গাড়ীটা একটা বড় স্টেশনে এসে দাঁড়াল।
আলতো করে গায়ে ধাক্কা দিয়ে বাবলি জ্যোছনকে বল্লওঠো। তন্দ্রা ভেঙে বাবলির দিকে তাকিয়ে জ্যোছন শুধলো ‘এটা কোন স্টেশন?’—’পাটনা’ বাবলি উত্তর দিলো। উঠে বসল জ্যোছন। ট্রেনের জানালা দিয়ে হু হু করে ভোরের হাওয়া ভেসে আসছিল। মোগলসরাই স্টেশন পার হয়ে যাবার পর এতক্ষণে বাবলির মনে হল সে সত্যিই বাড়ী থেকে বহুদূরে, বিদেশে চলেছে। মার কথা মনে পড়ল। বাবার কথা, বাপ্পার কথা।
.
২.
ভিড় ঠেলে ঘন্টি বাজিয়ে রিকশাটা ছুটছিল। চওড়া রাস্তায় দুপাশে সাজানো গোছানো। দোকান। পথের পাশে বসে ফুল, বেলপাতা আর ফুলের মালা বিক্রী করছে কেউ কেউ। যতদূর চোখ যায় রাস্তায় মানুষ গাড়ী আর কখনো কখনো বড় সড় গরুদের জমজমাট ভীড়। অবাক হয়ে জ্যোছ চেয়ে দেখল বেশীর ভাগ দোকানের সাইনবোর্ডে হিন্দীর পাশাপাশি বাঙলা ভাষাও লেখা আছে। এতদূরে এসে বাঙলা বর্ণমালা দেখতে পেয়ে, অবাঙালী রিশওয়ালার মুখে ভাঙাচোরা বাঙলা ভাষা শুনতে পেয়ে জ্যোছনের ভারী ভালো লাগছিল। জ্যোছনের হাত আলতো করে ছুঁয়ে বাবলি ব—এখানে কতো রিক্শ দেখেছ? সামান্য থেমে বাবলি, আবার বল্ল-বেনারসে অনেক বাঙালী থাকে জানো তো। মনেই হয় না বাঙলার বাইরে এসেছি।
নিরুত্তর জ্যোছন অপলকে অচেনা পথের দৃশ্য দেখছিল। বাবলি শুধোলো, কী ভাবছ, বল তো?
—কিছু না।
—তুমি জানো না, ছোড়দিরা ভীষণ ভালো লোক। ওদের বাড়ী গিয়ে উঠলে ওরা কিছু মনে করবে না, দেখো। জ্যোছন প্রশ্ন করল, ছোড়দি তোমার কেমন দিদি? বাবলি বল্ল-তোমায় তো বলেছি আগে। ভুলে গেছো? ছোড়দি আমার বড় মাসীর মেয়ে। আমার চেয়ে বয়সে বেশ বড়ো, অথচ দেখো আমরা বন্ধুর মতো।
বাঙালীটোলার এই গলিটার ভেতরে রিকশ ঢোকে না। হেঁটে হেঁটে গলির ভেতরে ঢুকে বাড়ীটা খুঁজে খুঁজে বার করল বাবলি। দেয়ালের চুনবালি পলেস্তারা খসে পড়া সেকেলে বাড়ী। ভারী কাঠের সবুজ রঙের দরজা বন্ধ করা ছিল। অনেকক্ষণ কড়া নাড়ার পর ভেতর থেকে মেয়েলী গলায় কেউ প্রশ্ন করল—কে? কওন?
দরজা খুলে অবাক চোখে চেয়ে রইল বীনা। দেখল, সিঁড়ির ওপর বাবলি দাঁড়িয়ে আছে। সুন্দর মুখখানিতে ক্লান্তির ছাপ, অগোছালো বাসি চুল। পরনে খুব সাধারণ একটি শাড়ী। বাবলির পেছনে বাবলির চেয়ে বয়সে সামান্য বড়, রোগা পাতলা একটি ছেলে অচেনা মানুষের মতো সিঁড়ির নীচে দাঁড়িয়ে।
—আরে বাবলি তুই! হঠাৎ এলি যে? এসো ভাই ভেতরে এসো।
বাবলিকে একান্তে ডেকে নিয়ে বীনা শুধালো, ও কে রে বাবলি?
—একটু জিরিয়ে নিই ছোড়দি, সব বলছি।
.
৩.
তিন ছাদের ওপর মাদুর পেতে বসেছিল জ্যোছন আর শঙ্কর–ছোড়দির স্বামী, বাবলির জামাইবাবু। অন্যদিকে ছোড়দি আর বাবলি।
এখনো সন্ধ্যে হয়নি। শেষ বিকেলের আবছা আলোয় এখানে বসেই নদীর এপারে দশাশ্বমেধ আর মনিকর্ণিকার ঘাট চোখে পড়ে। নদীর অন্যপারে বেশ দূরে অস্পষ্ট ছবির মতো রামনগর শহর।
একথা সেকথার পর শঙ্করের দিকে চেয়ে জ্যোছন প্রশ্ন করল—এখানে চাকরি পাওয়া কি সহজ হবে জামাইবাবু?
শঙ্কর তার ঠোঁট থেকে ফুরিয়ে আসা সিগারেট নামিয়ে বল্ল-সহজ নয়। তবে লাকিলি ঠিক এই সময়েই আমার অফিসে একটি পোষ্ট ভ্যাকান্ট রয়েছে। অ্যাপয়েন্টমেন্টও খুব জলদি হবে। আমি চেষ্টা করব।…
.
বিকেলবেলা ঘরে ফেরার পর জ্যোছনকে বাবলি জিজ্ঞেস করল—ইন্টারভিউ হয়েছিল? বিরস গলায় জ্যোছন উত্তর দিল, হয়েছিল, আমার চাকরী এখানে হলো না।
সামান্য উঁচুগলায় বাবলি শুধালো হলো না! কেন? ম্লান হেসে জ্যোছন উত্তর দিল—চাকরী কি অত সহজে হয়? আর তাছাড়া, আমি কোথাকার ছেলে, এদেশে কি লোক নেই? আমাকে দেবে কেন বলো?
ঘর ছেড়ে আসার সময় সঙ্গে করে সার্টিফিকেট মার্কশীটগুলো আনার কথা বুদ্ধিমতী বাবলি জ্যোছকে বলেছিল। জ্যোছনের হাত থেকে নিয়ে এখন সেগুলো গুছিয়ে তুলে রাখতে রাখতে বাবলি বল্ল-জামাইবাবু ছিলেন না ওখানে? কী বল্লেন?
–ইন্টারভিউ শেষ হয়ে যাবার কিছুক্ষণ পর জামাইবাবু ঘরের বাইরে এসে আমাকে বল্লেন, আমার অন্য যোগ্যতা থাকলেও একটা জরুরী যোগ্যতা আমার নেই। সেটা হলো ক্যান্ডিডেটকে স্থানীয় হতে হবে। আমি গত পাঁচ বছর ধরে বেনারসে আছি। এমন মিথ্যে সার্টিফিকেট আমাকে কি কেউ দেবে?
বাবলি নীরবে জ্যোছনের কথা শুনছিল। জ্যোছ বপ্প-জামাইবাবু আমার জন্যে কিন্তু অনেক চেষ্টা করেছেন। অন্য কেউ হলে আমায় তাড়িয়ে দিত।
জ্যোছনের দিকে চেয়ে বাবলি স্মিত মুখে বল্ল, অমন কথা বলো না।
.
পথের পাশের এই ছোট ঘরখানিতে গভীর রাতে অনেক রকমের শব্দ ভেসে আসে। পথ চলা মানুষের পায়ের ধুপ ধুপ শব্দ। ঘর হারানো ছোট্ট গাধার কর্কশ শব্দ। মশারীর চারপাশে বিন বিন শব্দ করে মশা উড়ছিল। খাটের ওপর জ্যোছনের দিকে পাশ ফিরে বাবলি শুয়েছিল। তার বাঁ হাতখানি জ্যোছনের হাতে ধরা। ঘরের আবছা সবুজ আলোয় স্বপ্নের ছবির মত বাবলির মুখখানি জ্যোছনের দৃষ্টিতে লগ্ন হয়েছিল। ধীরে ধীরে বিছানায় উঠে বসে জ্যোছনের দিকে চেয়ে বাবলি বল্ল এখন কী করবে বলো? পরের বাড়ীতে আর কতোদিন এভাবে–
অনেক রাত হয়েছে, শুয়ে পড়ো বাবলি।
—আমার ঘুম আসছে না, আমার কিছু ভালো লাগছে না।
আমরা কোথায় যাব, কী করবো বলো?
