পাপিয়া বলে উঠলো, তোমার মেয়ে গিয়ে থাকবে তার জন্য দুধের খরচ মা জোগাতে যাবে কেন? লজ্জা করে না, একটা বিধবার ঘাড়ে বসে খেতে?
পাপিয়া প্রায় প্রতি সপ্তাহে মায়ের ওখানে গিয়ে থাকে। এটা তরুণ বা তার বাবা মার একেবারে পছন্দ নয়। তাই ছেলে বউকে আলাদা করে দিয়েছেন তাঁরা। কেননা পাপিয়া রান্না করতে পারবে না বলে দিয়েছে। তার সাফ কথা তোমার বাবা মাকে আমি রান্না করে খাওয়াতে যাবো কেন?
বিধাতা মেয়েদের তৈরী করেছেন সংসারের সুখের জন্য। কিন্তু তরুণ একদিনের জন্য পাপিয়াকে বিয়ে করে সুখী হয়নি। তার মেয়েদের প্রতি সত্যিই এখন বিতৃষ্ণা এসে গেছে। মনে মনে ভাবে বিয়ে করে সে যেন ঘরে বন্দী হয়ে গেছে। বন্ধু বান্ধবের সঙ্গে মেলামেশা বন্ধ। একটু আড্ডা মেরে মনটা হাল্কা করে নেবে তারও উপায় নেই। কেননা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা মারতে গেলেই পাপিয়া ভীষণ অশান্তি করে। বলে, বন্ধু বান্ধবরা তোমার মাথা খাচ্ছে। কে যে কার মাথা খাচ্ছে তা সত্যিই বোঝা মুস্কিল। এক ছাদের তলায় তরুণকে থাকতে হচ্ছে পাপিয়া আর মেয়েকে নিয়ে। মাঝে মাঝে মনে হয়, একবার ছাদটা ভেঙ্গে পড়ুক সব নিঃশেষ হয়ে যাক। ঘরের ফাটা ছাদ দিয়ে মাঝে মাঝে বর্ষাকালে জল পড়ে। বিছানা ভিজে যায়—তা নিয়েও পাপিয়া তাকে কম কথা শুনিয়েছে? পাপিয়ার মাও তো একদিন বললেন, আমার মেয়েকে তুমি কি দিয়েছে? একখানা ছাদফাটা ঘর আর ছোট একটা বারান্দা। যাতে রান্না করে খেতে হয় কোনও রকমে। বর্ষা এলে জলের ঝাঁপটায় রান্না করা দায়। তরুণ এসব কথার কোনো উত্তর দেয় না। বলা যেতে পারে উত্তর দেবার মত কোনো কথা তখন মনে আসে না। ইতিমধ্যে তরুণের বাবা মারা গেলেন। দারুণ স্ট্রোকে আধঘণ্টার মধ্যে সব শেষ। তরুণ এখন নিরুপায়। আর এরই ফাঁকে পাপিয়া আরো যেন দাপটে চেপে বসেছে তার বুকের ওপর জগদ্দল পাথরের মত। কিছুতেই তাকে সরাতে পারছে না।
পাপিয়া-তরুণের ঝগড়া দারুণ রূপ নিল যখন মেয়েকে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি করাতে জেদ ধরলো পাপিয়া। তরুণ তাকে বাংলা মিডিয়াম স্কুলেই ভর্তি করতে চায়। তার যুক্তি—মেয়েকে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়িয়ে কোনো লাভ নেই। তাছাড়া তাদের বাড়ীর সকলেই বাংলা মিডিয়াম স্কুলে পড়েই মানুষ হয়েছে। পাপিয়া নাছোড়বান্দা-মেয়েকে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি করাতেই হবে। সে দেখেছে ছেলে মেয়েকে স্কুলে পৌঁছে দেওয়া নেওয়ার সময় মায়েরা কেমন স্টাইল করে কথা বলে, আড্ডা মারে। তারও ইচ্ছা করে। সঙ্গতি থাক না থাক সেটা তার কাছে বড় কথা নয়।
শেষ পর্যন্ত দুজনের মধ্যে এমন ঝগড়া বাধলো যে তরুণ নিজেকে সামলাতে না পেরে সোজা পাপিয়ার গাল কষে একটা চড় বসিয়ে দিল। পাপিয়ার গালে আঙুলের দাগ বসে গেল। এর আগেও পাপিয়া বেশ কয়েকবার মার খেয়েছে। কিন্তু আজকের ব্যাপারটা তার কাছে চরম অপমানের বলে মনে হল।
আর ঝগড়া নয়, আর মারামারি নয়, সোজা এক কাপড়ে মেয়ের হাত ধরে চলে এলো মধ্য হাওড়ায় মায়ের কাছে। তারপর কুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না—আমি আর শ্বশুরবাড়ী যাবো না। আমাকে একখানা ঘর দাও মা, আমি এখানেই থাকবো।
পাপিয়ার মা কোনো উত্তর দিলেন না। ছোট ভাই নিতাই মুখের ওপর বলে। দিল। এ বাড়ীতে থাকা হবে না। পাপিয়ার কানে কথাগুলো বিষের মত ঠেকলো। শুধু ভাবতে লাগলো— কেন এমন হল?
দাম্পত্য স্মৃতি – লক্ষ্মীদেবী চক্রবর্তী
হাতের নোয়াটা কাপড় দিয়ে বারবার ঘষছিল মাধুরী, খুব করুণভাবে তাকিয়েছিল নোয়াটির দিকে। “আর এইটুকু স্মৃতি না রাখলে কী আসে, যায়। যার জন্য পরা, সে তো মন থেকে বিস্মৃতি।“ মা বলে, “মানুষতো বেঁচে আছে, তুই দাম্পত্য স্মৃতি মুছে ফেলবি কেন? “লাভ কী মা।” মাধুরীর গলায় বেদনাজড়িত সুর। “লাভ আছে। তোর তো একটি পুত্র সন্তান আছে। তার পিতৃ পরিচয়ের জন্য তোর এই স্মৃতিটুকু ধরে রাখতে হবে।” “সন্তানের দায়িত্ব কী সে পালন করছে। পিতামাতার উভয়ের দায়িত্ব, কর্তব্য সন্তানকে প্রতিপালন করা। তাকে বাঁচিয়ে রাখা, মানুষ করে তোলা। পিতামাতা উভয়েই ছোট্ট শিশুটিকে পৃথিবীতে এনেছে। পৃথিবীর মুখ দেখিয়েছে।”
মাধুরীর কতই বা বয়স জোর ত্রিশ। বছর তিনেক আগে স্বামীর ঘর থেকে শেষ বারের মতো চলে আসা। বিয়ের সানাইয়ের রাগিণী যে সুরে বাজলো। জীবনের রাগিণী সেই সুরে বাজলো না। কিসের অভাব ছিল মাধুরীর দেহে মনে। মাধুরী নামের সঙ্গে মাধুর্যের বিন্দুমাত্র ঘাটতি ছিল না। শিক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। বিত্তবান ঘরের মেয়ে। স্বামী রণধীর ও বিত্তবান ঘরের ছেলে।
বিয়ের যৌতুকপত্রে সবেমাত্র মাধুরী ঘর-সংসার সাজিয়েছিল। হাসি ঠাট্টায়, গল্প গুজবে, মাতিয়ে রাখতো রণধীর। আভিজাত্যের গরিমায় রণধীরের ভেতরে চেহারাটা তখন বোঝা যায়নি। ধীরে ধীরে বুঝতে পারলো স্বামী রণধীর অপ্রকৃতিস্থ। অর্থাৎ পর নারীত্বে আসক্ত। যা, অভিজাত বংশের অলংকার অথবা গর্ব। “তবে, বিয়ে করেছিলে। কেন? এত রাতেই যদি বাড়ি ফিরবে। আমি তো স্বেচ্ছায় তোমাদের বাড়ি আসিনি। রীতিমতো কনে দেখে, পুত্রকে বিয়ে দিয়ে বধূমাতাকে বরণ করে গৃহে অধিকার দিয়েছে। আমি সেই অধিকারের থেকে বঞ্চিত হবে কেন?
