শান্ত গলায় জ্যোছ বল্ল আমি তো চেষ্টা করছি। সারাদিন ছুটোছুটি করছি।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাবলি বকবে যে তোমার একটা চাকরী হবে। অকারণেই কেন কে জানে, বাবার মুখখানি জ্যোছনের চোখের সামনে ভেসে উঠলো, বোন। পূর্ণিরও।
পাশ ফিরে শুয়েছিল বাবলি। নীচুগলায় জ্যোছ বল্প—আমরা কিন্তু এতো তাড়াহুড় না করলেও পারতাম। বাবলি উত্তর দিল না। চুড়ির রিনরিন শব্দ শোনা গেল। দীর্ঘশ্বাস। নিরুত্তর অভিমান। অব্যক্ত এক কষ্টের ব্যথা বাবলির গলার কাছে। ঠেলে ঠেলে উঠছিল। আলতো করে দুহাতে বাবলির মুখখানি কাছে টেনে নিয়ে জ্যোছন শুধোলো–তুমি কাঁদছ বাবলি?
জ্যোছনের হাত দুখানি দূরে সরিয়ে দিল বাবলি, মুখ নীচু করে বল্ল তুমি আমাকে এমন দুঃখ দিলে কেন বলো? কেন আমার এমন সর্বনাশ করলে।
তড়িৎ স্পৃষ্টের মতো ভাষাহীন চোখে বাবলির দিকে চাইল জ্যোছন। আনত মুখে বাবলি ধীরে ধীরে বল্ল—আমার আর কোথাও যাবার জায়গা নেই। কোথাও না। আমার শরীরের ভেতরে একটু একটু করে বেড়ে উঠছে সে ছোট মানুষটা, সে আর কিছুদিন পরে পৃথিবীতে আসবে। তাকে নিয়ে আমি কী করে বাঁচব বলো? তুমি আমার কথা একটুও ভাবো না?
–অবুঝ হয়ো না বাবলি।
.
৪.
দু-তিনদিন বেশ ঘোরাঘুরি করার পর ছোটখাটো একটা ব্যবস্থা হয়ে গেল জ্যোছনের। চাকুরী ঠিক নয়, তবে চাকরীর মতো। গোধূলিয়ার মোড়ের ক্যালকাটা সিল্ক হাউস, বেনারসী শাড়ীর দোকান। বড় বড় হোটেলের কাছে দাঁড়িয়ে থেকে বিদেশী খদ্দের ধরে আনতে পারলে কমিশন পাওয়া যাবে। প্রথমদিন ক্লার্কস হোটেলের কাছে দাঁড়িয়ে থেকে অনেক কষ্টে দু’জন হিপির সঙ্গে আলাপ জমালো জ্যোছন। জ্যোছনের সঙ্গে তারা শাড়ীর দোকানে এলো। পাতলা পাঞ্জাবী আর পাজামা পরা সঙ্গীনির গায়ের রঙের সঙ্গে মানানসই অসংখ্য শাড়ী দেখল রাজপুতদের মতো সাজপোষাক পরা হিপি ছেলেটি। দু’জনে অকারণেই হাসতে হাসতে একে অন্যের গায়ে গড়িয়ে পড়ল। শেষে কোনও শাড়ী পছন্দ না হওয়ায় তারা চলে গেল। শুকনো মুখে জ্যোছ সেদিন বাড়ী ফিরে এল। দ্বিতীয়দিন জ্যোছন যে দু’জন খদ্দেরকে ধরেছিল তাদের একজন শাড়ী কিনল। কয়েকদিন যাবার পর জ্যোছন আবিষ্কার করলো, তার মতো আরও অনেক মানুষ এই কাজ করছে। তবে তারা জ্যোছনের চেয়ে চালাক, এছাড়াও তারা অন্য কাজও করে।
.
সারাদিন রোদ্দুর আর পথের ধুলো মেখে নিয়ে দিনের শেষে ঘরে ফিরে বাবলিকে ডেকে জ্যোছন বল্ল-আজ হাম কামাল কিয়া।
—ইস্ ঘামে একেবারে ভিজে গেছে। জামাটা খুলে ফেল। জামাটা একটানে খুলে খাটের একপাশে রেখে আদ্দিকালের ঘড়ঘড়ে সিলিং ফ্যানের বাতাস খেতে খেতে জ্যোছন বল্ল-আজ আমি কতো রোজগার করেছি জানো? উজ্জ্বল চোখে জ্যোছনের দিকে চেয়ে বাবলি বল্ল-কতো? বল না গো কতো?
—দু’শ’ তেত্রিশ টাকা।
-সত্যি? একদিনে?
অনেক সন্তর্পণে পকেট থেকে ধীরে ধীরে জ্যোছন নোটগুলো বার করল। ঘনিষ্ঠ হয়ে জ্যোছনের পাশে দাঁড়িয়ে বাবলি বল্পকাল রোববার। আমরা কাল বাজার করে আনব, কেমন? দাঁড়াও ছোড়দিকে বলি।
.
রোববার দুপুরে খেতে বসতে বেশ দেরী হয়ে গিয়েছিল। আনাড়ী হাতে অনেক বাজার করেছে জ্যোছন। বারান্দায় পাতা আসনে জ্যোছনের পাশে বসে জ্যোছনের মাছের ঝোলের বাটিতে নিজের বাটিখানি ছুঁয়ে ঠুং শব্দ করে শঙ্কর বলে উঠল—চিয়ার্স। জ্যোছনবাবু যুগ যুগ জিও।
.
৫.
সেদিন দুপুরবেলা জ্যোছনের বিছানার শিয়রে বাবলি বসেছিল। বীনা এসে তার হাতে একখানি ইনল্যান্ড লেটার দিয়ে বল্ল-এই নে বাবলি তোর চিঠি।
–কার চিঠি ছোড়দি?
–রাঙামাসীর, পড়ে দেখ।
—মার চিঠি? মা জানে আমি এখানে?
বীণার দু চোখে স্নেহের হাসি মাখানো। বাবলির দিকে চেয়ে বীণা বল্ল-আমি রাঙামাসীকে চিঠিতে জানিয়েছিলাম।
—তুমি আমার সমস্ত কথা মাকে জানিয়েছ ছোড়দি? সব কথা?
–জানিয়েছি। শুধু জ্যোছনের অসুখের কথা চিঠিতে জানানো হয়নি। চিঠির ভঁজে, আঙুল রেখে চিঠিখানি খুলে পড়তে শুরু করল বাবলি। জানালার শার্সি ছুঁয়ে ফুরিয়ে আসা দুপুর বেলার ম্লান আলো জ্যোছনের মুখে এসে পড়েছিল। বিছানায় জ্যোছন শুয়েছিল। মোটা একখানি কম্বল বুকের ওপর টানা, গলায় মাফলার জড়ানো। মাথার নীচে অয়েল ক্লথ পাতা, শিয়রে জল ভরা বালতি রাখা। প্রায়ই মাথা ধুয়ে দিতে হয়। হাতের কাছে রাখা ছোট টিপয়ে সাজানো ছোটবড় ওষুধের বোতল, কাগজের লেবেল-আঁটা মিক্সচারের শিশি। সেদিন সারনাথ থেকে ফেরার পথে হঠাৎ জ্বর এলো জ্যোছনের।
সন্ধ্যেবেলায় ঘরে বাতি জ্বেলে দিতে এসে জ্যোছনের নিরক্ত ঠোঁট দু-খানিতে দীর্ঘ উষ্ণ স্পর্শ দিয়ে বাবলি বল্ল তুমি ভীষণ রোগা হয়ে গিয়েছ। কতোদিন দাড়ি কাটা হয়নি। কাল সকালে ঘুম থেকে উঠে শেভ করে নিও কেমন?
.
শেষরাতে হঠাৎ অস্পষ্ট গোঙানির শব্দে ঘুম ভেঙে গেল বাবলির। ভয় পেয়ে বীনাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলল। শঙ্করকেও। জ্যোছনের হাত দুখানি বুকের কাছে রাখা। বুকের ভেতর অস্পষ্ট ঘড় ঘড় শব্দ। চোখ খোলা ছিল জ্যোছনের। তবুও এই ঘরের কোন দৃশ্যই যেন জ্যোছনের চেতনায় ধরা দিল না। কোন শব্দই তার শ্রুতিকে ছুঁতে পারলো না। তন্দ্রাতুর মানুষের মতো জ্যোছনের দৃষ্টি অপলকে বার বার কিছু যেন খুঁজছিল। সমস্ত লজ্জা ভুলে গিয়ে জ্যোছনের মুখখানি দু’হাতে ধরে নিজের মুখের কাছে এনে বাবলি বল্ল কষ্ট হচ্ছে? বলো, কোথায় কষ্ট?
