সবাই বড় হবে, দাঁড়াবে। শুধু নন্দিনীর জন্য থাকবে চিরকালীন অপেক্ষা। আর সংসার টানা ….
ভাই একটু বড় হতে নন্দিনী নিজেই মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালাচ্ছে। জয়ন্ত প্রথম যখন তাদের ব্রাঞ্চে আসে তার স্মার্টনেস নন্দিনীকে টানে। চেহারার জৌলুসে মোহাবিষ্ট সে তলিয়ে ভাবেনি বিবাহিত কিনা। যখন বুঝেছে তখনও সরে আসেনি। কেনই বা আসবে? জীবন কি দিয়েছে তাকে? তবু এই সাহচর্য, এই আদানপ্রদান খুব। উপভোগ্য মনে হয়। মাঝে মধ্যে জয়ন্তর সঙ্গে সিনেমা চলে যায়। ইংরিজি সিনেমা বেশি থাকে তালিকায়। অন্ধকার হলে পর্দার সাহসী দৃশ্য হয়তো তাদের মাতিয়ে। তোলে। জয়ন্ত আলিঙ্গনে জড়ায় তাকে। চুম্বনেও আপত্তি করে না নন্দিনী। বরং বেশ উপভোগ করে। এই জীবন কিছুই দেয়নি তাকে ….. পুরুষের স্বাদ এই সহকর্মীই নিয়ে এসেছে তার কাছে, একে কী করে ঠেলে সরিয়ে রাখবে। আজকাল সিনেমা হলে ভিড় হয় না। বেশি দামের সিট ফাঁকা থাকে। সেখানে সিনেমা দেখে বা না দেখে বেশ কিছুক্ষণ অন্তরঙ্গ হবার সুযোগ অনেকে নিচ্ছে তাদের মত।
মুশকিল হচ্ছে বাড়ি ফিরতে দেরি হলে মা মুচকি হেসে বলে, সিনেমা দেখলি বুঝি? তখন এত রাগ আসে সারা শরীর জুড়ে! উত্তর না দিয়ে গটগট করে সরে যায়। এই প্রশ্নের উৎস কোথায় তাও জানে। একবার হল থেকে বেরুচ্ছে জয়ন্তর সঙ্গে, মুখোমুখি পড়ে যায় জয়িতার। সেই বোধহয় রাষ্ট্র করেছে ব্যাপারটা, হয়তো বা রং চড়িয়ে। তাই প্রশ্নবাণে জর্জরিত হতে হয় এই নিঃসঙ্গ একাকি তরুণীকে। কেউ তাকে বোঝার চেষ্টা করে না, কেউ তার ব্যথার কথা জানতে চায় না।
—অ্যাই তোমাকে অফিসে পাওয়া যায় না কেন বল তো?
–কবে আবার পেলে না? জয়ন্ত সতর্ক ভঙ্গীতে বলে।
—এই তো গতকাল। স্কুলে চন্দনাদি মাস্টার ডিগ্রি পাওয়ায় তাড়াতাড়ি ছুটি হয়ে গেল। কী করা যায় ভাবছি মনে এল হ্যান্ডিক্রাফটস ফেয়ারের কথা। তখন ফোন করলাম, যদি এসে যাও তবে একসঙ্গে … তা অফিসে বলে দিল উনি তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গেছেন।
—ওহ্ হ্যাঁ, মনে করার ভঙ্গীতে বলে জয়ন্ত, আসলে হেড অফিসে গেছিলাম মান্থলি রিটার্ন দিতে। বেমালুম মিথ্যেটা মাথায় জোগাতে আত্মবিশ্বাস আসে তার, জানই তো ব্যাঙ্কের চাকরিতে হাজার হ্যাপা। মনে মনে বলে, দারুণ ঝামেলা, সুন্দরী কলিগের সঙ্গে বৈকালিক আল্ডার ঝামেলা।
—তা হ্যাপা পোহাতে কে বলেছে? বদলে নিলে তো হ্যাপি হয়ে যাও।
-ওরেব্বাস এই বয়সে বদলানো? তাছাড়া এই সিকিউরিটি, এই পারকুইজিট কে দেবে বল?
—তাহলে? এত সব পেতে গেলে তো হ্যাপা হয়ই মশাই। জয়ন্ত খুশিতে সুতপার নাক নেড়ে দেয়।
.
ধাতব বিশ্রি শব্দে তন্দ্রা থেকে উঠে বসে সুতপা কয়েক মুহূর্ত সময় লাগে বুঝতে শব্দের উৎস বের করতে। তারপর বোধে আসে কলিং বেল টিপছে কেউ। মর্নিং স্কুল ফিরে একটু গড়িয়ে নেওয়া বরাবরের অভ্যেস। আজ ঘুম হয়েছে গাঢ়। দরজার আই হোলে চোখ রাখে দীর্ঘদেহী, ফর্সা রং পুড়ে তামাটে হয়ে যাওয়া এক পুরুষ। একটু থমকে মনে পড়ে যায় পরিচয়—তমাল সেন। দরজা খোলে। এই সেই তমাল আর একটু হলেই যে সুতপার জীবনে প্রথম পুরুষ হয়ে যাচ্ছিল। একসঙ্গে পড়ত আশুতোষ কলেজে বটানি অনার্স নিয়ে। তমালের লম্বা কাঠামো, রুখুসুখু হাবভাব, চেতানো বুক আর দৃঢ় চিবুকে কেমন এক বন্য আদিমতা ছেয়ে থাকত। সবচেয়ে টানত ওর চোখ দুটো। বড়, ভাসা ভাসা কিন্তু ঠিক ভাবালু নয়, অনেকটা ঝিন্দের বন্দীর ময়ূরবাহনবেশে সৌমিত্রকে মনে পড়ায়। ঝুঁকে ছিল সুতপা। এক্সকারশনে গিয়ে আলাদা হয়ে হারিয়ে ছিল লতাপাতার জঙ্গলে। তমালের দৃঢ়। হাতের বলিষ্ঠ আলিঙ্গনে পিষ্ট হতে হতে ভেবেছিল পৌরুষ বুঝি এরই নাম। তবে ওই পর্যন্ত। কিছুদিন যেতে সুতপা রাশ গুটিয়ে নেয়। তমালের সব কিছু কেমন খাপছাড়া, অসংলগ্ন ….. ওর সঙ্গে হয়তো দামাল হওয়া যায়, কিন্তু নোঙর ফেলা যাওয়া যায় না। বড় নরম মাটি ….. নোঙরের টান এ নেবে না। তার চেয়ে বাবা মায়ের পছন্দকরা জয়ন্ত অনেক নিশ্চিত স্থল ….. ঢেউয়ে, ঝড়ে এ ধোবে কিন্তু মুছবে না, ভাসবে কিন্তু ভাসাবে না
তমাল কিন্তু বেশ স্পোর্টিংলি নিয়েছিল ব্যাপারটা বা নেবার ভান করেছে। এমনকি বিয়েতে পর্যন্ত এসেছিল।
–কি দরজায় দাঁড় করিয়েই রাখবে? ভেতরে যাব না?
—ওহ্ তোমাকে কি ডাকলে তবে আসবে? সুতপা সাড়ে ফিরে সচকিত। একপাশে সরে ভেতরে আসার জায়গা করে দেয়।
বসার ঘরে সিগারেট টানতে টানতে তমাল বলে, এত বড় ফ্ল্যাটে তুমি একা?
–একা কেন? আমরা দুজন আছি।
—কোনও ইস্যু নেই?
–না।
–বাহ্ বেশ আছো–নিরালা বাসা, দুজনে ভালবাসা।
তোমায় খারাপ থাকতে কে বলেছে। দোকা হয়েছ নিশ্চয়।
-না তা আর হতে পারলাম কই? আমার দোকা ….. বাক্যটা শেষ না করে চুপ করে যায় তমাল। সুতপাও এগোয় না ওই পথে। ক্ষণিক বিরতি দিয়ে বলে, বস চা করে আনি।
জলে চা পাতা দেবে কৌটৌ খুলেছে তামাকের তীব্র গন্ধে পাশ ফিরে তমালকে দ্যাখে সুতপা। তমাল উষ্ণ আলিঙ্গনে জড়ায় তাকে। তামাকের ঝাঝালো গন্ধে ঝিমধরা মাদকতা মাখানো ….. সেই বন্য আদিমতা ….. কঠিন নিষ্পেষণ …. হারিয়ে যেতে জলপ্রপাতের গর্জন কানে আসে ….
ঠিক পঁচিশ মিনিটের মাথায় সুতপা বলে, কিছু হবে না তো? হো হো হাসে তমাল, কেন তুমি হওয়ার ভয় পাও নাকি?
