—অ্যাই না, কথা অন্যদিকে ঘোরানো যাবে না। অন দ্য ট্র্যাক প্লিজ ….
ফোর্ট উইলিয়ামের দিকে ব্রিগেড়ে বসে কথা বলছিল জয়ন্ত নন্দিনী। এক অফিসে কাজ করে। ইন্টারন্যাশনাল ব্যাঙ্কে। দুপুরে টিফিনের সময় অফিসে সবুজ একটা শাড়ি দেখাচ্ছিল নন্দিনী। দিন দুই আগে ময়দানের টেক্সটাইল ফেয়ার থেকে কিনেছে। পছন্দ করেই কিনেছে এবার অপরের চোখ দিয়ে যাচাই করে নিচ্ছে কেমন হয়েছে। দু-চারজন তারমধ্যে বেশিরভাগ মহিলা জড়ো হয়ে মতামত জানিয়ে যাচ্ছে। ভিড় একটু পাতলা হতে জয়ন্ত শাড়িটা হাতে নেয়। তারপর চারপাশ দেখে নিয়ে বলে, কাকে প্রশংসা করব শাড়ি না যে কিনেছে তাকে বুঝতে পারছি না।
—আহা তেমন ভালো হয়নি বুঝি?
—এক্সসেলেন্ট। তাই তো বলছি এ জিনিস যে সে কিনতে পারে না। নন্দিনীকে ভালো করে দেখে নিয়ে যোগ করে, আজ খানিক খোশগল্প হবে নাকি?
—আজ আবার? নন্দিনী প্রথম বলাতেই রাজি হয় না। একটু অনুরোধ উপরোধ না হলে ….. আবার জোরও দিচ্ছে না যদি একদম কেটে যায়।
—থাক তাহলে। আর একদিন না হয়, যখন অসুবিধে আছে, জয়ন্ত আস্তে বলে।
–অসুবিধে তেমন নেই। তাহলে কখন?
—যেমন হয়। ওই চারটে নাগাদ।
—অ্যাই আজ মনে আছে তো? সাড়ে পাঁচের মধ্যে বাড়ি আসা চাই-ই।
—কি বলেছিলে যেন ….. এখুনি ঠিক মনে পড়ছে না … আসলে এত কিছুর ভিড় মাথায় ….. কোনটা ছেড়ে কোনটা যে ধরি ….. জয়ন্ত মনে করার চেষ্টায় দিশেহারা।
—ওহো ডিসগাসটিং। কবে থেকে বলছি আজ আনন্দদার ম্যারেজ অ্যানিভারসারি। সেদিন বাড়ি এসে বলে গেছে, তমালিকা খুব বলেছে, এরপরও মিস হলে ওরা …..
—ঠিক আছে, চলে আসব সময়ে, জয়ন্ত প্রসঙ্গ এড়াতে চায়।
সুতপা চোখ বড় করে, উহঁ অত ক্যাজুয়াল হলে হবে না। দুদিন পরই চলে যাবে আনন্দদা মেরিল্যান্ডে। এরপর কবে আবার …..
–এটা ঠিক যাবই যাব, তুমি দেখে নিও। জয়ন্ত বউয়ের গালে ঠোনা মারে। সুতপা খুশি হয়, মনে করে এসো কিন্তু। নইলে আমার প্রেস্টিজ পাংচার।
তা এভাবেই চলতে থাকে। আজ অ্যানিভারসারি, কাল অন্নপ্রাশন, পরশু গেটটুগেদার ….. এখানে যাওয়া সেখানে যাওয়া। চোখের পলকে দিন ফুরিয়ে যায়, রাত কেটে যায় ঝড়ো হাওয়ায় …. দামাল হলেও ভেসে যাওয়া যায় না, কোথায় আবার কী বেঁধে যায়! কত কিছু ঝামেলা এই জীবনে। সুতপার নাচের প্রোগ্রাম, স্কুলের চাকরি ….. জয় অফিসের চাপ, প্রমোশন, এর মাঝে আবার পাহাড় হাতছানি দেয় তাকে। এত সবের উপর আবার নতুন কোনও ঝামেলা এলে সামলাবে কী করে? তা কেমন করে হয়? তবু কি করে যেন হয়ে যায়। সব জিনিস তো নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলে না। হয়তো দামাল হওয়ার প্রম আবেগে ভেসে গেছে তারা ….. হয়তো কিছুই নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা দেয় না। যে করেই হোক ছোট নবীন প্রাণ আভাস দেয় তার সলাজ উপস্থিতির। কিন্তু সে তো এক চরম ক্ষণ দুজনেরই জীবনে! জয়ন্তর সামনে রুরাল অ্যাসাইনমেন্ট, ঠিকঠাক সেরে আসতে পারলে চারদাঁড়ির ভারি চেয়ার, সুতপার ঠাসা প্রোগ্রাম নাচের। এসবের মাঝে অনাগত সেই নবীন মুকুলিত প্রাণ বড়ই অবাঞ্ছিত। তড়তড়ে এগোনোর পথে ভীষণ বাধা। ঝরঝরে হয়ে নাও, ফরফরে জীবন ডাকছে। সবে তো সন্ধে, সারা জীবন পড়ে আছে সংসারে জড়ানোর জন্য। সাত তাড়াতাড়ি জড়িয়ে পড়ার নেই প্রয়োজন। ফলে সেই বীজ জরায়ুর অন্ধকার থেকে চলে যায় গাঢ় অন্ধকারে, হিম শীতলতার জমাট আস্তরণে। ডাক্তারবাবু রাজি ছিলেন না। প্রথমবার এটা, ভালয় ভালয় হয়ে যাক, তিনি বলেছিলেন।
তা হয় না … এটা ঠিক হলে কত কিছু বেঠিক হয়ে যাবে যে! ঝরঝরে হয়ে যায় সুতপা। তারপর দুজনেই চলেছে নিজ কক্ষপথে। আবর্তিত হতে হতে কখনও সখনও কাছে এসেছে, কিন্তু ক্রমাগত ঘূর্ণনে খুব কাছে আসা যায় না। সংঘাতের ভয় দুজনকে ছিটকে দিয়েছে। এখন বিয়ের সাত বস্ত্র পর নিজের নিজের কাজ নিয়ে তারা আছে। পারিবারিক, সামাজিক নানা উৎসবে একসঙ্গে যাওয়া আসা, কথাবার্তা, হালকা লোক-দেখানো সোহাগ বিবাগ এই পর্যন্ত। ভেতরে ভেতরে মাটি আলগা হয়ে গেছে। এখন চাইলেও কোনও নবীন প্রাণ মুকুলিত হবে না এই শুষ্ক, উষর বাগানে। চরম উৎকণ্ঠা, চাপা টেনশনে অতিবাহিত রাত্রিদিন কখন কেড়ে নিয়ে গেছে সেই সব সজীব, সক্ষম ডিম্বাণু শুক্রাণুদের কে জানে!
নন্দিনীর মাঝে মাঝে নিজেকে খুব ক্লান্ত, একা মনে হয়। তিরিশটা বসন্ত চলে গেল বু সে যে সেই কাঙাল রয়ে গেল। কোন অশুভ ক্ষণে যে বড় সন্তান হয়ে জন্মেছিল! সাপ যেমন করে জড়ায় সেইরকম পাকে পাকে জড়িয়ে গেল এই সংসারে। এখন যে এখান থেকে সটকে পড়বে উপায় নেই। ভালো না লাগলেও, মনের বিন্দুমাত্র সায় না থাকলেও টেনে যেতে হচ্ছে এই ভীষণ ভার। যবে থেকে বাবার চাকরিতে যোগ দিল তার স্বতন্ত্র অস্তিত্ব মুছে গিয়ে নতুন পরিচয় স্থান করে নিল সেখানে। সে এখন আর কোনও তিরিশ বছরের প্রত্যাশামুখী নারী নয়, সংসারের ছেঁড়া সুতো জোড় লাগানোর যন্ত্ৰী মাত্র। চাহিদার জোগানদারের জীবনে পযুদস্ত তার জীবন মনন। সংসারের তার উপর এই কঠিন দাবির কারণও রয়েছে অবশ্য। চাকরি করতে করতে বাবার হঠাৎ দুর্ঘটনা ….. সেই জায়গায় সে বহাল হয়েছে। মা সরাসরি
বললেও চাপা থাকে না যে বাবার চাকরি যখন তুমি নিয়েছ তার দায়িত্ব সমানভাবে পালন করতে হবে। এই দায়িত্ব পালন সে করেছে সাবলীল স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে যতদিন পর্যন্ত তার বোন জয়িতা স্বাবলম্বী না হয়ে উঠেছে। কিন্তু একটা সময়ে সে বিস্মিত ও মর্মাহত হয় যখন জয়িতার বিয়ের জন্য মা প্রাণপণ চেষ্টা করে। তার জন্য কিছু করা তো দুরের কথা, সামান্য সম্মতির শিষ্টাচারটুকু কেউ দেখায়নি। সংসার বড় বিচিত্র, মাঝে মাঝে হিংস্রভাবে স্বার্থপর। নন্দিনী যে রোজগারের টাকা, ভিত্রে মাটি, সেটা আলগা করার মত মুখামি কেউ করে? বু যেদিন মা তাকে জানায় জয়িতার বিয়ে স্থির, সেদিন মুখে কিছু না বললেও দৃষ্টি, চোখের সেই চাহনি বোধহয় অনেক বার্তা পৌঁছে দিয়ে থাকবে। মা মিষ্টি হেসে গাল টিপে বলেছিল, তোর জন্য কোনও ভাবনা নেই। এত গুণ যে পাবে বর্তে যাবে। শুধু ভাই দাঁড়ানো পর্যন্ত অপেক্ষা কর।
