এদিকে অনেকক্ষণ ধরে চেঁচামেচি শুনে তরুণের বাবা আর স্থির থাকতে পারলেন না। ছেলে-বৌ এর ভেজানো ঘরের দরজা ফাঁক করে দেখলেন। বৌমা মাটিতে পড়ে আছে আর তার চুলের মুঠো ধরে ছেলে বীরবিক্রমে টানছে। পাপিয়া চিৎকার করে বলছে, মরে গেলুম, মরে গেলুম।
তরুণের বাবা সঙ্গে সঙ্গে ঘরে ঢুকে, ছেলেকে কড়া সুরে এক ধমক লাগালেন—এটা কি বস্তিবাড়ী পেয়েছো? লজ্জা করে না মেয়েছেলের গায়ে হাত দিতে? জানো, রাবণের কথা, সীতার চুলে হাত দিয়েছিল বলে রাবণের বংশ নিবংশ হয়ে গিয়েছিল?
শ্বশুরের সমর্থন পেয়ে পাপিয়া ততক্ষণে মাটি থেকে সোজা দাঁড়িয়ে উঠে বললো, এরকম বংশ নিঃবংশ হয়ে যাওয়াই ভাল। তোমরা সবাই মরো, আমি ভগবানের কাছে প্রার্থনা করছি এ বাড়ীতে ঘু ঘু রুক।
শশুর মশাই কথাগুলো শুনে খুবই ক্ষুব্ধ হলেন। তার সমস্ত অজ্ঞাত্মা বার বার কেঁপে উঠতে লাগলো। তিনি চোখে অন্ধকার দেখতে লাগলেন। ভাবলেন, স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়ায় কেন মাথা ঘামাতে গেলেন? এদিকে মাথা না ঘামালেও নয়। কেননা বাড়ীতে এরকম একটা বিশ্রী কাণ্ড হচ্ছে, আশেপাশের বাড়ীর লোক শুনছে, নিজের মান সম্মানই বা কি করে বজায় থাকে? বাইরে বের হলে লোকে যে তাকে দেখে ঘেন্নায় মুখ ফিরিয়ে নেবে। এ কথা ভাবতে ভাবতে ভদ্রলোক অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে গেলেন।
ওদিকে তরুণ তারস্বরে চেঁচাচ্ছে হল তো, একটা অঘটন না ঘটিয়ে তুমি ছাড়বে না। বৌ-এর দিকে তাকিয়ে কুটি হানছে। দু বছরের মেয়েটা দাদুর এই অবস্থা দেখে রীতিমত ভয়ে সিঁটিয়ে আছে। ঠাকুমা ঠাকুমা বলে দুবার কান্নাজড়ানো স্বরে ডাকলো। পাপিয়ার তখনো রাগ পড়েনি। সেই অবস্থাতেই চেঁচিয়ে বললো, বাড়ীর ধারা যাবে কোথায়? বুড়োর উচিত শিক্ষা হয়েছে। কেন আমাদের ব্যাপারে নাক গলাতে গেলেন? উনি উনার মত ঘরে বসে থাকলে। বুড়োর সব ব্যাপারে মাথা গলানো চাই। এতে তরুণ আরো ক্ষিপ্ত হয়ে বলে উঠলো, এখুনি বাড়ী থেকে বেরিয়ে যাও।
ততক্ষণে তরুণের মা রান্নাঘর থেকে ছুটে এসেছে। ছুটে এসেছে বাড়ীর রাতদিনের কাজের লোক সন্ধ্যা। তরুণ বাথরুম থেকে একমগ জল এনে বাবার চোখেমুখে জলের ঝাঁপটা দিতে লাগলো। তার মা সমস্ত কাণ্ড দেখে রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে বললেন, তখনই বলেছিলাম, ও ঘরে মেয়ে সুবিধের হবে না। কিন্তু বুড়ো শুনলো না। এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে, কেন হাড় জ্বালানে বৌ ঘরে এনেছে। পাপিয়াও দমবার পাত্র নয়। ঐ অবস্থাতেই ফোঁস করে উঠলো। বলি কোন রাজকন্যা আপনার ‘রাজপুত্তর’ ছেলের গলায় মালা দিত? অমন ছেলের গলায় দড়িও জোটে না। তরুণ রাগে অগ্নিশর্মা হলেও বাবার অবস্থার কথা বিবেচনা করে কোনোরকমে নিজেকে সামলে নিল। বাবার জ্ঞান কিছুতেই ফিরছে না। শেষ পর্যন্ত ডাক্তার ডাকা হল। ডাক্তার এসে সব শুনে বললেন, খুব মানসিক আঘাত পেয়েছে। ভদ্রলোকের কিছুদিন বিশ্রাম প্রয়োজন, আবার এরকম হলে বড় ধরনের স্ট্রোক হবার সম্ভাবনা আছে। এখন সামান্য একটা স্ট্রোক হয়েছে।
ব্রেন স্ক্যান করা, ওষুধপত্র সব মিলিয়ে অন্ততঃ পাঁচ হাজার টাকা খরচ হয়ে গেল। তাতে পাপিয়ার কিছু যায় আসে না, মনে মনে ভাবে এটা পাপের শাস্তি।
সত্যি মানুষ যখন নিরুপায় হয়ে যায় তখন বুঝি তার এই দশাই হয়ে থাকে। অথচ এই শশুরের রোজগারের টাকায় এতদিন সংসারটা বেশ ভালভাবেই কেটেছে। এখন তার বিশেষ কর্মক্ষমতা নেই। তাই সংসারে তার কদর কমে গেছে। এখন তিনি শুধুই করুণার পাত্র।
সারা জীবন বাবা প্রচুর টাকা রোজগার করেছে। ব্যাঙ্কে ভাল টাকাও জমা আছে। ছোট ছেলে অরুণ বাবার এই অবস্থার কথা জেনে দিল্লী থেকে সপরিবারে এসে গেছে। ছোট ছেলে প্রস্তাব দিল বাবাকে একটা ভাল নার্সিং হোমে ভর্তি করা হোক। তরুণ কিছুটা রাজীও হয়ে গেল। কিন্তু বাদ সাধলো পাপিয়া। রাত্রে শোবার সময় স্বামীকে বললো, বুড়ো বাপটাকে নিয়ে অত আদিখ্যেতা করতে হবে না? ঢের বয়স হয়েছে। ওকে এখন বাঁচিয়ে রেখে কোনো লাভ হবে না। আমার মেয়েটার জন্য দুবেলা দুধ জোটাতে পারছে না, আর বাবার জন্য ভাল নার্সিং হোমের ব্যবস্থা?
তরুণ বোঝাবার চেষ্টা করলো–বাবার টাকাই তো খরচ হবে। আমাদের তো আর কোনো টাকা পয়সা খরচ করতে হচ্ছে না।
সঙ্গে সঙ্গে পাপিয়া চাপা অথচ ঝাঝালো গলায় বলে উঠলো-বাবার টাকা বেশী খরচ হয়ে গেলে তোমরা তো ভাগে কম পাবে সেটা কি কখনো ভেবে দেখেছো?
তরুণ সত্যিই এতটা নিচু মন নিয়ে কোনোদিন ভাবতে পারেনি। কথাগুলো তার বুকে যেন শক্তি-সেলের মত বিধলো। বললো, তাহলে তোমার মার অসুখের সময় অতগুলো টাকা আমার কাছ থেকে নিয়ে গিয়ে খরচ করলে কেন? তোমার মার তো অনেক বয়স হয়েছে। তাকে নার্সিং হোমে ভর্তি করাতে গেলে কেন? কই তখন তো তোমার ভাই গরীব সেজে দিব্যি হাতগুটিয়ে বসে থাকলো।
কথাগুলো পাপিয়ার কাছে আগুনে ঘৃতাহুরি মত মনে হল। সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল—তোমার বাবার চেয়ে আমার কাছে আমার মায়ের দাম অনেক বেশী। তোমার বাবা মারা গেলে সংসারের খুব একটা ক্ষতি হবে না। কিন্তু আমার মাকে এখনো তিন তিনটে মেয়ের বিয়ে দিতে হবে। মা মারা গেলে ঘাই অনাথ হয়ে যাবে।
তরুণও ছাড়বার পাত্র নয়। পাপিয়ার দিকে রক্তবর্ণ চোখ করে বলে উঠলো—অতই যদি মায়ের প্রতি দরদ তবে বিয়েটা করেছিলে কেন? মায়ের কাছেই তো সারাটা জীবন কাটিয়ে দিতে পারতে। মেয়ের বিয়ে দেওয়া মানে জামাইকে দুইয়ে নেওয়া নয়, একটা ইনকামের উৎস নয়। মায়ের ওখানে গেলেই তো খাওয়ার খরচা দিতে হয়। কেন, মা তার মেয়েকে খাওয়াতে পারে না?
