–খুব ভালো। দারুণ রোমান্টিক।
–এই রোমান্স ব্যাপারটা অবশ্য আমি ঠিক বুঝি না-হাসল নিরঞ্জন।
—সেটা সময় মতো বোঝা যাবে—মুখ টিপে একটু হাসল আরতি।
নিরঞ্জন মুহূর্ক্সে জন্য মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে রইল। হাসলে আররি চিবুকে বেশ কয়েকটা টোল পড়ে। কেমন যেন মোহময়ী হয়ে ওঠে।
—কি দেখছো?
—তোমায়।
—আমরা কি এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবো?
নিরঞ্জন হেসে এগিয়ে গেল অফিসের দিকে। এবার আরতির দেখার পালা। পেছন থেকে নিরঞ্জনকে দেখল সে। সুন্দর সুঠাম চেহারা-দেখে বয়স বোঝার উপায় নেই। কানের পাশে অবশ্য কিছু চুল পেকে গিয়েছে–তবু–
—চলো। দোতলার কোণের দিকে ঘরটা পাওয়া গিয়েছ। আমি টেলিগ্রাম করে এটাই বুক করেছিলাম।
—কেন? ঠিক ঐ ঘরটাই কেন?
–আসলে ঘরটা বড় ভালো। চারদিকের জানলা খুলে রাখলে ঘরটা একেবারে–
–স্বর্গ হয়ে ওঠে। আরতি হাসল।
–ঠিক বলেছো। একেবারে মাটির স্বর্গ।
ঘরে ঢুকেই ব্যস্ত হয়ে উঠল নিরঞ্জন। সাইড ব্যাগ থেকে তোয়ালেটা বার করে চায়ের অর্ডার দিল—আর তারপরেই ঢুকে গেল বাথরুমে। আরতি জানলার সামনে দাঁড়াল। এদিকটায় শুধু জল। ছোট ছোট নৌকা করে চলেছে সবাই। কেউ কেউ বাজার করে ফিরছে। দূরে একটা নৌকোয় অনেক রঙীন জিনিষ দেখে একটু কৌতূহলী হয়ে উঠল আরতি। কাছে এলে বুঝতে পারল ওটা একটা চলমান স্টেশনারী দোকান। বিভিন্ন হোটেল, হাউসবোটের বোর্ডাররা ওর ক্রেতা। একটু আগে ঘরে ঢুকেই কেমন যেন হতাশ হয়ে গিয়েছিল সে। একেবারেই সাদামাটা একটা ঘর। বিছানার চাদর আর ঘরের পর্দাগুলো ময়লা—প্রায় রং ওঠা। বাথরুমটাও কেমন ছোট আর অপরিষ্কার। এখন এই জানালার সামনে দাঁড়িয়ে অবশ্য মন্দ লাগছে না—অদ্ভুত এক ধরনের মজা আছে। সামনের জল, নৌকো আর হাউসবোটগুলোর ছাদ পেরিয়ে চোখ চলে যায় দূরের পাহাড়ে। আরত্রি মন ভরে ওঠে। মনে মনে ঈশ্বরের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।
বিয়ের আগে কলকাতা ছেড়ে খুব বেশী বেরোয় নি আরতি। একবারই বাবার সঙ্গে মুর্শিদাবাদ গিয়েছিল। আরতির বাবা কাজ করতেন রেলে। পাশ, পি.টি.ও পেতেন—তবু ওরা কখনো বাইরে যায়নি। কারণ বাবার জন্য খুব কষ্ট হয় আরতির। প্রচণ্ড অভাবের মধ্যেও বাবা কোনদিন ভেঙে পড়েননি—অন্তত ওদের চোখের সামনে। শুধু—সেদিনের কথাটাও আজও মনে আছে আরতির। ঐ একদিনই বাবার চোখে জল দেখেছিল সে।
…সন্ধ্যেবেলায় বাড়ি ফিরে মুখ হাত ধুয়ে আরতিকে ডেকেছিলেন পরিমলবাবু। ওর বাবা। সামনে চায়ের কাপটা রেখে বাবার পাশে বসেছিল ও। মা ও বসেছিলেন বিছার এক কোণে। আরতির চুলে হাত বোলাতে বোলাতে বাবা বলেছিলেন—
–তুই বড় হয়েছিস—আমার অবস্থা তো সব বুঝিস। ভাবছিলাম—
বাবা বোধহয় কথাগুলো গুছিয়ে নেবার জন্য থেমে ছিলেন একটু।
–কবে যে তোর বিয়ে থা দিতে পারবো কিছুই জানি না। ইতিমধ্যে নিরঞ্জনবাবু একটা প্রস্তাব পাঠিয়েছে—
আরতি কোন কথা বলেনি সেদিন। নিরঞ্জনবাবুকে সে চিনতো। ওর বান্ধবী অসীমার মামা। বয়স চল্লিশ পেরিয়েছে। ওর স্ত্রী বছর দুয়েক আগে চলে গিয়েছে ওঁকে ছেড়ে। ছেলেপুলে নেই। অসীমার কাছেই এসব শুনেছে আরতি। নিরঞ্জনবাবুর স্ত্রী অঞ্জলিদেবী নাকি খুব আধুনিকা ছিলেন– আর…
একটু থেমে পরিমলবাবু আবার বলেছিলেন–
–খবর নিয়ে দেখেছি, লোকটি খারাপ নয়। সুপুরুষ, স্বাস্থ্যবান। টাকা পয়সাও অনেক। কলকাতায় দুখানা বাড়ি—পৈতৃক ব্যবসা বড়বাজারে। শুধু বয়সটাই—
—বেয়াল্লিশ, তেতাল্লিশটা আজকাল কোন বয়সই নয়—
এতক্ষণ নীরব থাকার পর হঠাৎ ওর মাকে কথা বলতে শুনে একটু অবাক হয়েছিল আরতি। কিন্তু কেন জানি না সেদিন বোধহয় বোবা হয়ে গিয়েছিল সে। নীরবে শুধু তাই শুনেছিল—
—আসলে কোন মা বাবাই চায় না—কোন বিবাহিত পুরুষের সঙ্গে মেয়ের সম্বন্ধ করতে, কিন্তু–
—আমি সব বুঝি বাবা—আরতি উঠে দাঁড়িয়েছিল। তারপর বাবার বুকে মাথা রেখে কেঁদেছিল অনেকক্ষণ। সেই প্রথম এবং সেই একদিনই আরতি কাঁদতে দেখেছিল তার বাবাকে।…
—চা দিয়েছে? মাথা মুছতে মুছতে বাথরুম থেকে বেরোল নিরঞ্জন।
—না তো! আরতির পাশে দাঁড়িয়ে নিরঞ্জন বললো
-কি, বলেছিলাম না–ঘরটা—
—হ্যাঁ খুব সুন্দর…
—আসলে…
কি যেন একটা বলতে গিয়ে থেমে গেল নিরঞ্জন। আরতিও কিছু বললো না। এই মুহূর্তে অনেকগুলো প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে ওর মনে। শুধু হোটেলটা দেখেই নয়–যেদিন এখানে আসার কথা ঠিক হয়েছিল—সেদিন থেকেই কেমন যেন একটু অবাক হয়েছে আরতি। নিরঞ্জনের যা সামর্থ্য তাতে ট্রেনের সেকেণ্ড ক্লাসে আসার কথা নয়। নিজের ব্যবসার কাজে বাইরে যেতে হলে প্লেনে যায়—পাঁচতারা হোটেলে থাকে—অথচ–
এসব নিয়ে অবশ্য কিছুই মনে করেনি আরতি। সেকেণ্ড ক্লাসে আসা কিম্বা মাঝারী হোটেলে থাকা এসবে আরতির কোনরকম কষ্টই হবার কথা নয়—ওর খারাপ লেগেছে নিরঞ্জনের অসুবিধার কথা ভেবে। কিন্তু–
—আসুন মেমসাহেব—চা তৈরী।
—নিরঞ্জনের পাশের চেয়ারে বসল আরতি। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে তাকাল নিরঞ্জনের দিকে।
-কি দেখছো?
–সাহেবকে? খালি গায়ে বসে আছো, ঠাণ্ডা লাগছে না?
–না, গরমজলে স্নান করলাম তো।
আরতি উঠে গিয়ে স্যুটকেশ থেকে হাউসকোটটা বার করে নিয়ে এল–
–নাও এটা পরো। গরমজলে স্নান করেছে ঠাণ্ডা লাগবে। ওঠো—
আরতির ভালোবাসা মেশানো হুকুম মেনে নিল নিরঞ্জন
