হাসপাতালের ডাক্তারবাবুরাও কত বোঝাবার চেষ্টা করেছে, হিত উপদেশ দিয়েছে। সিস্টাররাও মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছে, ভালোভাবে চলবার পরামর্শ দিয়েছে। কিন্তু কাকস্য পরিবেদনা। এই জন্যে ধরিত্রীর মনে অনেক দুঃখ। কিন্তু এই দুঃখের কথা। কাউকেই বলতে পারে না। তাছাড়া বলার তো বেশী লোক থাকে না। এই মতি সাউর জন্যে দুঃখের শেষ নেই। লোকটা ওদের চিলতে জমিটুকু গ্রাস করতে বদ্ধপরিকর। ঘোষকাডাঙ্গার সমস্তকিছুই ওদের দখলে। ভিন দেশী লোক হয়েও, কি করে যেন লোকটা বাঙালী হয়ে গেছে। ওরা যে এই দেশে কবে এসেছে তা কেউ বলতে পারবে না। ওরা কি করে এই গ্রামে চলে এল কে জানে!
ধরিত্রী সেই কথাটার কোন উত্তর পায় না। গিন্নীমা অবশ্য জানতেন ওদের কথা। কারণ ওদের সঙ্গে মতিবাবুদের একটা বিরোধ লেগেই ছিল। সেই মতিবাবু ধরিত্রীকে চাইছে। আজ থেকে নয়। গিন্নীমার বাড়িতে থাকার সময় থেকেই। রাজা যখন ছোট তখন একদিন রাত্রিবেলা এসে হাজির। ধরিত্রী চোর চোর বলে চীৎকার করে উঠছিল। অন্ধকারের মধ্যেই ধরিত্রী মতিবাবুকে পালাতে দেখেছিল। রাজা মাকে চীৎকার করতে দেখে বিছানায় বসে বলেছিল,—চোর কই মা? আমি চোর ধরব। চোরকে মারবো। চোর কই মা?
ঐটুকু ছেলের কথায় ধরিত্রী স্বস্তি পেয়েছিল। মনে মনে ধরিত্রী এই চেয়েছিল। রাজা তাড়াতাড়ি বড় হোক, তাহলে ধরিত্রীর আর কোন চিন্তা থাকবে না। আর একটু বড় হলেই মবুিকে ঠেকাতে পারবে। তখন আর ভয় থাকবে না। কিন্তু সেই রাজা কি হয়ে গেল! ধরিত্রী কি চেয়েছিল আর কি হল।
সেদিন রাত্রে ধরিত্রী ভীষণ রেগে ছিল। বড় দিদিমণির কোয়ার্টারে হামলা করেছিল। রাজা একলা নয়, ওর সঙ্গে কয়েকজন ছিল। বড় দিদিমণির কোয়ার্টারে একটা নারকেল গাছ আছে। নারকেল পাড়তে গিয়েই যত গণ্ডগোল। বড়দিদিমণি নালিশ করেছিল। ধরিত্রী মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিল আজকে একটা হেস্তনেস্ত করবেই। কাঁহাতক আর সহ্য করা যায়। ধরিত্রী বাড়ি ফিরে দেখে খুব জোরে টেপ চালিয়ে রাজা ধেউ ধেই করে নাচছে। ধরিত্রী ঐ দেখে ভীষণ রেগে গেল, লাঠিঠা নিয়ে বেধড়ক মারতে লাগল। রাজা মার হাত থেকে বাবার জন্য চেঁচাতে লাগল আমাকে মারছ কেন? আমি কি করেছি? আমাকে মারছ কেন?
ধরিত্রী মারতে মারতে দাঁতে দাঁত চেপে বলল—কি করেছিল। তুই মরতে পারিস না। তোকে আমি মুখে নুন দিয়ে মারবো। বের হ বাড়ি থেকে। তোর মত ছেলে আমরা চাই না। বাচ্চা ছেলে বাচ্চাদের মত থাকবি।
রাজা যেন প্রতিবাদে মুখর—তুমি তো মারবেই। তুমি তো আমার মা নও।
ধরিত্রী সাময়িক থমকে দাঁড়ালো। কথাগুলো শুনে ওর নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারলো না। পরক্ষণেই আরো দ্বিগুণ ক্রোধ ওকে ভর করল—কি, এখনই এই কথা, পরে তো আরো বলবি। মুখপোড়া! ছোট মুখে এত বড় কথা। হতচ্ছাড়া! শয়তান! কুকুর! তোর এত সাহস। আমি তোকে শেষ করবোই।
রাগে-যন্ত্রণায় ধরিত্রীর মাথা ফেটে যাচ্ছে। ধরিত্রী আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারছিল না। প্রচণ্ড অভিমানে ওর চোখ ফেটে অঝোর ধারায় জল পড়তে লাগল। রাজা আর দাঁড়াল না। দৌড়ে পালাল। কারণ রাজা মার ওই উগ্ৰমূর্তি দেখে একটা কথা বুঝেছিল পালাতে হবে।
সেই থেকে রাজা ঘরছাড়া। কোথায় যে গেল কে জানে। ধরিত্রী ওর খোঁজ করেনি। কিন্তু খোঁজ না করলেও মনে মনে চিন্তা করেছে। কোথায় গেল। কি খেল, কে জানে। জানবার উপায়ও নেই। অবশ্য ধরিত্রীর জানাশোনার যা পরিধি তাতে হয়ত চেষ্টা করলে পারে। কিন্তু চেষ্টা থেকে বিরত থেকেছে। নির্লিপ্ত থেকেছে। ঐ রকম ছেলের আর কি হবে। একদিন না একদিন দুর্ঘটনায় মারা পড়বে। ওদের কপালে আর কিছু লেখা থাকতে পারে না। ধরিত্রী তো ভালর জন্য কম চেষ্টা করেনি। স্কুলে দিয়েছে। মাস্টার রেখে দিয়েছে। কিন্তু যার দ্বার নয়, তার চেষ্টা করেও হবে না। হয়তো ভালো ঘরের ছিল। রাস্তার কোন বাজে মানুষের কামনার ফসল। তা না হলে এত চেষ্টা করেও কেন মানুষ করতে পারল না। সেটাই দুঃখের।
ধরিত্রীর বয়স এগুচ্ছে। এই বয়সে আর কষ্ট করতে পারছে না। ভেবেছিল, কি আর হল কি। যত দিন যাচ্ছে, শরীর মন ভেঙে যাচ্ছে। কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। রাজাকে ঘরে নিয়ে এসে কি যে ভুল করেছিল, তা আজ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। জীবনে অনেক ছেলেময়ে দেখেছে। বহু সন্তানের জন্ম দিয়েছে এই হাতে, কন্তু এই রকম ছেলে আর একটাও দেখেনি। পাড়ার কত ছেলেমেয়ে এখনো রাস্তায় দেখা হলে মা ডাকে। কি সুন্দরভাবে কুশল প্রশ্ন করে। ধরিত্রী তখন অন্য জগতে চলে যায়। ধরিত্রীর মন ভরে ওঠে।
পাশ দিয়ে সর সর করে কি একটা চলে যেতে ধরিত্রী চমকে বাস্তবে ফিরে এল। সাপ-খোপ হবে হয়ত। ওসবে আর ভয় নেই ধরিত্রীর। কারণ মানুষ সাপের চেয়েও খল, ভয়ঙ্কর। সেই মানুষই যখন ওর সঙ্গে এঁটে উঠতে পারলো না, তাহলে সাপতো ছার।
সূর্যঠাকুর একদম বাঁশ ঝাড়ের নিচে নেমে গেছে। গাছে গাছে পাখীদের কিচির মিচির। সন্ধ্যা নামল। মাঠের সব পাখীরা ফিরে এসেছে ডেরায়। ধরিত্রী এখনো ফিরতে পারল না। রাস্তা যেন শেষ হতে চাইছে না। ভুল রাস্তায় এলো না তো! ধরিত্রী এদিক ওদিক ঘুরে দেখল ঘোষকাডাঙ্গার রেল স্টেশনটা দেখা যাচ্ছে। ওপারে কত বড় হয়েছে। দেখতে দেখতে কত লোজন এলো। আগে এখানে এত লোকই ছিল না। ওদিকে একটা বাজার হয়েছে। দুই একটা দোকানও আছে। সবসময় ভোলা থাকে।
