ধরিত্রী অপলকে বাচ্চাটাকে দেখল কিছুক্ষণ তারপর ধীরে ধীরে বাচ্চাটাকে কোলে। তুলে নিজের কাপড় দিয়ে ভাল করে জড়িয়ে বাড়ির দিকে রওনা হল। কি এক নিশ্চিন্ততায় শিশুটির কান্না থেমে গেল। পাড়া-পড়শির নানারকম মন্তব্যকে উপেক্ষা করে ছেলেটাকে নিজের ছেলের মত মানুষ করতে লাগল। কারণ ওর মনে আশা জাগল, এই ছেলে বড় হলে ওর একটা অবলম্বন হবে। তখন দুজন মিলে রুখে দাঁড়ালে মতিবাবুকে প্রতিহত করা সম্ভব হবে। তাছাড়া আর একটা ভরসা ধরিত্রীকে আর একা একা নিঃসঙ্গ মুহূর্তগুলো অতিবাহিত করতে হবে না। ধরিত্রী ছেলেটাকে আনার ব্যাপারে সমস্ত কিছু হাসপাতালের ডাক্তার আর সিস্টারদের জানিয়েছিল। ওরা সমস্ত কিছু শোনার পর আর করেনি।
এদিকে মতিবাবু একদিন গন্ধে গন্ধে হাজির। খিক খিক্ করে হাসতে হাসতে বললে–কি রে, কার ছেলে ওটা? তা তোর যখন এতই ছেলের সাধ তখন আমাকে বললেই পারতিস। ধরিত্রী অশ্লীল ইঙ্গিতটা বুঝল। শয়তানটার চোখে-মুখে একটা জাম্ব লালসা। ধরিত্রীর মাথায় যেন কি একটা খেলে গেল। ক্রুদ্ধ হুংকারে বলল—বের হন। বলছি। বের হয়ে যান বাড়ি থেকে। এক্ষুনি। না গেলে চেঁচাব। মানুষ ডাকব। ফের যদি এ মুখো হন, দেখে নেব। মতিবাবু একটু থমকে দাঁড়িয়ে টেনে টেনে বললেন, এত রাগ ভাল নয়। একদিন না একদিন আমার কাছে আসতেই হবে। তখন বুঝতে পারবি আমাকে চোখ দেখানোর কি মজা। আমাকে রাগিয়ে কিভাবে ঘোষকাডাঙায় থাকিস দেখবো। দেখবো তোর যে কোন পেয়ারের সিস্টার তোকে বাঁচায়।
—তবে রে! বলেই ধরিত্রী তেড়ে এল। মতিবাবু ধরিত্রীর ঐ চেহারা দেখে আর দাঁড়াবার সাহস পেল না। এক পা এক পা করে পেছিয়ে গেল। ধরিত্রী তখন রাগে কাঁপছে। লোকটা বেরিয়ে যেতে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলো না ধরিত্রী। আকুল কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো। এতক্ষণ যে দৃঢ়তায় লোকটাকে ঠেকিয়ে রেখেছিল, কোন মন্ত্রবলে সেটা অন্তর্হিত হ’ল। পোড়া চোখদুটোতে জলের স্পর্শ এঁকে দিল। বারবার মনে হতে লাগল, সে তো কারুর বাড়ি যায় না, তবে কেন এই অকারণ উৎপাত। তাকে ভালভাবে বাঁচবারও কি অধিকার দেবে না এই সমাজ।
ধরিত্রীর হঠাৎ একটা শিরশিরে ভয় অনুভূত হল। ভয়টা ওই মতিবাবুকে কেন্দ্র করে। লোকটা সুবিধের নয়। হাতে লোকজন আছে। টাকা-পয়সা আছে। পঞ্চায়েতের লোকজন মতিবাবুর কথায় ওঠে বসে। পার্টির লোকও হারে মুঠোয়। রাত-বিরেতে কি যে হয় কাজটা হয়ত ভাল হ’ল না। কিন্তু ঐ ভাবে না বললে হয়ত লোকটা নড়তো না। হাত বাড়াত। একবার মাথায় তুলে দিলে সহসা নামাতে পারতো না। নিজের মানুষের সখের জমিটা হাতানোর মতলব লোকটার। তাই ছুচ হয়ে ঢুকে ফাল হয়ে বেরুতে চায়।
প্রাণ থাকতে এটা বাধা দেবে ধরিত্রী। যদি একা না পারে, লোকজনদের কাছে যাবে। এখানে কি মানুষ নেই? নিশ্চয়ই আছে। ডাক্তারবাবুদের কাছে যাবে। সিস্টারদের কাছে যাবে। সমস্ত কিছু বলবে। সাহায্য চাইবে। একা থাকতে ভয় হয়। আশেপাশের লোকজন ভাল নয়। বড় সিস্টার ওকে বাব্বার হাসপাতালে চলে যেতে বলেছেন। তাহলে আর এই খুচরো উৎপাত আর থাকবে না। কিন্তু ধরিত্রী যায়নি। নিজের ভিটে ছেড়ে চলে যাবে, এটা ভাবতেও কষ্ট হয়। আপন বলতে তো আর কিছু নেই। এই বাড়ি আর সংলগ্ন জমিটুকু ছাড়া। এই বাড়ি যদি খালি রেখে ধরিত্রী অন্য জায়গায় থাকতে শুরু করে তাহলে মতিবাবু ঢুকে যাবে। আর শয়তানটা একবার ঢুকে গেলে আর বার করতে পারবে না। যা দিনকাল পড়েছে। এই সব সাতপাঁচ ভেবে এই আশ্রয়টুকু ছেড়ে যেতে চায় নি ধরিত্রী।
ওর ভাবনা শুধু ওর ছেলেকে ঘিরে আবর্তিত হত। ভাবত কখন ছেলেটা বড় হবে। কবে সেয়ানা হবে। ধরিত্রী ছেলেকে জমিটার ওপর ঘর তুলে দেবে। মনিহারী দোকান দেবে। ধরিত্রীর এই সাধ কি পূর্ণ হবে? যা ভাগ্য নিয়ে এসেছে একখানা! ধরিত্রীর নিজের বলতে কিছুই ছিল না। সেইখানে বাড়ী হ’লনিজের মানুষ হল। কিন্তু আসল মানুষটা—যার জন্যে কিছু সে রইল না। লোকটা নেই ঠিক কথা, তার রেখে যাওয়া জিনিসগুলো আছে। সেই অমূল্য সম্পদগুলো হারাতে রাজী নয় ধরিত্রী। প্রাণ থাকতে নয়।
সুতরাং জায়গাটা ছাড়ার কোন প্রশ্ন নেই। ছেলেটাকে নিয়েই নিজের আশা, মনের সাধ পূর্ণ করবে। দশজনের মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। ছেলেকে মানুষের মতমানুষ করবে। ছেলে মানুষ হলে আর চিন্তা নেই। এই স্বপ্ন নিয়েই ধরিত্রী ভাবে, নিজের জীবনে যেমন কেউ ছিল না, ঐ ছেলেটার জীবনে যেন তা না হয়। ওকে ওর পরিচয় দিয়ে মানুষের মত মানুষ তৈরী করবে।
ধরিত্রী আর হাঁটতে পারছে না। আর কত দূর! বাড়ীটা যেন মনে হচ্ছে অনেক দূরে। আজকে অত-দূরে না গেলেই হোত। রুহিডাঙ্গার অমর সরকারের বাড়ি গিয়েছিল। ওখান থেকে ফিরছে। অমর সরকারের ছেলের বৌ-এর অবস্থা খুব খারাপ। বাচ্চা হবে। অথচ শরীরে রক্ত নেই। ধরিত্রী গিয়ে বৌটাকে দেখেই বলল, হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। রক্ত লাগবে। বাড়ীতে রাখা চলবে না বাড়ীতে রাখলে বৌটাকে বাঁচান যাবে না।
অমর সরকার ধরিত্রীর কথার প্রতিবাদ করতে চেয়েছে। বলেছেন না। আমাদের বাড়ীর বৌরা কোনদিন হাসপাতালে যায়নি। আজকেও যাবে না।
ধরিত্রী শুধু দৃঢ়ভাবে বলেছে—যাবে! একটা মানুষকে জেনেশুনে মৃত্যুর হাতে ঠেলে দিতে পারব না।
