শরীফ অবাক হয়ে বলে, কি রে কি হয়েছে? তোকে ঠিক এ্যাবসেন্ট মাইন্ডেড প্রফেসরের মতো দেখাচ্ছে। চুপ করে আছিস যে? কি হয়েছে। কিছু একটা তো ভাবছিস। ভাবনাটা কি?
—ভাবনা?
নিয়ামত রসুল শরীফের মুখের দিকে তাকায়। দৃষ্টি স্থির হয়ে থাকে। শরীফের চোখের মণিটা মনে হয় সবুজ। ভুরু জোড়া কালো নয়।
–কি দেখছিস।
—তুই কি আজ নিজেকে দেখেছিস শরীফ?
–না, দেখা হয় নি।
—দেখলে বুঝতি তুই আর আগের শরীফ নেই।
—বোগাস। পুরনো কথা বলছিস। এসব বলে বিদ্যা ফলানো যাবে না। কি হয়েছে বল?
—তুই জিজ্ঞেস কর আমি কি আজ নিজেকে দেখেছি?
—আমার বোঝা হয়ে গেছে, দেখেছিস এবং বুঝতে পেরেছিস যে তুই আর আগের নিয়ামত নেই।
–এখন কি করবো?
—কি আর করবি? বাড়ি যায় আর বউয়ের পা ধরে মাপ চেয়ে নে।
—কেন? মাপ চাইবো কেন?
—ভুলটা তো তোরই।
কথাটা বলে শরীফ ওর পাশ কাটিয়ে হনহন করে চলে যায়। নিয়ামত রসুল রাস্তার পাশের রেনট্রি গাছের কাণ্ডে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থোকে। আশ্চর্য, ও ভেবেছিলো আফরোজার কথাটা ওকে কি বলা যায়, নাকি বলা উচিত হবে? সেই বিষয়টি শরীফ জানে। কেমন করে? কেন করে ওর চারপাশের মানুষের এমন ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় থাকে। ওর নেই কেন? নিয়ামত দু’হাত বুকের ওপর রেখে উত্তেজনা দমন করে চায়। পারে না। ওর হাঁটু কাঁপে। ও প্রাণপণে গাছের গুঁড়ির সঙ্গে নিজেকে সিঁটিয়ে রাখে। দেখতে পায় আফরোজা আসছে। আফরোজা একদম ওর মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়। নিয়ামত রসুল দৃষ্টি অন্যদিকে সরাতে পারে না, সেটা আফরোজার চোখের ওপরই রাখতে হয়। আফরোজা গড়গড় করে কথা বলতে থাকে, কি ব্যাপার এখানে দাঁড়িয়ে আছো কেন? আমি তোমাকে সারা বাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজেছি। শেষে না পেয়ে ভাবলাম তুমি বোধহয় বাইরে গেছে। কখন বেরুলে বাড়ি থেকে? দেখলাম চা’ও খাও নি কাপটা বারান্দায় পড়ে আছে শরীর খারাপ লাগছে।
–হ্যাঁ।
–কই বলনিতো আমাকে? কি হয়েছে?
—ঘামছি।
—ঘামছো? ঘামলে আবার শরীর খারাপ লাগে নাকি? জানতাম না তো? কখনো শুনিওনি।
–তুমি তো কটু গন্ধ পাও।
—দূর এটা একটা কথা হলো, চলো বাড়ি চলো। তোমাকে আমি দামি পারফিউম দেবো। কোনো গন্ধ থাকবে না। পারফিউম দারুণ জিনিস। ব্যবহার করা শিখতে হয়। আমি তোমাকে এসব শেখাতে চাই। কত যত্ন করে তোমার জন্য খাবার বানিয়েছি, কিছুই খেলে না।
—আমার খিদে নেই।
–সেজন্য হাঁটতে বেরিয়েছে, তা বলবে তো? ঠিক আছে, চলো বাড়ি চলো।
—আমি কিছুক্ষণ হাঁটতে চাই।
—চলো, আমিও তোমার সঙ্গে হাঁটবো। তারপর দুজনে একসঙ্গে বাড়ি ফিরবো।
–না, আমি একা হাঁটতে চাই।
—একা হাঁটতে চাও? আমার সঙ্গ তোমার খারাপ লাগছে?
নিয়ামত রসুল হাঁটতে শুরু করে। মনে হয় এতক্ষণ গাছের গুঁড়ির যে সাপোর্টটা ওর দরকার ছিলো এখন আর সেটা দরকার নেই। ও নিজেকে মুক্ত করতে চায়। আফরোজা দু’কদম ওর সঙ্গে হেঁটে বলে, আচ্ছা, ঠিক আছে আমি বাড়ি ফিরছি। এই পলিউশনের মধ্যে আমার হাঁটতে ভালো লাগছে না। আমি বাড়ি যাচ্ছি। আর শোন, আমি কিন্তু আর বেশি দিন এই বাড়িতে থাকবো না। একটা ভালো এলাকায় বড় বাড়ি তুমি ভাড়া করবে। এমন ছোট জায়গা ছোট বাড়িতে থাকলে মন ক্ষুদ্র হয়ে থাকবে। সামনে বাচ্চাকাচ্চা হবে। ওদের আমি বড় পরিবেশে আরাম-আয়েসে বড় করতে চাই।
এসব শুনতে শুনতে নিয়ামত রসুল পায়ের গতি বাড়িয়ে দেয়। পেছনে তাকায় না। জানতে চায় না আফরোজা ফিরে যাচ্ছে, নাকি অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছে? ও পলিউশন ভরা বাতাস টেনে অনুভব করে ওর ভেতরটা বেশ ফ্রেশ লাগছে। কোথাও কোনো দুনীরি বোধ নেই।
পরদিন অফিস থেকে ফেরার পরেও দেখতে পায় আগের দিনের মতো টেবিলে একগাদা খাবার। ও সেদিকে এক পলক তাকিয়ে বেডরুমে ঢোকে। আফরোজা ঘরেই ছিলো। ওকে দেখে ড্রেসিং টেবিলের ওপর তে নতুন কেনা পারফিউমটা তুলে নিয়ে বলে, তোমার জন্য কিনেছি। সকালে দিলু-মিলু এলো। ওরা কেনাকাটা করতে গুলশান যাবে, তাই আমাকে নিতে এসেছিলো। আমি গেলাম। মিলুর কাছ থেকে টাকা নিয়ে পারফিউমটা কিনেছি। চার হাজার টাকা নিয়েছে। আর একটু ভালো কেনার ইচ্ছে ছিলো। টাকার জন্য পারলাম না। দেখো তো তোমার পছন্দ হয়েছে কি না?
-আমি এসব চিনি না।
–দেখোই না, দেখতে দেখতে চিনবে।
নিয়ামত রসুল আফরোজার চকচকে মুখের দিকে তাকায়। আশ্চর্য, কোনো কিছু ওকে আহত করে না। ও ক্রমাগত জালটা ফেলেই যাচ্ছে, তারপর একসময় ওকে টেনে তুলবে। ওর কৌশল নিয়ামত রসুলকে মুগ্ধ করে।
—কি হলো, তাকিয়ে আছ যে?
ইয়ে, মানে, একটা জিনিস জানতে ইচ্ছে করছে।
–কি?
–তোমার পূর্বপুরুষের কেউ কি জাল ফেলে মাছ ধরতো?
–মানে? আঁতকে ওঠে আফরোজা।
—মানে খুব সোজা। তেমন কেউ কি ছিলো যে নিপুণ জেলে, যার জালে ভরে উঠতো অজস্র রূপালি মাছ।
—এসব কি বলছো তুমি?
—হ্যাঁ, এটাও একটা দারুণ দক্ষতার কাজ, সবাই পারে না। কিভাবে জাল ফেলতে হবে বোঝে না। তুমি ভীষণ ভালো বোঝো আফরোজা।
–তুমি আমাকে অপমান করছে। বিয়ের পর থেকেই দেখছি আমার জন্য তোমার কোনো ভালোবাসা নেই। নিশ্চয়ই তোমার প্রেম ছিলো, তুমি সে প্রেমে ব্যর্থ। হয়েছে বলেই আমার সঙ্গে এমন আচরণ করছে।
—প্রেম? হো-হহা করে হাসে নিয়ামত রসুল।
–হাসবে না, হাসবে না বলছি। বলতে বলতে আফরোজা পারফিউমের শিশিটা ছুঁড়ে ফেলে। ক্রুদ্ধ কণ্ঠস্বরে বলে, এরপর তোমার কাছে একটা দামি শাড়ি চাইলে বলবে, আমার পূর্বপুরুষের কেউ তাঁতি ছিলো কি না।
