–হকগে যাক!
—আমি কিন্তু থানায় যাব। বৌমাকে মরতে দেব না।
আসল কথা ধরিত্রী যা ভাল বোঝে তাই করে। যেকোন প্রব্বিদের ভাষাকে ও অগ্রাহ্য করে। অবহেলায় ঠেলে সরিয়ে দেয়। ভয়ানক রেগে যায়। তখন ওর ঐ মূৰ্ত্তি দেখলে সকলেই ভয় পেয়ে যায়। গ্রামের লোকেরাও জানে, ওর কথা না মানলে বিপদ। এইরকম ঘটনা ঘটেছে। ও যা বলেছে সে কথা না শুনে বিপদ টেনে এনেছে। অমর। সরকার ধরিত্রীর ঐ রাগ দেখে আর না করতে পারলো না।
পরে হাসপাতালে নিয়ে গেলে সিস্টার আর ডাক্তারবাবুরা একযোগে বাহবা দিয়েছে। কারণ বৌটাকে সময় মত হাসপাতালে নিয়ে না যাওয়া হলে বাঁচানো যেত না। আসল কথা ধরিত্রী চট করে বুঝতে পারে কার অসুখ কি ভাবে যাবে। কি প্রলে ভাল হবে। কি ওষুধ দেবে। ডাক্তার বাবুরা ধরিত্রীর এই গুণ দেখে অবাক হয়ে যান। ধরিত্রী তাই সকলের কাছে ধন্বন্ত্রী। বিপদ-আপদে পড়লে তাই কলে তার কাছে ছুটে আসে। একদিন হারাণ জুয়াড়ী এসে ধরিত্রীকে বললো অপারেশন করাবো। ধরিত্রী কোন কিছুনা বলে চুপ করে রইল। হারাণ ধরিত্রীর দিকে তাকিয়ে আবার বলল—অত বাচ্চা হলে খাওয়াবো কি।
ধরিত্রী চট করে ওর মত বুঝতে পারল। বলল—তোর তো ছেলে-মেয়ে নেই। তুই কেন করাবি। তোর মতলব ভাল নয়। অপারেশন করে যা তা করে বেড়াবি, তা চলবে না।
হারাণ কিরকম যেন ক্ষেপে যায়। চীৎকার করে বলে আমি করাবো তুমি ব্যবস্থা করবে কিনা বলল। বলে বিশ্রী অংগভঙ্গি করে ধরিত্রীর মুরে কাছে হাত নাড়তে লাগল।
ধরিত্রীর শরীরে হঠাৎ যেন কি ঘটে গেল। ও দৌড়ে ঘরে ঢুকে লাঠিটা নিয়ে এল। হারাণের পিঠে জোরে এক ঘা বসিয়ে দিয়ে বললবল এবার, অপারেশন করার ইচ্ছে আছে কিনা। মজা লোটার বড় সখ। দেখাচ্ছি মজা। বলে লাঠিটা আবার তুলতেই হারাণ জুয়াড়ী পাকাল মাছের মত পিছলে দ্রুত র ছেড়ে পালিয়ে গেল। হারাণকে খরগোশের মত ছুটতে দেখে ধরিত্রীর কি হাসি! হাসি থামতে, ধরিত্রী অবাক হয় এই ভেবে কিরকম পুরুষ হারাণ! নিজের অপারেশন করিয়ে যা ইচ্ছে তাই করে বেড়াবে। সত্যি বিচিত্র এই সংসারে মানুষজন। হারাণ যেমন জুয়াড়ী তেমনি এক মাতাল আছে। কলেই ডাকে যুবরাজ বলে, সকাল বিকেল আড্ডা দেবে আর রাতের বেলায় দেশী টানবে। মদ্যপ অবস্থায় বৌকে অত্যাচার করবে। এরই মধ্যে এক গণ্ডা বাচ্চা। শরীর ভেঙ্গে পড়ছে।বৌটা শান্ত প্রকৃত্রি। রারই মুখ বুজে অত্যাচার সহ্য করত। কিন্তু একদিন আর পারল না। কাঁদতে কাঁদতে ধরিত্রীর কাছে এসে হাজির।
ধরিত্রী ডাক্তারবাবুকে দিয়ে অপারেশন করিয়ে দিয়েছিল। কারণ ধরিত্রী বুঝেছিল বাচ্চা হওয়ার ধকল বৌটা আর বেশীদিন সহ্য করতে পারবে না। তাছড়া খাওয়াবেই বা কি? স্বামী তো মানুষের পর্যায় পড়ে না। ধরিত্রী বোঝে কোনটা ন্যায়, কোনটা অন্যায়। লেখাপড়া না জানলেও এ জিনিসটা ভালভাবেই বুঝতে পারে। অপারেশন হলে কিছু টাকা পাওয়া যায় বটে, কিন্তু টাকাটাই তো সব নয়। আগে পরে ভেবে সব কিছু করতে হবে। হুট করে একটা কিছু করলেই হবে না।
দেখা গেছে ছোটখাট অসুখ-বিসুখে ধরিত্রী যা বলে, যে ওষুধ দেয় তা অব্যর্থ। ডাক্তারবাবুরাও তা জানেন। তারা অবাক হন, কি করে ধরিত্রী এত সব শিখল! হাসপাতালের নার্সরাও অবাক হয়। কি করে ইংরাজীতে বিদঘুঁটে ওষুধের সব নাম মনে। রাখে! হয়তো ঠিকমত উচ্চারণ করতে পারে না। ওষুধের দোকানদাররা বুঝে যায়। কেউ যদি বলে ‘জেলোচিল’ আছে, তাহলে ওরা ঠিক বুঝতে পারে মাদার পাঠিয়েছে। তারা ঠিক ঠিক ওষুধটা দিয়ে দেয়। কখনো কখনো ছোটখাট অপারেশনের সময় ধরিত্রী ডাক্তারবাবুদের সাহায্য করে অভিজ্ঞ নার্সের মতোই। ডাক্তারবাবুরা ধরিত্রীর এই গুণের জন্যে ভীষণ ভালবাসে। লোকের অফুরন্ত ভালবাসা ধরিত্রীর ঘরে শান্তি ফিরিয়ে আনতে পারে না। ছেলেটাকে যেভাবে মানুষ করতে চেয়েছিল, তা আর হয়ে উঠল না। ছেলেটা যে এইরকম হবে কোনদিন ভাবতে পারেনি। ঘোষকাডাঙ্গা রেল স্টেশনে বাজে ছেলেদের খপ্পরে পড়ে গেছে। ঠিকমত বাড়ি ফেরে না। এই অল্প বয়সেই বদ হয়ে গেছে। দিন দিন ছেলেটা কোথায় তলিয়ে যাচ্ছে। সেদিনকার ছেলে সব–কি তাদের ভাষা। কি চাল চলন। কিভাবে এত পরিবর্তন হল, ধরিত্রী কিছুতেই তা বুঝতে পারে না।
পাশপাশের গ্রাম থেকে দুস্থ মেয়েরা শাকজি সংগ্রহ করে শিলিগুঁড়ি নিয়ে যায়, রাত্রিবেলা স্টেশনেই থাকে। ওখানেই ভাত সেদ্ধ করে খায়। ভোরবেলা ট্রেন এলে যায়। এতদিন উৎপাত ছিল না। কিন্তু এই ক্ষুদে মাফিয়া চক্র গড়ে ওঠার পর অশান্তি দেখা দিয়েছে। ছেলেগুলো এসে মস্তানি করে। টাকা চায়। গালি-গালাজ দেয়। অশালীন আচরণ করে। একদিন তো দুঃখীর মাকে ধানক্ষেতে টেনে নিয়ে গিয়েছিল। সকলে মিলে রুখে দাঁড়িয়েছিল বলে সে যাত্রায় দুঃখীর মা রক্ষা পেয়েছিল। স্টেশন মাস্টারকে বলেও কিছু হয়নি। দুঃখীরা থানায়ও জানিয়েছিল। কিছুতেই কিছু হয়নি।
পেটের জ্বালায় এত কষ্টের মধ্যে আবার নয়া উৎপাত। ভাবতে কষ্ট হয় ধরিত্রীর তার ছেলে রাজা ঐ দলের ফাইফরমাস খাটে। অথচ এই রাজাকে মানুষ করার জন্য কত চেষ্টা তো করল। ধরিত্রী স্কুলে দিল, বাড়িতে পড়ার জন্যে মাস্টর ঠিক করে দিল। প্রথম প্রথম ভালোভাবেই পড়াশুনা করছিল। যেই প্রাইমারী স্কুলের পাঠ শেষ করে হাইস্কুলে ছুটল,—কি যে হল! খারাপ হয়ে গেল। কতবার্তা শোনে না। ঠিকমত থাকে না। ধরিত্রী প্রথম প্রথম গালমন্দ করতো। শাসাতো। বেশী বলায় আরও খারাপ হয়ে যাচ্ছে দেখে, বলাই ছেড়ে দিয়েছে। মনে মনে ভেবেছে, রাস্তার জিনিস কি কখনো ঘরে থাকে।
