“তুমি যখন খুশি অফিস থেকে বাড়ি ফিরবে। আর আমি সেই খুশিটা মেনে নেবো। তুমি ভাবলে কেমন করে? রুখে দাঁড়াল পিতামাতার আদরের একমাত্র কন্যা। মাধুরী।” “তুমি কী করতে চাও।” রণধীরের মুখে অনুচ্চারিত অস্ফুট, বেহাল, কথাবার্তা। “যা, করলে সংসারে শান্তি ফিরে আসে তাই করবে।” “কি অশান্তিতে তুমি এই সংসারে আছো।” “যে, মানুষটিকে নিয়ে আমার সংসার তাকে না পেলে তো অশাস্তি হবেই।” “অহ। বুঝেছি, সেই মানুষটি আমি।” জিভে জড়ানো কথা।
‘তুমি যে, পরনারীর প্রতি আসক্ত, মদ খাও সেই কথাগুলো বিয়ের আগে জানাওনি কেন?” “যদি জানতে তবে কী করতে। পুরুষরা পরনারীর প্রতি আসক্ত হবে না। মদ ছোঁবে না। তবে, এইগুলোর প্রতি আসক্ত কী তোমাদের মতো মাধুরীরা হবে আমার সঙ্গে থাকতে গেলে। এইভাবেই থাকতে হবে। আমি সুন্দরী বউর আঁচল ধরে থাকতে পারবো না। এবং সময়মতো বাড়িও ফিরতে পারবে না। অধিকরাতে বাড়ি ফেরা আমার বহুদিনের অভ্যাস। এই নিয়ে আমার বাড়িতে আমাকে কেউ কোনোদিন উপদেশ দিতে আসে না।
একবার মা আমাকে বলেছিল, “রণ’ এতরাতে বাড়ি ফিরিস এইটা কিন্তু ভালো। সংসারধর্ম করতে গেলে, বউতো এবং ব্যাপারটা মেনে নেবে না। স্বভাবটা একটু পরিবর্তন কর।” মাকে বলেছিলাম, “আমি তোমার দুগ্ধপোষ্য শিশু না। বালক থেকে, কিশোরে। কিশোর থেকে, যুবকে। যুবক থেকে পুরুষে। তুমি তোমার ভাবি বউমার চিন্তায়, আমাকে কখনো কোন উপদেশ দিতে আসবে না।” স্নেহলতা জলভরা চোখ নিয়ে ফিরে গেল। মায়ের কাছে ছেলে নাকি পুরুষ। তবুও মায়ের মন, ছেলেকে ঘর
সংসার করাতে হবে।
সব শুনে মাধুরী: ”তোমার অশালীন আচরণ আমি কিছুতেই মেনে নেব না। কেন তুমি আমার এত বড় সর্বনাশ করলে। যদি তুমি মেনে নিতে না পারো, তবে, যেখান থেকে এসেছে, সেখানে চলে যাও।” “কি, বললে,” মাধুরী শিকারহারা বাঘিনীর মতো রণধীরের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমাকে চলে যেতে বললে, “আমার গর্ভের আগত সন্তান। তার পিতৃ-পরিচয় কী হবে।” রণধীর অনেক কষ্টে মাধুরীর হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে, বাইয়ের নেশার ডাকে চলে গেল। মাধুরী কতক্ষণ এইভাবে পড়েছিল সে জানে না। তার, মনে হলো, কোথাও ভূমিকম্প হয়েছে, জীবন, সংসার ধ্বংস হয়ে গেছে। ধ্বংস হয়নি শুধু যার, যা নেশা। “আবার নতুন করে সব সাজাতে হবে।”
দুর্নীতি – সেলিনা হোসেন
নিয়ামত রসুল যতদিন একা ছিলো ততদিন তার জীবনযাপনের ভাবনা ছিলো এক ধরনের। বিয়ের পরে দুমাস না যেতেই ওর মনে হচ্ছে ও অন্যরকম মানুষ হয়ে গেছে। বউয়ের সঙ্গে জড়িত জীবন যেহেতু ওর একার নয়, সেহেতু ও এখন এক ধরনের অস্বস্তির মধ্যে দিনযাপন করছে। বিয়ের দুমাসের মধ্যেই বউ বলেছে, তোমার চাকরিতে উপরিপাওনা আছে বলেই এখানে বিয়েতে রাজি হয়েছি, নইলে রাজি হতাম না। আমার জন্য কত প্রস্তাব ছিলো আমি রাজি হইনি।
নিয়ামত রসুল একথা শুনে অস্বস্তিতে আফরোজার দিকে তাকায়। ওর গলা শুকিয়ে যায় বুকের কাছে কি যেন একটা এসে আটকে থাকে। আফরোজা ভুরু কুঁচকে বলে, কি হলো? অমন করছো কেন? আমার কথা শুনে তুমি ভয় পেয়েছো মনে হচ্ছে। খুব কি খারাপ কিছু বলেছি?
-ইয়ে, মানে, তুমি আমাকে ঘুষ নিতে বলছো?
—ঘুষ কেন হবে? ওটা একটা উপরিপাওনা। তোমার যোগ্যতার সম্মানী। পরিশ্রমের জন্য বাড়তি আয়।
নিয়ামত রসুল গলা নিচু করে কঠিন স্বরে বলে, এটা দুর্নীতি।
—দুর্নীতি? হো-হো করে হাসে আফরোজা। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করেছে। বাবা পুলিশ অফিসার। আয়ের চেয়েও বাড়তি আয়ের প্রাচুর্য ছিলো বলে আয়েসেই জীবন কেটেছে। নিয়ামত রসুল বউয়ের হাসি শুনে বিব্রত মুখে চুপ করে থাকে। এটা যে হাসির বিষয় হতে পারে তাও কল্পনা করতেই পারে না। একবার ভাবে চেঁচিয়ে উঠে বলবে, এত হাসছো কেন? তোমার লজ্জা করে না হাসতে? কিন্তু বলা হয় না। ভয় করে, নিজের ভেতরে কুঁকরে যায়। পরক্ষণে নিজেকেই বলে, ভয়। কাকে? কিন্তু বুঝতে পারে না অদৃশ্য সুতোর টানটা কোথায়। এই না বুঝতে পারাই ওর এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা। আসলে ও বুঝতে পারছে ভয়টা ধ্বস নামার। স্কুল শিক্ষক বাবা চাকরি শুরুতেই বলে দিয়েছিলো, বাবা সৎ উপার্জন খাওয়াবি। হারামের টাকা আমাদের জন্য না। ওটা আমরা ছুঁতে চাই না। এখন স্ত্রী অন্য জীবনের কথা বলছে। যে জীবনে ঢুকলে বাবা-মায়ের কাছ থেকে শেখা নিজেরও বিশ্বাস ধ্বসে পড়বে। নিয়ামত রসুল স্ত্রীর তীব্র দৃষ্টির সামনে বিষণ্ণ হতে থাকে। ওই দৃষ্টি ওর ভেতরে ঢুকলে ও চোর হয়ে যায়, বেরিয়ে এলে পুলিশ হয়। আফরোজা খেকিয়ে উঠে বলে, কি হলো তোমার?
—খেলছি।
–খেলছো? কার সঙ্গে?
–নিজের সঙ্গে।
—কিভাবে?
–বুঝবে না।
–বললে, আমিও খেলতাম।
—ওই খেলার সাধ্য তোমার নেই।
—খেলাটার নামটা বলো না?
—চোর-পুলিশ?
—চোর-পুলিশ? হো-হো করে হেসে ওঠে আফরোজা।
—চোর পুলিশ হতে পারে না, কিন্তু পুলিশ চোর হয়, তখন কিভাবে খেলবে? আফরোজা রেগে গিয়ে বলে, তুমি আমাকে অপমান করছো।
—আশ্চর্য, তুমি অপমান বোঝ?
এবার হো-হো করে হেসে ওঠে ও। মনে হয় সমস্ত বিষণ্ণতা কেটে গিয়ে ও নিজের মধ্যে ফিরে এসেছে। খেলায় ওর জিৎ হয়েছে। আফরোজা দুপদাপ পা ফেলে। অন্য ঘরে চলে যায়। নিয়ামত রসুল হাসতে হাসতে ভাবে, এভাবেই কি এ জীবনের রঙ দেখা শুরু হলো! ও দাঁতে ঠোঁট কাটে। হাসি এখন সারা ঘরে। দেয়াল থেকে, আসবাবপত্র থেকে হাব্বি ধ্বনি আসছে। নিয়ামত রসুল বাইরের পৃথিবী দেখবে বলে জানালার কাছে এসে দাঁড়ায়। জানালার শিকগুলো ভীষণ ঠাণ্ডা।
