অস্পষ্ট স্বরে কী যেন বল্ল জ্যোছন। বোঝা গেল না। কান পেতে ছিল বাবলি। মৃদু আড়ষ্ট গলায় ধীরে ধীরে জ্যোছন উচ্চারণ করল—সব পাখী ঘরে আসে, সব নদী।
দিশেহারা চোখে শঙ্করের দিকে চেয়ে বাবলি শুধালো—ও কী বলছে জামাইবাবু?
—ভুল বকছে, বাবলি। ভালো করে ওর মাথা ধুয়ে দাও বীণা, আমি আসছি।
.
রাত অনেক। নির্জন রাস্তার ঘুম ভাঙিয়ে শঙ্করের বাইসাইকেলখানি ছুটছিল। দীর্ঘ পথটুকু নিমেষে পার হয়ে ডিসপেন্সরীর লাগোয়া তেওয়ারীজীর বাড়ীর দরজার কড়া নেড়ে বিহ্বল গলায় শঙ্কর ডাক দিল—ডাকদার সাহাব! ডাকদার সাহাব!
ঠিক তখনই বিছানায় শুয়ে থাকা জ্যোছন অলস মায়াবী চোখে বাবলির দিকে একবার চাইল। জ্যোছনের ঠোঁট দু’খানি কিছু বলতে চেয়ে থরথর করে কেঁপে উঠল। আবার। বাবলি উৎকর্ণ ছিল। কিছু শোনা গেল না।
.
৬.
মনিকর্ণিকার ঘাটে ভিজে এলোচুলে বসেছিল বাবলি। স্নান সারার পর ছোড়দি তাকে কালোপেড়ে কোরা থানখানি পরিয়ে দিয়ে বলেছে—এ শুধু নিয়ম মানার জন্য। তুই। আবার রঙীন শাড়ি পরিস বাবলি।
বিশ্বনাথের মন্দিরের দোরে দাঁড়িয়ে পাথরের মূর্তিকে সাক্ষী রেখে বাবলির সিঁথিতে যে সিদুর এই সেদিন জ্যোছন পরিয়ে দিয়েছিল, মনিকর্ণিকা ছুঁয়ে বয়ে খাওয়া নদীর জলে আজ তা হারিয়ে গেল। পথের ধুলোয় অনাদরে পড়ে রইল নতুন শাখার ভাঙা টুকরো।
বাবলির হাতখানি ধরে বীণা বল্ল–আয় বাবলি।
.
নৌকোটা ঘাটেই বাঁধা ছিল। রাজা মানসিংহের ঘাট, চৌষট্টি ঘাট, দশাশ্বমেধ ঘাট ছুঁয়ে এই তত সামান্য আগে জ্যোছনকে নিয়ে তারা এই নৌকোয় এসেছিল। সিঁড়িতে ভিজে পায়ের ছাপ ফেলে এগিয়ে চলল বাবলি, বীনা, সবশেষে শঙ্কর। বীনার হাতে রাখা বাবলির ভিজে কাপড় থেকে জলের ফোঁটা টুপ টুপ করে ঝরে পড়ছিল। চলতে চলতে হঠাৎ থেমে গিয়ে, শঙ্করের কাছে এসে বাবলি বল্লো,জামাইবাবু?
–কী রে বাবলি?
–ও চলে যাবার আগে কী কথা বলছিল যেন?
—কোন কথা?
—ঠোঁট কেঁপে উঠল বাবলির। নতমুখে ধীরে ধীরে বল্ল-ঐ যে, সব পাখী ঘরে আসে।
সামান্য নীরব থেকে শঙ্কর বন্ধু—ও একটা কবিতার লাইন। সব পাখী ঘরে আসেসব নদী—ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন।
.
নৌকোয় পা রাখতেই ঘুমভাঙা মানুষের মতো চমক লেগে যেন দুলে উঠল নৌকোটা। সন্ধ্যে হয়ে এল। নদীর এপারে একে একে দীপ জ্বলে উঠছিলো। ওপার আবছা হয়ে ধীরে ধীরে দৃষ্টির বাইরে চলে গেল। বাবলির হাতটা ধরে শঙ্কর বল্প—পিছনে তাকাস না বাবলি। পিছু ফিরতে নেই।
ধরিত্রী – জীবন সরকার
সূর্যের আলো গাছের মাথায় হেলেছে। সোনা আলোয় শস্যের জমিতে ঢেউ খেলে যাচ্ছে। একটা শান্ত স্নিগ্ধতা মাঠময়। ধরিত্রী ফিরছে। শরীর ক্লান্ত। আগের মত হাঁটতে পারছে না। একটু জোরে পা না চালালে বাড়ীতে পৌঁছুতে রাত হয়ে যাবে। রাত্রে চলতে পারে না ধরিত্রী। চোখটা একটু ঝাঁপসা।
তাছাড়া আগের মত মনের জোর নেই। সব যেন আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছে। কাঁহাতক আর পারা যায়। এই ঘরে তো আর কমদিন আসা হল না। সবকিছু মনে এলে ধরিত্রীর চোখ বেয়ে জল আসে। অবশ্য কিছু ঠিকমত মনে পড়ে না। কোথায় জন্ম। কোথায় দেশ এসব কিছুই জানে না। শুধু জানে অন্যের বাড়ীতে মানুষ হয়েছে। প্রথম। প্রথম ভাবতোমাদের বাড়ীতে ছিল তারাই। কিন্তু যতদিন যাচ্ছে বুঝতে পারছে ওরা কেউ নয়। ওদের আশ্রয়ে থাকে মাত্র। বিনিময়ে ওরা খেতে দেয়। বাড়ীর গিন্নীমাকে মা বলে। গিন্নীমাও ওকে মেয়ের মত স্নেহ করতেন। তিনিই ওকে বিয়ে দিয়েছিলেন। বিয়ের পর যার ঘরে এল তারও কুিলে কেউ ছিল না। ছিল থাকার মধ্যে একটা ছোট্ট বসত বাড়ী। আর লাগোয়া এক ফালি জমি। বাজারের ব্যবসায়ী মতিবাবুর এই জমিটার ওপর রাবারের লোভ। জমিটা এমন জায়গায় যেখানে এখন রমরমা বাজার। কি নেই ওখানে, বাজার, স্কুল, হাসপাতাল। একটু দুরে রেল স্টেশন। মতিবাবু জমিটার জন্য টাকার অফার দিয়েছে। ধরিত্রীও ফিরিয়ে দিয়েছে। এই জন্যে মতিবাবু কম পিছনে লাগেনি। উঠতে বসতে নানা ফন্দি ফিকির করছে, কি করে জমিটা হাতানো যায়।
মানুষটা থাকতে মতিবাবু কাছে আসতে সাহস পেত না। কিন্তু সেই মানুষটা হঠাৎ চলে গেল। কি যে ব্যামো হ’ল! হাসপাতালের ডাক্তাবাবুরা কিছু করতে পারেনি। ধরিত্রী। একটু ঘরকুণো স্বভাবের ছিল। লাজুক প্রকৃরি। কিন্তু সেই সময় ঘর থেকে বেরিয়েছে, ডাক্তারবাবুদের পায়ে পড়েছে। সিস্টারদের হাত ধরেছে। ধরিত্রীর বার বার যাতায়াতের ফলে ওরা ওকে কাছে টেনে নিয়েছে। ওর স্বামীর জন্যে আন্তরিক চেষ্টা চালিয়েছে। কিন্তু কিছু করতে পারেনি। মানুষটা সব চেষ্টার মুখে ছাই দিয়ে পৃথিবীর মায়া কাটিয়েছে।
এই সমস্ত পুরনো কথা মনে পড়ায় ধরিত্রীর চোখে জল এল। সংগে সংগে এক ঝক পাখী উড়ে গেল দূরের আকাশে। ধরিত্রী একটু থমকে দাঁড়ালো। কোমরে কিরম একটা ব্যথা অনুভব করছে। পা দুটোও খসে যাচ্ছে। আর পারছে না হাঁটতে। কি করে বাড়ী অবধি পৌঁছুবে সেটাই ভাবনা। এখন এই অবস্থায় কারুর সঙ্গে দেখা হোক, এটাও চাইছে না। কারণ দেখা হলেই অসুখের নানারকম ফিরিস্তি শুনতে হবে। কেউ কেউ। ওষুধের জন্যে ধরবে। নয়তো জোর করে ডেকে নিয়ে যাবে বাড়ি। হয়তো কারো জ্বর হয়েছে বা পায়খানা বমি বা কোন জায়গায় কেটেকুটে গেছে। কেননা ধরিত্রী ওদের কাছে। এখন মাদার। এই অঞ্চলে কাছাকাছি ডাক্তার নেই। বাড়াবাড়ি হলে শহরে যেতে হবে। তার সময় কোথায়, টাকা কোথায়। হারে কাছে মাদার— তার শরণাপন্ন হয়। ধরিত্রী কি করে যে ওই হাসপাতালের মাদার হয়ে গেল, তা আজ গল্পের মতো।
