—আরতি, তোমার কি কেনাকাটার আছে বলো তো?
–বিশেষ কিছু না।
–তবু–
—যদি রাগ না করো, অনেক দিনের ইচ্ছে বাবার জন্য একটা শাল…
মুগ্ধ বিস্ময়ে একটার পর একটা শাল দেখছিল আরতি। পাশে নিরঞ্জন অনেকক্ষণ ধরে একটা শাল নিয়ে কি যেন ভাবছিল।
—কি ভাবছো? জানতে চাইল আরতি।
—না–কিছু না—
—ওটা তোমার জন্য নাও না—খুব ভালো।
—এবার বেশী খরচ করা যাবে না—তোমার যা নেবার নাও।
ভিড়ের মধ্যে নিরঞ্জনকে একপাশে টেনে নিয়ে এল আরতি
—আমি বলছিলাম কি ঐ শালটা তুমি নিয়ে যাও বাবার জন্য পরে কিনবো—তাছাড়া কলকাতায়ও তো পাওয়া যায়। দেখলে না—আমি নিজের জন্য কিছুই দেখলাম না। কলকাতায় কিনবো’খন। তবে তুমি যে শালটা দেখছিলে ওরকম কলকাতায় পাবে না।
না, না, তা হয় না–তুমি বাবার জন্য নিয়ে নাও।
—সে আমি পারবো না।
—তবে আজ চলো–কাল দেখা যাবে।
দোকান থেকে বেরিয়ে এসেছিল দু’জনে। আরতি কষ্ট পায়নি। কিন্তু কেমন যেন অদ্ভুত লাগছে তার। নিরঞ্জন টাকা পয়সার কথা ভেবে একটা শাল কিনলো নাসত্যি, স্বামীর নতুন একটা রূপ দেখল আরতি—এ ক’দিনে। হঠাৎ কেমন যেন মনটা খারাপ হয়ে গেল ওর। ব্যবসায় কোনরকম গোলমাল হয় নি তো? হঠাৎ টাকা পয়সা আটকে গেল কোথাও? কিন্তু তাই বা কি করে হবে? আসার আগের দিন রাত্তিরেই তো প্রায় জনা পঁচিশ বন্ধুবান্ধব নিয়ে পার্টি দিল। তাহলে? নিজের ওপর হঠাৎ রাগ হল আরতির। বাবার জন্যে শালের কথাটা না বললেই হ’ত। সেকেণ্ড ক্লাসে আসা, এই হোটেলে থাকা, এ সমস্ত দেখে তার বোঝা উচিত ছিল, যে কোন কারণেই হোক, নিরঞ্জন একটু অসুবিধেয় আছে। অন্তত আর্থিক ব্যাপারে। কে জানে কি ভাবল ও। কিন্তু…না, কিছুতেই মেলাতে পারছে না আরতি। আসার দিন সকালেও নিরঞ্জন আরতিকে বেশ কিছু টাকা দিয়ে বলেছিল-রাখো, বেড়াতে যাচ্ছো, তোমার লাগতে পারে। আরতি সে টাকা নেয়নি। ঞ্জিনের সঙ্গেই তো থাকবে সারাক্ষণ—আলাদাভাবে কি দরকার হবে তার? এখন এই মুহূর্তে, কিছুই বুঝতে না পারায়, অদ্ভুত এক বিষাদ পেয়ে বসছে আরতিকে।
ভোরের দিকে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল আরত্রি। বোধহয় ঠাণ্ডায়। উঠে বসে দেখল গায়ের কম্বল মেঝেয়। বাইরে কোথা থেকে যেন এক ফালি আলো ঢুকেছে ভেতরে। সেই আলোয় নিরঞ্জনের মুখ দেখতে পেল আরতি। কেমন যেন মায়াময়। শিশুর মতো নিশ্চিন্ত। হঠাৎ নিরঞ্জনকে খুব আদর করতে ইচ্ছে হ’ল আরতির। কাল রাত্তিরে সে নিরঞ্জনের আর এক রূপ দেখেছে। আহত, যন্ত্রণাময় এক পুরুষ। ওর ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আরতি খুব কষ্ট পেল—আস্তে আস্তে হাত বোলাল ওর মাথায়। কম্বলটা ভালো করে চাপা দিয়ে দিল গায়ে। কাল রাত্তিরে, ওকে জড়িয়ে অনেকক্ষণ কেঁদেছিল নিরঞ্জন। আর সেই মুহূর্তে, নিজের সর্বস্ব দিয়ে, ওকে সুখী করার শপথ নিয়েছিল আরতি। এখনও ও স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে নিরঞ্জনের বিষাদ মাখানো স্বর। ওর প্রতিটি কথা মূর্ত হয়ে উঠে এই ঘরের অন্ধকারে যেন তৈরি করছে এক অবয়ব। ক্লান্ত পরিত্যক্ত, হতাশাক্লিষ্ট এক মানুষের…।
আরতিকে প্রায় বুকের মধ্যে টেনে নিয়েছিল নিরঞ্জন—খুব আস্তে বলেছিল
০০একটা কথা বলবো আরতি?
–বলো—
—তুমি আমায় ক্ষমা করো
—কেন?—আরতি অবাক হয়েছিল।
—আমি তোমায় ঠিক চিনতে পারি নি।
আরতি আরো ঘনিষ্ঠ হয় নিরঞ্জনের। কিন্তু ওকে থামায় না। ওর প্রতিটি কথা মন দিয়ে শুনে বোঝার চেষ্টা করে। পারে না। নিরঞ্জনের চোখ মুখ তখন প্রায় ভূতে পাওয়া মানুষের মতোকণ্ঠস্বরে অনুশোচনার ছোঁয়া
—তোমায় পেয়ে আবার নতুন করে বাঁচতে ইচ্ছে করছে আরতি। মাঝে কিছুদিন ঘেন্না ধরে গিয়েছিল এই জীবনে। তুমি—
একটু থেমে থেমে নিরঞ্জন, হয়ত কিছু ভেবে নিয়ে খুব আস্তে আস্তে বলেছিল,
—এর আগেও আমি একবার কাশ্মীরে এসেছিলাম। তখন আমি সবে ব্যবসা শুরু করেছি। প্রায় দিন আনি দিন খাই অবস্থা। সেবারও এসে অঞ্জলিকে নিয়ে এখানে উঠেছিলাম। হাওড়া স্টেশন থেকেই ও অশান্তি শুরু করেছিল। সেকেণ্ড ক্লাসে অসভ্য মানুষদের ভিড়…এই হোটেলে এসে ঘর দেখে প্রায় তখনই ফিরে যেতে চেয়েছিল অঞ্জলি। আমার দারিদ্র্যকে নিয়ে পরিহাস করেছিল। সেবার লান্ডস্লাইডে সত্যি সত্যিই রাস্তা বন্ধ ছিল গুলমার্গের। অঞ্জলি বিশ্বাস করেনি। ভেবেছিল ওটা আমার চালাকি। কৃপণতা। খাওয়ার টেবিলে বসে অকারণ অনেক খাবারের অর্ডার দিতে ইচ্ছেমতো—খরচ সামলাতে আমি প্রায় রোজই অসুস্থ থাকার ভান করতাম। আমার বুড়ো বাবার জন্য একটা মালার কিনেছিলাম—তার জন্যেও… আর বলতে পারেনি নিরঞ্জন। আরতিও আর কিছু বলতে দেয়নি ওকে। নিজের বুকের মধ্যে টেনে নিয়েছিল ওর মুখ। প্রচণ্ড আবেগে-ভালোবাসায়। নিরঞ্জনের চোখের জলে ওর বুক ভিজে যাচ্ছিল। ওর চোখও তখন ঝাঁপসা। সেই মুহূর্তে আরতি চেয়েছিল পৃথিবী তোলপাড় করে সমস্ত সুখ নিয়ে আসতে নিরঞ্জনের জন্য। কানায় কানায় ভরিয়ে দিতে চেয়েছিল ওকে। কিন্তু পরক্ষণেই কেমন যেন অসহায় লেগেছিল নিজেকে—এক ধরনের ভয় পেয়ে বসেছিল। সে কি পারবে? কি আছে তার? না পারুক, তবু চেষ্টা করবে, জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা করবে আরতি।…
বাথরুম থেকে বেরিয়ে আরতি দেখল নিরঞ্জন জিনিষপত্র গোছাতে ব্যস্ত। মুখে মিষ্টি হাসি।
