ধরিত্রী আবার পা বাড়াল। ঠিক রাস্তায় চলেছে। দাঁড়াতে পারছে না কারণ দাঁড়ালেই পায়ে ব্যথা করে। নিজের শরীরটা সোজা করে টান করে রাখতে পারছে না। পাশের জলা জায়গা থেকে একটা পানকৌড়ি অন্ধকারে কিছুটা উড়ে গিয়ে হু করে বসল। পাট ক্ষেত থেকে জোনাকিরা বেরিয়ে পড়েছে মাঠে। ওরা মনের আনন্দে জ্বলছে আর নিভছে। কোথায় যেন একটা শিয়াল ডেকে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটা রাস্তার কুকুরের সমবেত চীৎকার শোনা গেল। দূরের বাড়িতে প্রদীপ জ্বলছে। মনে হয় দিন শেষে কোন বউ তুলসী মঞ্চে প্রদীপ জ্বেলেছে।
মতি সাউর বাড়িও দেখা যাচ্ছে। ইলেকট্রিক আলো জ্বলছে। সুদের টাকায় বড়লোক। ওদের বাড়িতে ইলেকট্রিক বাতি জ্বলবে না তো আর কোন বাড়িতে জ্বলবে। আবার বাজারে ভিডিও বসাবে। তারজন্যেই নাকি জমিটা দরকার। জমিটা নেবার জন্যে মতি সাউ কতরকম টোপ দিয়েছে। ধরিত্রী কিছুতেই রাজী হয়নি। কিছুতেই মতিবাবুর প্রলোভনে পা দেয়নি। সেই থেকে লোকটা পিছনে লেগেছে। তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকেছে। তাও মিনরে শয়তানী অটুট আছে। রাজাকে নিয়ে শয়তানটাকে প্রতিহত করার স্বপ্ন দেখেছিল, সেটা চুরমার হয়ে গেল। এখন কি নিয়ে বাঁচবে। সব শেষ। স্বপ্নের সৌধটা ভেঙে খান খান। মনের সাহসও আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছে।
চারপাশে অন্ধকার। অমাবস্যার কাল চলছে। তাই চাপ চাপ অন্ধকার। ধরিত্রীর হঠাৎ ভয় করছে। কোনদিন ওর এরকম ভয় করে নি। গা-টা শিউরে উঠছে। কেন এরকম হচ্ছে বুঝতে পারছে না। একটা ঝোড়ো দমকা হাওয়া হঠাৎ ধানক্ষেত্রে ওপর দিয়ে বয়ে গেল। ধরিত্রীর মনেও ঝড়ের সঙ্কেত। তবুও জোর করে সাহস এনে বাড়ির পথ ধরল ধরিত্রী জোর কদমে। আর একু এগুলেই মতিবাবুদের মুদি দোকান। ঐ পর্যন্ত গেলে প্রায় বাড়ি পৌঁছানো গেল। সামনের ক্ষেতটা পেরুতে পারাটাই সমস্যা। ক্ষেতটা এখন নেড়া। ধান সব কাটা হয়ে গেছে। জমিটা এবড়ো খেবড়ো। আগাছায় ভর্তি। আলপথও খুব সরু।
হাঁটতে হাঁটতে ধরিত্রীর হঠাৎ মনে হল, কেন আজ অতদূরে গেল। কিন্তু না গেলেও চলত কি? বৌটা প্রথম পোয়াতি। কি সুন্দর দেখতে। যেমন রঙ, তেমনি নাক চোখ। খুব কষ্ট পেল। ধরিত্রী না গেলে বিপদের সম্ভাবনা ছিল। যাই হোক, শেষ পর্যন্ত ঠিকমত হয়েছে। কন্যা সন্তান। বাড়ির লোকেরা কিন্তু বলেছিল হাসপাতালে দেবার কথা। ধরিত্রী না করেছিল, বলেছিল বাড়িতেই হবে। কোন ভয় নেই। কে যেন বলেছিল সিজার টিজার হবে। ধরিত্রী বলেছিল, না ওসব করতে হবে না।
অবশ্য বাড়ির লেকেরা ধরিত্রী যা বলেছিল তাই মেনে নিয়েছিল। কোন প্রতিবাদ করেনি।
থমকে দাঁড়াল ধরিত্রী। আর হাঁটতে পারছে। না। শরীর বইছে না। কোন সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়েছে এখনো বাড়িতে পা রাখতে পারল না। বৌটাকে বাঁচাতে গিয়েই। ধরিত্রীর এত দেরী হয়ে গেল।
বাড়ি এখনো কতদূর। অন্ধকারটা যেন আজ খুব বেশি। দু’হাত দূরের জিনিসপত্রও নজরে আসছে না। পথে লোকজনও কেউ নেই। ধরিত্রী জোরে পা চালাল।
হঠাৎ ওর মনে হল পিছনে কেউ যেন আসছে। দাঁড়িয়ে পড়ল ধরিত্রী। শব্দটা শোনার চেষ্টা করল না। এ হয়ত ওর মনের ভুল। আবার হাঁটতে শুরু করল। সামনে মনসাডাঙ্গায় ঢোকার মুখে একটা বড় বাঁশ বাগান। সামনে মনসাডাঙ্গায় রাস্তায় ওঠা যাবে। ধরিত্রী নিজেকে যেন ভরসা দিল।
ঠিক তখনই পিছন থেকে থেকে জাপটে ধরল কেউ। ধরিত্রী চীৎকার করে উঠল। মুহূর্তেই বুঝে নিল এ আর কেউ নেই। মতি সাউ। শরীরে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। জানোয়ারটা। ওকে রাস্তার উপর ফেলে বুকের ওপর চেপে বসতে চাচ্ছে। ক্লান্ত বিধ্বস্ত ধরিত্রী বুঝি আর পারবে না নিজেকে রক্ষা করতে।
শেষ চেষ্টা হিসেবে কোনরকমে মুখের হাত সরিয়ে ধরিত্রী চীৎকার করে উঠল—কে আছো! বাঁচাও! সঙ্গে সঙ্গে রাস্তার দিক থেকে আওয়াজ ছুটে এল–মা–মা!
এ যে রাজার গলা।
মতি সাউ উঠে দাঁড়াতে চাইছে। হয়তো পালাবে। এক ঝটকায় শয়তনটাকে মাটিতে ফেলে বুকের উপর উঠে দাঁড়ালো ধরিত্রী। রণরঙ্গিনী দুর্গার মত ধরিত্রী যেন এ মুহূর্তে চোখের আগুনে ভস্ম করতে চার পায়ের নিচের অসুরটাকে।
ধারাবাহিক – মৃণাল বসুচৌধুরী
হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে একটু অবাক হ’ল আরতি। শ্রীনগরে এত ভালো ভালো হোটেল থাকতে হঠাৎ নিরঞ্জন এখানে থাকার কথা ভাবল কেন? থাগে—আরতি মন থেকে ভাবনাটা তাড়াল। ওর কোন অসুবিধে নেই। তাছাড়া হোটেলটা খারাপ নয়—ডাল লেকের মাঝখানে দ্বীপের মতো একটা জায়গায়—পুরনো ধরনের একটা বাড়ি। সম্প্রতি বোধহয় রং করা হয়েছে। সামনে ছোট্ট কিন্তু সুন্দর ফুলের বাগান। চতুর্দিকে জল। হোটেলের সামনেই নৌকো তৈরী—কোথাও বেরোতে গেলে ওরাই নিয়ে যাবে। আরতির আবার জলে খুব ভয়। সাঁতারও জানে না। বারবার নৌকো করে যাবার কথা ভাবতে একটু খারাপ লাগল তার? অবশ্য নিরঞ্জন সঙ্গে আছে—কোন কিছুতেই এখন আর ভয় নেই আররি। আশ্চর্য! এই ক’দিন আগেও এই লোকটার কোন অস্তিত্বই ছিল তার কাছে আর আজ কেমন পরম নির্ভরতায় নিজের ভালো-মন্দ সমস্ত কিছুই দিয়েছে নিরঞ্জনের হাতে।
—কি ভাবছো? এগিয়ে এল নিরঞ্জন। এতক্ষণ নৌকো থেকে নামানো মালপত্রের তদারকি করছিল সে।
—কি আবার ভাববো?
—পছন্দ হচ্ছে না? ভালোনা পরিবেশটা?
