সহকর্মী, চেয়ার টেনে বসে পড়েছে।
প্যাডের উপর পেন্সিল বুলোল আনোয়ার, বেল বাজাল খামোকা, পরে বলল, তোমার কী হয়েছে? শরীর খারাপ?
ফরিদ জবাব দিল, না।
একটু থেমে, বেশ দ্বিধার সঙ্গে যুঝে আনোয়ার ফের বলল, মন খারাপ করতে নেই। যা হওয়ার তো হয়েই গেছে। মানিয়ে চল, সংসারে ভুল বোঝাবুঝি হয়-ই।
আশ্চর্য দৃষ্টি তুলে তাকাল ফরিদ। কী বলছে আনোয়ার। অদ্ভুত কিংবা অজানা ভাষা যেন তার জিভের ডগে।
ফরিদের বলতে ইচ্ছে করল চেঁচিয়ে, তোমার স্ত্রীকে নিয়ে কেউ পালালে তুমি বুঝতে। কিন্তু কিছুই বলল না ফরিদ। চাপা উত্তেজনা আস্তে-আস্তে মনের মধ্যে গেল। ছাই হয়ে। ক্লান্ত, নিঃসঙ্গ, শূন্য বোধ হল নিজেকে। কিছুই স্থায়ী নয়, বিশ্বাস কোথাও নেই, শুধু সন্দেহ, তিক্ততা ছড়ানো সব কিছুতেই। আর জুলেখাই যেন শিখিয়েছে তাকে এই সন্দেহ তিক্ততা অবিশ্বাস।
কয়েক লহমা চুপ করে থাকল ফরিদ, কথা বলতে গিয়েও ফের চুপ করে গেল। চোখ ঝাঁপসা হয়ে এল। একটা সর্বগ্রাসী ধূসরতা তাকে গিলে নিল, আর সেইদিকে নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকল আনোয়ার।
ধূসর কণ্ঠস্বর – শান্তিরঞ্জন চট্টোপাধ্যায়
শশীকান্ত প্রথমে উবু হয়ে পরে হাঁটু মুড়ে প্রায় শোবার ভঙ্গি করে রেকর্ডটার ওপর ঝুঁকে পড়ল। সেই এক গোঁ গোঁ শব্দ রেকর্ডের খাঁজ থেকে বেরিয়ে আসছে। ঠিক কান্না নয়, কেমন একধরনের গোঙানির মত। আজ তিন দিনের মাথায় এইটুকু হয়েছে।
প্রথম দিন অনেক ঘষামাজার পর রেকর্ডটা গ্রামোফোনের প্লেটে চড়াতেই আচমকা কেমন এক ধরনের আর্তনাদ বেরিয়ে এসেছিল রেকর্ডের প্লেট থেকে। ক্রমে সেটা বাড়তে বাড়তে ঘরের আবহাওয়া ভারি হয়ে ওঠে। মেখু মামা তখন তড়িঘড়ি রেকর্ড থেকে পিনটা তুলে মেশিন বন্ধ করে বলেছিলেন, ভেবেছিলুম তাৰ্পিন তেলে এটা পরিষ্কার হবে। এখন দেখছি এর ওষুধ অন্য।
পরদিনই তিনি গৌরবাবুর হারমোনিয়াম সারাইর দোকানে গিয়ে জেনে এসেছিলেন, তারপিন তেলে না হলে স্পিরিটে প্লেটটা সাফ করে নিতে হবে। তুলো দিয়ে নয়, পুরনো ফর্সা ধুতির টুকরো দিয়ে যত্ন করে ঘষতে ঘষতে দেখবে যেন রেকর্ডের ভেতরকার লাইনের খাঁজে খাঁজে সেটা ঢুকে বসে যায়। বারকয়েক ঘষলেই দেখবে সরুসুতোর মত কিছু একটা বেরিয়ে আসছে।
কিন্তু তাতেও কিছু হয়নি। আর্তনাদ ছাড়া কোন কথা বলেনি রেকর্ড। শশীর মাথায় তখন খুন চেপে গিয়েছিল। মনে হয়েছিল, থাক মায়ের কণ্ঠস্বর শোনা, আছাড় দিয়ে ভেঙে ফেলে রেকর্ডটাকে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজেকে শান্ত করে নিয়েছি। শত হলেও মা। তার যখন তিন সাড়ে তিন বছর বয়স, তখনি সে তার মাকে হারায়, সেই থেকে শশী মামাবাড়িতে বড় হয়েছে।
বাবা ফের বিয়ে করে নতুন সংসার পেতে তাকে নিতে এসেছিলেন। দিদিমা ছাড়েননি। বলেছিলেন, সার কাছে তার নাতি মানুষ তোক এটা তিনি চান না। লোকে যতই বলুক, অনেক সৎ-মা’ও ভাল হয়, তিনি তা বিশ্বাস করেন না। যদ্দিন না নিজের সন্তান হয়, তদ্দিন পর্যন্তই ঐ আদিখ্যেতা। হলেই কুকুর বেড়ালের মত ব্যবহার।
