—তুমি বোধহয় ভাবছো, এত হোটেল থাকতে এখানে এলাম কেন?
–কই না তো’—আমার তো ভালোই লাগছে।
—আসলে–
—কি আশ্চর্য! আমার সত্যি ভীষণ ভালো লাগছে। অসুবিধে যদি কিছু হয়—তোমার হতে পারে—আমার
নিরঞ্জন কিছু না বলে তাকাল ওর দিকে। সেই তাকানোয় ঠিক কি ছিল বোঝাতে পারবে না আরতি। তবে ওর হঠাৎ জড়িয়ে ধরার ইচ্ছে হয়েছিল নিরঞ্জনকে।
—শোনো, আমি একটু বেরোবো। তুমি বরং স্নানটান করে তৈরী হয়ে নাও।
–কোথায় যাবে?
–এই একটু…
–আমায় নিয়ে যাবে না?
–না, না, বেড়াতে যাচ্ছি না বাজারেও নয়—একটু সামনের দোকানে গিয়ে টুকিটাকি…।
—ও আমি বুঝি বাজার ছাড়া, বেড়ানো ছাড়া কিছু বুঝি না—মুখ ফুলিয়েছিল আরতি। তারপরেই হেসে ফেলেছিল।
—যাও ঘুরে এসো। দেরী করো না। বাথরুমে ঢুকতে গিয়েই মাথায় একটা ধাক্কা খেল আরতি। দরজাটা ছোট ছিল খেয়াল করেনি। হাউসকোট আর ভোয়ালেটা রাখতে গিয়ে দেখল কাঠের দেয়ালে কয়েকটি পেকে ঘড়া আর কিছু নেই। নিজের মনেই একটু হাসল সে। ব্যাপারটা সত্যিই কেমন অদ্ভুত লাগছে। বিয়ের পর এই দুমাসে নিরঞ্জনকে যতটুকু দেখেছে তাতে আর যাই হোক আরত্রি এ কথা কখনোই মনে হয় নি যে রিঞ্জন টাকা পয়সা নিয়ে খুব ভাবে। প্রায়দিনই কাজ থেকে ফিরে ওকে নিয়ে চলে গিয়েছে রেস্তোরাঁয়। রব্বিার সকালে হঠাৎ বেরিয়ে পড়েছেদু’জন গাড়ি হাঁকিয়ে-যে দিকে খুশি। আরতিকে অবাক করে দেবার জন্য প্রায়ই কিনে এনেছে দামী দামী শাড়ি-পারফিউম, সাবান আরো কত কি! আররি খুব সিনেমা দেখার শখ শুনে এই তো সেদিন, নিরঞ্জন একটা ভিডিও টেপ নিয়ে এল বাড়িতে সেই রিঞ্জন সামান্য কিছু পয়সা বাঁচাবার জন্যে, হঠাৎ..কে জানে?
বাথরুম থেকে বেরিয়ে জানালার কাছে একটা চেয়ার নিয়ে বসল আরতি। হাতে চিরুনী। সামনে লেকের মধ্যে সারি সারি নৌকো। জলের ওপ্র লম্বা দাগ টেনে রঙীন নৌকার চলে যাওয়া দেখতে দেখতে সামনের আকাশে চোখ রাখল আরতি। এক ঝাক পানকৌড়ি। ছন্দময় তাদের গতি। যেন আকাশ জুড়ে আলপনা আঁকছে। হঠাৎ একটু উদাস হয়ে গেল আরতি।
—কি পাখি বলো তো?
—পানকৌড়ি।
–দ্যাখো কেমন অদ্ভুত নক্সা কেটে উড়ছে আকাশেযেন এই বিকালবেলাটাকে মোহময় করে দেবার দায়দায়িত্ব আজ ওদের ও। যেন তোমার আমার এই মিলনমধুর ক্ষণটাকে স্মরণীয় করার…
খুব ভালো কথা বলতে পারত শেখর। পরম মুগ্ধতায় ওর কথা শুনতে শুনতে কতদিন সমস্ত চরাচর ভুলে থেকেছে আরতি। তখন শেখকে ছেড়ে এক মুহূর্তও থাকার কথা স্বপ্নেও কি ভাবতে পারত সে? না, বোধহয়। অথচ, বাবার কথায় কোন আপত্তি না করে কি করে নিরঞ্জনের ঘরে চলে এল—কোন অভিমানে? নাকি বাউণ্ডুলে শেখরের ওপর ভরসা রাখতে পারল না সে? একথা ঠিক, শেখ তাকে ভাবাসতো। কিন্তু বিয়ে করে তাকে ঘরুণী করার সামর্থ্য অর ছিল না। কেননা মামার সংসারে শের নিজেই ছিল পরগাছা। তবু হয়তো। না, আরতি আর ভাবতে চায় না এসব। শেখরকে সে ভালোবাসতো ঠিকই, কিন্তু রিঞ্জনকে নিয়েও তার কোন অসুখ নেই। শে তার স্বপ্নের বাসিন্দা আর নিরঞ্জন বোধহয় মরে দেবতা। না, তখন বোধহয় নিরঞ্জনও তার স্বপ্নের সহ।…
—কি ধর মেমসাহেব? রেডি?
—অনেকক্ষণ। এত দেরী করলে যে।
—খবরাখবর নিচ্ছিলাম। একটা গোলমেলে খবর আছে।
—কি?
–গুলমার্গ, পহেলগাঁও যাওয়া হচ্ছে না আমাদের।
—তাতে কি হল?
–বাঃ, কত আশা করে আছো–
—শোনো, গুলমার্গ তো দূরে কথা, আমি যদি এই ঘর থেকেও আর না বেরোই, আমার কোন ক্ষোভ নেই।
–সত্যি বলছো?
–সত্যি, এমন সুন্দর একটা পরিবেশ সঙ্গে তুমি, আর কি চাই?
–তোমার কষ্ট হচ্ছে না?
–না, বিশ্বাস করো—
এগিয়ে গিয়ে নিরঞ্জনের বুকে মাথা রাখল আরতি। নিরঞ্জন তুলে ধরল ওর মুখ। আরতি দেখল নিরঞ্জনের চোখে এক অপরূপ আনন্দের আভাস। কিসের আনন্দ নিরঞ্জনের? কে জানে? নিরঞ্জনকে মাঝে মধ্যে কেমন যেন বুঝতে পারে না আরতি। প্রতিটি ঘনিষ্ঠ মুহূর্তে নিরঞ্জনের চোখ থেকে কেমন যেন কৃতজ্ঞতার ঝর্ণা ঝরে পড়ে। অথচ ঠিক উল্টোটাই হবার কথা। আরতিরই নতজানু হওয়া উচিত নিরঞ্জনের সামনে। কিন্তু…
রাত্তিরে খাবার টেবিলে বসে আরতির দিকে মেনুকার্ডটা এগিয়ে দিল নিরঞ্জন। আরতি কিছুক্ষণ সেটা দেখে ফিরিয়ে দিল নিরঞ্জনকে—
—তুমি অর্ডার দাও।
–না, আজ তুমি বলবে।
—আমি তো যা পাবো তাই খাবো।
—তাহলে তুমি বরং মাটন বিরিয়ানি আর চিকেন কারি নাও। সঙ্গে একটা ফিরে প্রিপারেশন।
—আর তুমি?
–আমি একটু ব্রেডটার আর কফি খাবো ভাবছি।
—আমিও তাই খাবো-আরতি বলল—আজ আমারও শরীরটা ঠিক…
নিরঞ্জন হেসে উঠল।
—মানে আমি না খেলে তুমি খাবে না?
–ঠিক তাই। আররিও মুখে হাসি।
নিরঞ্জন কিছু না বলে তাকাল আরতির দিকে। আবার সেই অস্বস্তিকর চাহনি। যার অর্থ আরত্রি জানা নেই। শ্রীনগরে আসার পর হঠাৎ যেন কেমন অসহায় হয়ে গিয়েছে নিরঞ্জন।
সকালে ঘুম থেকে উঠে স্নান সেরে নিরঞ্জনকে ডাকল আরতি। হাতে চা। হাত থেকে কাপটা নিয়ে পাশের টেবিলে রেখে আরতিকে কাছে টেনে নিল নিরঞ্জন। ওর মুখের ওপর মুখ রেখে বললো–
—তুমি এত ভালো কেন বলো তো?
—আসলে তোমার চোখ দুটো নিষ্পাপ আর ভালো বলে তুমি আমাকেও ভালো দ্যাখো। আমি কিন্তু আস্ত একটা ডাইনী।—দুজনের হাসির মধ্যেই শব্দ হল দরজায়। রিঞ্জনকে তুলে দিল আরতি। বাইরে লোকটার সঙ্গে কথাবার্তা বলে নিরঞ্জন ঘরে ঢুকে জানতে চাইল–
