-কি ব্যাপার? ঘুম থেকে উঠে হাত মুখ না ধুয়ে এসব কি করছো? আররি প্রশ্নে মুখ তুলে নিরঞ্জন বললো—
–বাঃ—যেতে হবে না?
—কোথায়?
–এবার একটা ভালো হোটেলে যাব।
—কেন? পরীক্ষায় পাশ করেছি-তাই?–
–না, না, তা নয়লজ্জা পেল নিরঞ্জন—এমনিতেই অনেক কষ্ট দিয়েছি তোমায়। আর–
–কিন্তু আমি যে আর কোথাও যাবো না।
–মানে?
—এই হোটেলেই থাকবো।
নিরঞ্জন উঠে দাঁড়ালো। কোন এক সম্মোহনী টান ওকে টানছে আরতির দিকে। দু’হাত বাড়াল নিরঞ্জন। দু’চোখের মধ্যে অসীম সমুদ্রের ঢেউ। যা এখন আছড়ে ভেঙে পড়তে চাইছে আরতির বুকে, মুখে, সমস্ত শরীরে।
ধূসর – বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর
স্ত্রী তার প্রেমিকের সঙ্গে পালাতে গিয়ে যেদিন ধরা পড়ল, তারপর থেকেই সে গেল বদলে। কোনোকিছুতেই যেন স্বস্তি নেই ফরিদের, কোথাও কোনো শান্তি নেই, বাড়িতেও নয় অফিসেও নয়। সবকিছুই মনে হয় এলোমেলো, উদ্ভট ও বিশৃঙ্খল। বন্ধুদের আলাপ যেন ব্যঙ্গ লুকননা, এমনকি করুণা। পরিজনদের সান্ত্বনা যেন উপদেশের বীজভরা: ভালোবাসার মেয়েকে বিয়ে করো না, আমরা বলিনি সবাই তখন!
কিন্তু কী ক্ষতি করেছে সে ভালোবাসার মেয়েকে বিয়ে করে? ভালোবাসে মানুষ বিশ্বাসে নিবিড় হয়ে, বিয়ে যেন সেই নিবিড় বিশ্বাসের প্রতীক।
সেই কবেকার কথা মনে পড়ে।
জুলেখা বলেছিল। টাকা হাতে এলে আমায় একটা রেনকোট কিনে দিও।
দিনটা ছিল বৃষ্টির, বিয়ের আগের সেই বৃষ্টি উচ্ছল দিন, রিকশা চেপে কোথাও তারা যাচ্ছিল বুঝি। শাদা কাপড় পরা ট্রাফিক পুলিশ, মাথায় কালো ছাতা, একা নিঃসঙ্গ রাস্তার মোড়ে, সেদিকে তাকিয়ে ফরিদ বলেছিল, রেনকোট কেন, সবই তো তোমার। নয় জুলি?
উল্টোদিকে নীলরঙা একটা মোটর ট্রাফিক-পুলিশের সংকেতের আশায় দাঁড়ান। ঝাঁপসা উইন্ডস্ক্রিনের মধ্যেও দেখা যায় এক মহিলার মুখ, অপলকে তাদের দিকে তাকিয়ে। ফরিদ তাকাল জুলেখার চোখে। জুলেখা হাসল, নিঃশব্দে, চূর্ণ-চূর্ণ বৃষ্টির মতো ছড়িয়ে গেল সে হাসি, চুল থেকে শ্বসিত হল একটা গন্ধ, বুঝি কদম ফুলের, তাই মনে হল ফরিদের, যে কদম ফুল একলা আকাশের তলায় বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে গন্ধ ছড়ায় অনেক দূর।
কিন্তু এখন? সব দেয়ার পরও জুলেখা মন করল কী করে? খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জেনেছে, প্রশ্নের পর প্রশ্ন করেছে, ফরিদ পাগলের মতো। আলাপ করা, চিঠি লেখা, অন্তরঙ্গ হওয়া বাদে আর কী করেছে জুলেখা! আর কী করেছে তার জবাব জুলেখার জানা নেই।
ফরিদ ফের তাই জিজ্ঞেস করেছে, তুমি আগে লিখেছ, না ঐ রাস্কেলটা লিখেছে?
শান্ত, নির্লিপ্ত বুঝি জুলেখার স্বর, আমিই লিখেছি আগে।
ফরিদ থেমে যায়। হঠাৎ মত্ততা স্তম্ভিত হয়ে যায় অমন স্বীকারে। জুলেখার যে জবাব জানা নেই ফরিদ তা জানে। সানাই বাজানো রাতে, তারো আগের তন্ময়। দিনগুলি রাতগুলিতে যে-বিশ্বাসের জন্ম তা গেছে ভেঙে। তাই প্রশ্নের পর প্রশ্ন, একই জবাব শুনে যেন নিস্তার নেই, রেহাই নেই, দারুণ একটা অস্বস্তি ফরিদের হৃদয় মনের প্রতে পরতে জড়ানো। যাকে ভালোবেসেছে, ভালোবাসার বিশ্বাসে বিয়ে করেছে, সে-ই যদি বিয়ের পর বিশ্বাস ভেঙে দেয়, তাহলে কী থাকে! জুলেখা কী করেছে যন্ত্রের মতো বলে গেছে, দীর্ঘ এক তালিকা যেন। একসময় ভেবেছিল মনই স্থায়ী। এখন মনে হয় কোনোকিছুই স্থায়ী নয়, যদি হত জুলেখা অমন করতে পারত না কিছুতেই। তবু সে বিশ্বাস ফিরে পেতে চায়, জীবনে কোথাও কিছু স্থায়ী আছে সেই বিশ্বাসে আশ্বস্ত হতে চায়। না-হলে অনন্ত অবিশ্বাস সন্দেহের মত্ততা নিয়ে কী করে এখন সে বাঁচবে।
বিয়ের পরের সেরাতের কথা মনে পড়ে। দেয়ালে ক্যালেন্ডার, নীল পাহাড়ের চূড়ো আঁকা। বেশ কটি নীল পাহাড় হঠাৎ মিলে গিয়ে শাদা চুড়োটি পড়েছে বোধহয়।
ফরিদ ক্যালেন্ডারের পাতায় চোখ বুলিয়ে বলে উঠেছিল, চল ছুটি নিয়ে ঘুরে আসি কদিন।
চুলে বিলি কাটতে কাটতে জুলেখা বলেছিল, জানো ঘোরাঘুরি নয়। বড় দুঃস্বপ্ন দেখেছি কাল।
কী দেখেছ বল না, বুঝি উতল উদগ্রীব ফরিদের গলা।
একটু থেমে আস্তে-আস্তে বলেছিল জুলেখা, দেখেছিলাম তোমার ভীষণ একটা এ্যাকসিডেন্ট হয়েছে। তোমার একটা নানা আমি বলতে পারব না।
অনাগত দুর্ঘটনার ছায়া যেন ঘরজুড়ে। জুলেখার মুখ ম্লান, রোদনের ভারে চোখ বুঝি ছলছল।
ফরিদ একটু জোর করেই বলে উঠেছিল, তুমি একটা পাগল। স্বপ্ন কখনো সত্যি হয়।
জুলেখা যেন সেকথা শুনতেই পায়নি, তেমন যদি কিছু হয় বু তোমাকেই নিয়ে আমি বাঁচব। আমার মন তোমাকে ঘিরেই যে বেঁচে থাকে, তুমি জানো না।
পরম মন্ত্রের মতো কথাগুলি ঘরজুড়ে ছড়িয়ে গেল, পরম আশ্বাসের মতো সব অমঙ্গল ঝেটিয়ে নিল, পরম শান্তির মতো নমিত হয়ে এসেছিল জুলেখার চোখ ফরিদের চোখে চেয়ে।
সেই বিশ্বাস আজ নেই, আশ্বাসও নয়, শান্তিও নয়। স্ত্রীকে এখন মনে হয় ফরিদের ভার, দুঃস্বপ্ন, আতঙ্ক, কয়েদি, যে কেবল পালাবার সুযোগ খোঁজে। চেনা ঘর,
অফিসের কাজ সবই মনে হয় ঝুলোনো, এলোমেলো, বিশৃঙ্খল।
সকালবেলা অফিসে যাওয়ার সময় ফরিদের হঠাৎ বোধ হল আসবাবপত্র বড় অগোছাল। রেডিওর পাশের নিচু চেয়ার বহুদূরে সরানো, বুক-কেসের উপর তাদের যুগল ছবি উধাও।
চেঁচিয়ে উঠল তাই ফরিদ, ঘরে বসে কি কর তোমরা? সব এলোমেলো, ছত্রখান হয়ে আছে।
