কথাটা মনে পড়তেই বুকের মধ্যে আবার একাট উথাল পাথাল শুরু হয় শুভময়ের। তার মনে হয় তাহলে কি রনিতার এই চলে যাওয়াটা একটা অজুহাত? আসলে বারে বাড়ি গিয়ে……
ঠিক সেই মুহূর্তে ফোনটা বেজে ওঠে। ওরফে রিয়া।
–জামাইবাবু, কি করছেন?
–এ্যাই…..মানে…….
নিশ্চয়ই কারুর ধ্যান করছে, হয় দিদির, না হয় আমার?
–তুমি থামো তো রিয়া, তোমার জন্যেই আজ……
শুভময় তার কথা শেষ করার আগেই রিয়া বাঁধ ভাঙা হাসিতে ফেটে পড়ে, তারপর হাসতে হাসতে বলে, তাহলে স্বীকার করছেন তো আপনার হার হয়েছে?
–তার মানে?
তার মানে বুঝতে পারছে তো মশাই। আপনি চ্যালেঞ্জ করেছিলেন আপনার আর দিদির বোঝাপড়া কেউ ভাঙতে পারবে না। গত পাঁচবছর আপনাদের মধ্যে কোন দাম্পত্য কলহ হয় নি। আপনার সে গুমোর ভাঙতে পেরেছিলো। জামাইবাবু মাত্র সাতদিনের মধ্যে!
—রিয়া! তুমি…..
—খুব হয়েছে। এবার বাকি কাজটা আমায় করতে দিন। আগামীকাল রবিবার ছুটির দিন আপনার শ্বশুরবাড়িতে একবার আসুন।
-আমি…..মানে…….
–আপনার কোন প্রেসটিজ যাবে না মশাই। দিদিকে আমি সব বলেছি। আগামীকাল আপনি আমাদের বাড়িতে এলে আপনাদের ভাঙা বোঝাপড়া জোড়া লাগাবার দায়িত্ব আমার। ভাল কথা, তারকাকেও আসতে বলেছি।
—তারক! নামটা শুনেই শুভময়ের মেজাজটা কটাং করে উঠলো।
ফোনের ওধার থেকে তা ঠিক বুঝতে পারলো রিয়া। সঙ্গে সঙ্গে আর এক ঝলক হেসে বললো—তারকাকে সেদিন বিকেলে আপনার ফ্ল্যাটে আমিই পাঠিয়ে ছিলাম। কারণ সন্দেহের ধোঁয়াটা দু তরফে না দিলে দাম্পত্য কলহের খেলাটা জমতে না।
—এ্যাঁ! রিয়া…তুমি……তুমি…..
প্রচণ্ড বিস্ময়ে শুভময়ের কথা আটকে যায়। রিয়া হাসতে হাসতে ফোনের রিসিভার রাখে।
.
বোধহয়? এ গল্পের শেষটুকু আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
তবে একটা তথ্য দিতে পারি। পরদিনই শুভময় শ্বশুরবাড়ি গিয়ে রনিতাকে নিয়ে নিজের ফ্ল্যাটে ফিরেছিল এবং আসার আগে পরের সপ্তাহে তাদের শুভ বিবাহ বার্ষিকীতে রিয়া, বঙ্কিম এবং তারককে আমন্ত্রণ জানিয়ে এসেছিল।
অতঃপর শুভময় রনিতার ষষ্ঠ বিবাহ বার্ষিকীর পার্টিটা যা জমেছিল না— দারুণ!
দাম্পত্য কলহের অন্তরালে – বরুণ মজুমদার
শেষ পর্যন্ত পাপিয়া বাপের বাড়ী যাবার সিদ্ধান্ত নিল। এর চেয়ে অনেক ভাল মায়ের মুখ ঝামটা খাওয়া। স্বামী হিসাবে তার মনে মনে একটা স্বপ্ন সে এঁকে নিয়েছিল। সে হবে শিক্ষিত, সরকারী চাকুরে, লম্বায় হবে অন্তত: ৬ ফুট। কিন্তু এধ্ব কিছুই হয়নি। সামান্য একটা ইলেকট্রনিক্স-এর দোকানের মালিক তরুণ। তাও আবার দোকানের মালিকানা নিজের নামে নয়, বাবার নামে।
স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া বলতে গেলে বিয়ের এক সপ্তাহের মধ্যে শুরু হয়ে গিয়েছিল। সামান্য ঘটনাগুলো তার কাছে অসামান্য হয়ে উঠতো। পাপিয়া জানে না সংসার করতে গেলে বিশেষ করে পরের ঘর করতে গেলে অনেক কিছু মানিয়ে নিতে হয়। তার বিধবা মা অন্ততঃ এই পাঠটুকু তাকে শেখায়নি। তার ফলেই যত বিপত্তি।
স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া বলতে গেলে সব সংসারেই লেগে থাকে। কিন্তু আবার কিছুক্ষণ পরে তা মিটে যায়। কিন্তু এদের ঝগড়া শেষ পর্যন্ত হাতাহাতিতে পরিণত হবে তা কি দুজনের একজনও ভাবতে পেরেছিল?
না, ভাবতে কেউই পারে না। সংসারে স্ত্রীকে হতে হয় সর্বংসহা—একথা তো আমাদের মা ঠাকুমার আমল থেকে বারবার শুনে আসছি। আবার অনেকের বাড়ীর দেওয়ালে কাচ কাঠের ফ্রেমে আঁটা সাদা কাপড়ের ওপর সিফন সুতোর কাজ করা সে লাইনটাতো ঝোলে সংসার সুখের হয়, রমণীর গুণে। আজকালকার, অর্থাৎ আধুনিক যুগের মেয়েরা একথা মানতে রাজী নয়, কেননা এটা তো একবিংশ শতাব্দীর যুগ। নারীকে পুরুষের সমান অধিকার দেবার জন্য সংসদে বিল আসছে, সংসদ ও বিধানসভায় নারীদের আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা হয়েছে, লু যুগের অগ্রগতির সঙ্গে আমরা ও আমাদের ছেলেমেয়েরা কি তাল রাখতে পেরেছে? পাপিয়ার শ্বশুর মশাই মাঝে মাঝেই কথাগুলো শাশ্বত বাণীর মত আউড়ে গেছেন। কিন্তু তাতে কি কোনো কাজ হয়েছে। না, কিছুই হয়নি।
পাপিয়া আর তরুণের মধ্যে ঝগড়াটা দিন দিন বেড়েই চলেছে। পাপিয়ার অভিযোগ আমার মায়ের কাছে তোমার বাবা মিথ্যা কথা বলে নগদ ১০ হাজার টাকা পণ নিয়েছে। তার সঙ্গে দামী খাট আর আলমারী, ড্রেসিং টেবিল তো আছেই। লজ্জা করে না?
তরুণও দমবার পাত্র নয়। সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলো তোমার মা তো আমার বাবাকে বলেছিল, তুমি বি.এ. পাশ করেছে। কই বিয়ের নি বছর কেটে গেলেও তো তোমার বি.এ. পাশের মার্কশীট বা সার্টিফিকেট কিছুই যোগাড় করতে পারলে না। অন্ততঃ আমাকে বা আমার বাবাকে দেখাতে পারলে না। তোমাদের পাড়ার কাউন্সিলর নিতাইবাবু ঠিকই বলেছিলেন যে তুমি আসলে বি.এ. ফেল করেছে। এসব জালিয়াতি ছাড়া কিছু নয়।
পাপিয়াও ছেড়ে বলার পাত্রী নয়। সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল—তোমার বাবা তো বলেছিল, মাসে তোমার আয় পাঁচ হাজার টাকার বেশী। কই পাঁচশো টাকাও তো তোমার হাতে কোনোদিন দেখিনি। মা তো খবর নিয়ে জেনেছে যে, তোমার বাবার রোজগারে সংসার চলে। সংসার চালানোর মুরদ নেই যার সে আবার বিয়ে করতে যায় কোন সাহসে?
কথাগুলো ঝা ঝা করে তরুণের কানে গিয়ে বিধলো। তার পৌরুষ খোঁচা খাওয়া বাঘের মত যেন আহত হল। প্রাণপণে তাই ধাক্কা দিয়ে পাপিয়াকে মাটিতে ফেলে চুলের মুঠো ধরে হেঁচড়ে টানতে লাগলো।
