–না, সেটা বলবো না।
–বলবে না?
–হ্যাঁ,বলব না। কারণ তাঁতিরা শাড়ি বানায়, কিন্তু পড়ে না। ওদের কৌশলের দরকার হয় না।
বলতে বলতে নিয়ামত রসুল বাথরুমে গিয়ে ঢোকে। দরজা বন্ধ করার আগে শুনতে পায় আফরোজা কাদছে। ঘাম-জলের মাখামাখির মতো ও কি বেঁচে থাকার অন্য কোনো মাখামাখি বের করবে? না কি এভাবেই আফরোজা কৌশল জানে, ও ঝগড়া করে না। অনবরত নিজের ইচ্ছেগুলোর কথা বলে যাচ্ছে। কিন্তু কতদিন বলবে? পরবর্তী কি দাঁড়াবে? ও সাওয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ভাবনা এগোয় না।
বাথরুম থেকে বের হলে দেখতে পায় আফরোজা চোখের জল মুছে ফেলেছে। টেবিলে বসে পাঁপড় ভাজা খাচ্ছে। ওকে দেখে স্বাভাবিক কণ্ঠে বলে, চা খাবে?
-আসছি।
নিয়ামত রসুল চুল আঁচড়ে, জামা গায়ে দিয়ে টেবিলে আসে। একট টুকরো পাঁপিড় তুলে নেয়। আফরোজা নিজের প্লেটে কাবাব নিয়েছে। ও হয়তো একটি একটি করে সব খাবে। নিয়ামত রসুল পাঁপড় খেয়ে চায়ের কাপটা টেনে নেয়। আফরোজা মুখ নিচু করে বলে, বিয়ের ছয় মাস হয়ে গেলো, কিন্তু আমাদের সম্পর্কটা দাঁড়ালো না।
–কারণ, শুরুতেই তুমি সম্পর্কের মধ্যে দুর্নীতি ঢুকিয়েছো। বলেছো, উপরি পাওনার জন্য তুমি আমাকে পছন্দ করেছো? শুধুই আমাকে নয়।
–তোমাকে নিয়েই ওটা আমার বাস্তব কথা। যা তুমি করতে পারো, তা করবে কেন?
—সেটা ভালো না মন্দ তা বিচার করতে হবে না?
—আমিতো বিচার করেছি। সেটা অবশ্যই ভালো। ভালোভাবে বাঁচতে হলে টাকার দরকার। আমি তোমাকে নিয়ে ভালোভাবে বাঁচতে চাই।
—জানতে চাও নি আমার আয় আছে কি না?
—ভালো জীবনের জন্য সবার আয় থাকে।
—তুমি যেটাকে ভালো বলছে, সেটাকে আমি ভালো বলতে পারছি না। সেটা দুর্নীতি।
নিয়ামত রসুল টেবিলের ওপর ঠক্ করে কাপটা রেখে চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ায়। আফরোজা কিছু বলে না। কাবাব শেষ করে গাজরের হালুয়া প্লেটে নিয়েছে। নিয়ামত রসুল ড্রইংরুমে বসে সকালে পড়া কাগজটা চোখের সামনে মেলে ধরে। শুনতে পায় আফরোজা কাজের মেয়েটার সঙ্গে চিৎকার করছে। নিয়ামত রসুলের মনে। হয় ও এখন নিজের ভেতরে ক্রোধ এবং যাবতীয় শব্দ ছুঁড়ে ফেলছে। ছুঁড়ে ফেলা ওর কৌশল। ওভাবে প্রতিপক্ষকে দমন করা যায় না। নিয়ামত রসুল নিজের মনে হাসে। হাসতে হাসতে ছাদের দিকে তাকায় আশ্চর্য, দুটো টিকটিকি ওখানে সঙ্গমরত। নিয়ামত রসুল দৃষ্টি ঘুরিয়ে নেয়। আবার তাকায়। একই দৃশ্য আর নেই। ওদের জায়গা বদল হয়েছে, নিজেদের অবস্থান বদল হয়েছে। ওরা আগের জায়গা থেকে পুব দিকে সরে গেছে। ওরা অন্য ভঙ্গিতে যৌনসুখ উপভোগ করছে। দৃশ্যটি দেখতে ওর ভালো লাগছে এবং ও কাগজের আড়ালে মুখ রেখে দৃশ্যটি দেখে পুলকিত হতে থাকে। হঠাৎ ওর মনে হয় আজ রাতে কি মাদি টিকটিকিটির পেটে ডিম হবে। তারপর বাচ্চা। না, ও দু’হাতে কাগজটা খামচে ধরে। মাথাটা হেলিয়ে দেয় সোফার পিঠে। বিড়বিড় করে বলে, না কোনো বাচ্চা নয়।
রাতে আফরোজা ঠাণ্ডা স্বরে বলে, এতদিন তুমি আমাকে পিল খেতে বলেছ, আমি খেয়েছি। এখন আর খাবো না। আমি বাচ্চা চাই।
-না, তা হবে না। আমি বাচ্চা চাই না।
–কেন?
—আমার মনে হচ্ছে, তোমার আমার সম্পর্কের মধ্যে দুর্নীতি আছে।
–মানে? কি বলতে চাও?
–কারণ আমাদের সম্পর্ক শুধুই ভালোবাসাহীন প্রয়োজন। এই সম্পর্কের ভেতরে একটি শিশুকে আনার কোনো মানেই হয় না।
নিয়ামত রসুল আফরোজার উত্তরের অপেক্ষা করে। কিন্তু কোনো উত্তর আসে। ও পাশ ফিরে শোয়। অন্ধকারে আফরোজার মুখ দেখা যায় না। দেখতে পেলে ও কিছু একা ভেবে নিতে পারতো। এখন সে সুযোগ নেই। ও দু’চোখ বোজার আগে ভাবে, এভাবে কতদূর যেতে পারবো আমরা? কে নতি স্বীকার করবে? আফরোজা না আমি? পরমুহূর্তে আপন মনে হেসে নিজেকে বলে, আমিতো নয়ই।
দূরের গাড়ি – অগ্নি বসু
জ্যোছনের ঘুম আসছিল না। নক্ষত্ৰভরা আকাশের নীচে নির্বাক পৃথিবীকে চমকে দিয়ে ঝঝন্ বাজনা বাজিয়ে গাড়ীটা ছুটে চলেছে। বর্ধমান স্টেশন ছাড়িয়ে যাবার পর সামান্য যেন শীত শীত করতে লাগল। জ্যোছ খদ্দরের পাতলা চাদরখানি গায়ে দিয়ে, জানালার শার্সিতে মাথা ছুঁয়ে আধশোরা হয়ে বসেছিল। হু হু করে দূরের গাছপালা, আবছা আঁধারে-মোড়া বাড়ীঘর, আলোকিত জনহীন প্ল্যাটফর্ম ছুটে এসে দৃষ্টি ছুঁয়ে পলকে নিরুদ্দেশ হয়ে গেল। দুলতে দুলতে গাড়ীটা চলেছে। জ্যোছনের মুখোমুখি লোয়ার বার্থে বাবলি শুয়ে আছে। পাতলা সাদা চাদরে গলা পর্যন্ত ঢাকা, মাথার নীচে একটা কীটব্যাগ রাখা।
হাতের কাছে ঘড়ি না থাকায় রাত কতো, জ্যোছ বুঝতে পারলো না। মাথার ওপর মৃদুনীল আলো সার বেঁধে জ্বলছে। পথ চলতে চলতে ঘুমিয়ে রয়েছে কত লোক। বিরাট এক মুসাফিরখানা দুলতে দুলতে দূর থেকে সুদূরে চলেছে। শেষ রাতের ক্ষয়া চাঁদের আবছা আলোয় চোখের ওপর একে একে ভেসে উঠলো মধুপুর স্টেশন, ঝঝা, কিউল জংশন। দুলতে দুলতে টেপাকলের জলে মুখ ধুয়ে নিতে ভারী অসুবিধে হচ্ছিল বাবলির। ভীষণ ঝাঁকুনি দিচ্ছে গাড়ীটা। ভোর এখনও হয়নি। আকাশে এখনও শেষরাতের ছোঁয়া লেগে আছে। রেললাইনের দুপাশে ঘুমিয়ে আছে ধু ধু রুক্ষ মাঠ, দুরের গাছপালা ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে। এতে ভোরে কোনও দিন ঘুম ভাঙেনি বাবলির।
