ধরিত্রী বসেছিল বাড়ীর দাওয়ায়। চুল এলোমেলো। কেঁদে কেঁদে মুখ-চোখ ফুলে গেছে। সেখান দিয়ে যাচ্ছিলেন হাসপাতালের সিনিয়র নার্স কমলা বোস। ধরিত্রীকে ঐ অবস্থায় দেখে থমকে দাঁড়ালেন। কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলেন–তুমি কাঁদছ কেন? ধরিত্রী কিছু বলল না। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়েছিল শুধু। কমলা বোসের তাড়া ছিল। অবাক চোখে তাকিয়ে শুধু বলেছিলেন, মনটা কোথায় রে? মানুষটা চলে যাওয়ার পর আরও অনেকে এসেছিল। গিন্নীমার বাড়ী থেকেও লোক এসেছিল। ওদের বাড়ীতে যেতে বলেছিল। ধরিত্রী নিজের ভিটে ছেড়ে যেতে চায়নি। অন্যান্য মানুষজনের মধ্যে মস্বািবুও ছিলেন। মতিবাবুও বলেছিলেন তার গরীবখানায় যেতে। ধরিত্রী যায়নি।
ও যেন বুঝতে পেরেছিল—অভিসন্ধি ভাল নয়। কারণ ধরিত্রী তরতাজা যুবতী। গরীব ঘরের মেয়ে হলে কি হবে। চাল-চলনে একটা দৃঢ়তা, চেহারায় একটা আলগা চটক—সকলকেই টানত। যার ফলে গিন্নীমা ঘরে রাখতে সাহস পায়নি। তাদেরই জানোনা হাবুলের সংগে বিয়ে দিয়েছিলেন। হাবুলও গিন্নীমাদের বাড়ীতে কাজ করতো। জমির চাষবাষ দেখত। গরুর দেখাশোনা করত। ধরিত্রীর তখন মনে হয়েছিল কষ্টের দিন বুঝি শেষ হ’ল। দীর্ঘদিন পরে নিজের করে বাড়ী আর একফালি জমি পেয়েছিল বলে মনে মনে ভীষণ খুশী হয়েছিল। কিন্তু সেই সুখ বেশীদিন টিকল না। নিজের কপালকেই মেনে নিয়েছে ধরিত্রী। কাউকে দোষী করেনি।
মানুষটা চলে যাবার পর বাড়ীতে ধরিত্রীর একা থাকা দুর্বিসহ হয়ে উঠেছিল। চারিদিকে উৎপাত। বিশেষ করে মতিবাবুর খপ্পর থেকে বাঁচবার জন্যে একটা রাস্তা খুজছিল, কিন্তু কিছুতেই রাস্তা খুঁজে পাচ্ছিল না। কোন কোনদিন আচমকা মতিবাবু বাড়ীতে ঢুকে যেত। কণ্ঠে সোহাগ মাখিয়ে বলত—ও ধরিত্রী, ভেবেছিস, কি করে চলবে?
ধরিত্রী সেই কথার কোন উত্তর দিত না। পাশ কাটিয়ে অন্য জায়গায় চলে যেত। মআিবুও ছাবার পাত্র নয়। বলতো—তোর যদি কোন কিছুর দরকার হয় তাহলে বলিস। ভয় কি! আমি তো আছি। টাকার দরকার হলে বলিস। হ্যাঁ, ভাল কথা। সামনের ওই চিলতে জায়গাটা তো খালি পড়ে রয়েছে। শুধু শুধু ফেলে রেখে লাভ কি? ওটা আমাকে দিয়ে দে আমি ভি ডি ও ঘর বসাবো। ভাল দাম পাবি।
জমির প্রসঙ্গ এসে পড়লেই ধরিত্রী রুখে দাঁড়াত। রাগে ওর শরীর কাঁপতে থাকত। চোখের দৃষ্টিতে আগুন হেনে বলত, খদার! ও কথা কখনও মুখে আনবেন না। জেনে রাখুন, এই আব্দার রাখা আমার পক্ষে কখনই সম্ভব নয়। মরািবু ঘাবড়াবার পাত্র নন। সেঁতো হাসি হাসতেন—ঠিক তা নয়। তোকেই যে দেখতে আসিনি সেটা কি করে ভাবলি। মতিবাবুর কথার এই ধরনের ইঙ্গিত বুঝতে অভ্যস্ত ধরিত্রী। তাই মতিবাবুর এই ধরনের কথার কোন উত্তর না দিয়ে বাড়ীর বাইরে বেরিয়ে পড়ত।
হাবুলের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে আজ ক’বছর। কিন্তু ঘরে নতুন মানুষ আসার আগেই আসল মানুষটা চলে গেল ধরিত্রীকে ফেলে। এই ঘরে নতুন মানুষ না আসার ব্যাপারটা নিয়ে আনাচে-কানাচে কানাঘুষো হতো। কেউ কেউ ঠাট্টাচ্ছলে হাবুলকে বলতো, ঘরের বউ দেখতেই সুন্দরী কাজের নয়। হাবুল মুচকি হাসত, কিন্তু কোনদিন কিছু বলেনি। চুপি চুপি ঘোষকাডাঙা শীতলা মার মন্দিরে গিয়ে মানত করে আসতো। সেই কথা ঘরে এসে ধরিত্রীকে বলতো। ধরিত্রী সেই কথা শুনে চুপ করে যেত। ইচ্ছে করতে কাঁদতে। এক একদিন কেঁদেই ফেলতো। হাবুল ওকে সান্ত্বনা দিত—কাঁদতে নেই বৌ। সময়কালে সব হবে। এত ব্যস্ত হওয়ার কি আছে। এই তো বেশ আছি। ধরিত্রী কাদ কাঁদ হয়ে উত্তর দিত, কবজ নেব। আমাকে নিয়ে যাবে জল্পেসের মেলায়?
—এখন কি! মেলার তো দেরী আছে। যাওয়া যাবে। কিন্তু জঙ্গেস আর যাওয়া হয়নি। তার আগেই মানুষটা হঠাৎ করে না বলে কোথায়। চলে গেল। মানুষটার কথা মনে হলেই চোখে জল আসে। সময়ে-অসময়ে আনমনা ভাবে ট্রেন লাইনের দিকে তাকিয়ে থাকে ধরিত্রী। ট্রেন ছুটে গেলে চেয়ে থাকে অনেকক্ষণ। এই ট্রেনে করেই জল্পেসের মেলায় যাবার কথা ছিল হাবুলের সঙ্গে।
এখন বাড়িতে একা নিঃসঙ্গ একটা জীবন। ছেলেটা যদি বাড়ীতে থাকত, তাহলে সহজেই মতিবাবুকে ঠেকাতে পারতো। মেয়ে মানুষ হয়ে ঐ পিশাচটাকে কি সহজে ঠেকানো সম্ভব? মনে মনে দিনের পর দিন মাথায় নানারকম ফন্দি-ফিকির এসেছে গেছে। এইরকম অবস্থায় মনের সংগে যুদ্ধ করে করে যখন ক্লান্ত একদিন সিনিয়ার সিস্টার। কমলাদি বললেন—চল, আমাদের সংগে হাসপাতলে। ধাইমার কাজ করবি। মাদার ট্রেনিং দিয়ে দেব। ধরিত্রী বলল, আমি তো মুখ মানুষ। লেখাপড়া জানি না। কি করে। ট্রেনিং নেব। কমলাদি ধমক দিয়ে বললেন, ওসব তোকে ভাবতে হবে না। আমরা সব। শিখিয়ে নেব।
সেই থেকে ধরিত্রী হাসপাতালের মাদার। আশেপাশের গ্রামের সব মানুষের মাদার। এখন রুহিডাঙ্গা, প্রেসের ডাঙ্গা, মাথাভাঙ্গা থেকেও লোকজন আসে। কারো জ্বর হয়েছে, কার পেটখারাপ হয়েছে, ধরিত্রী ঠিকঠাক ওষুধ দিয়ে দেয়। কারো আবার বাচ্চা হবে, তাতে মাদারের ডাক। মাদার নিপুণ হাতে প্ৰধ্ব করাবে। এভাবেই কেটে যাচ্ছিল ধরিত্রীর জীবন। একদিন এভাবেই চিকিৎসার পর ফিরছিল পুণ্ডিবাতি থেকে। ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে গিয়েছিল। কারণ জায়গাটা ওর বাসস্থানের থেকে বেশ কিছুটা দূরে। হঠাৎ শুনতে পেল শিশুর কান্না। রাস্তার পাশে ডাম্প করা আবর্জনার মধ্যে শুয়ে একটা বাচ্চা কাঁদছে।
