এরমধ্যে আমার ও বনানীর বিয়েতে শর্বরী-অভিজিৎ-বিক্রম তিনজনে জোটবেঁধে নেমন্তন্ন খেয়ে গেছে। আর, শরৎ-সমগ্র উপহার দিয়েছে, একসঙ্গে তিনজনের নাম লিখে। পূর্বরাগ অধ্যায়ে, আমার ও বনানীর সান্ধবিহার বাঁধা ছিল। এখন, আর তার প্রয়োজন বোধ করি না। বনানী স্কুলে পড়াচ্ছে, সেই আগে বাড়ি ফেরে। আমার অফিস ছুটি ছটায়। শনিবার পুরো বন্ধ। কোনও সন্ধ্যাতেই আর যৌথ বিহারের সময় হয় না। শনি রবি আলসেমি আসে। টিভিতে সিনেমা দেখি।
সে শনিবার ছিল ‘শ্যামলী’—উত্তম-কাবেরী। আমরা দুজনেই একাগ্র। উত্তমকুমার তো কানীর প্রাণপ্রতিম এবং দীর্ঘাঙ্গিনী সুঠাম সুডৌল কাবেরীকে আমি বিভিন্ন কোণ থেকে মনে মনে মেপেজুপে নিচ্ছিলাম। উত্তমকুমারের একটি আকর্ষণীয় ফোটো বুকে জড়িয়ে কাবেরী বসু অবিরাম অশ্রুপাত করছে। আমি তখন বিমোহিত হয়ে কাবেরীর মূক অভিনয়ের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করতেই, বনানীর মন্তব্য করে উঠল উত্তম কুমারের অমন অনবদ্য একখানি ছবি বুকে নিয়ে, যে কোনও মেয়েই আবেগে অশ্রুমতি হবে, কষ্ট করে চোখে জল আনার অভিনয় করতে হয় না। দু’জনে হেসে উঠতেই ডোরবেল বাজল।
খুলেই দেখি। ত্রিমূর্তি শর্বরী-অভিজিৎ ও বিক্রম প্রেমের ত্রিকোণমিত্রি এমন চলমান বিজ্ঞাপনে, আমি ও বনানী সসংকোচ হাস্যে সকুণ্ঠ অভ্যর্থনা জানালাম। বনানীর কথা জানি না, আমার তো বিক্রমের ওপরই রাগ হল। এ আবার কেমনতর আত্মত্যাগের পরাকাষ্ঠা। শর্বরীকে ছাড়তেই যদি পারবি না, তবে বিবাহ-বিচ্ছেদের ভড়ং–এর কি দরকার?
বিক্রম ঘরে ঢুকেই টিভি বন্ধ করে দিল। বনানী চটে গেল, উত্তমকুমারকে চোখে হারাতে হল বলে। আমিও কাব্রেীকে হারিয়ে, মনে মনে নিঃশ্বাস ফেললাম। হাসি-গল্প-চা-চানাচুর-রসগোল্লা শেষ হতে, দম্পতিটি অর্থাৎ শর্বরী-অভিজিৎ, শুভরাত্রি জানিয়ে বিদায় নিল। বিক্রম একা হতেই আমি আর বনানী ভয়ানক অস্বস্তিতে পড়ে গেলাম। বনানী পরিস্থিতি খানিক সহনীয় করতে বলে উঠল, বিক্রমদা আজ থেকেই যান। বিন্দুমাত্র আপত্তি না তুলে, বিন্দুমাত্র আপত্তি না তুলে, বিক্রম সংক্ষেপে ‘আচ্ছা’ বলে সিগারেট ধরাল।
বনানী রান্নাঘরে উঠে গেলে, বিক্রমের কাঁধে হাত রেখে জিজ্ঞাসা করলাম, কেমন আছিস?
খুব ভাল, চমৎকার।
শর্বরীর জন্য মন খারাপ হয়?
একেবারেই না, প্রতিদিন তো দেখা হয়।
বিষম খেলাম আমি, প্রতিদিন।
হ্যাঁ, শর্বরী ব্যাঙ্ক থেকে বেরিয়ে বাড়ি তো যায় না। সেই ইউনিভার্সিটির চনমনে দিনগুলোর মতন, আমরা কখনও গঙ্গার ধার, কখনও ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, কখনও একাডেমি অফ ফাইন আর্টস, এইসব করি আর কি! স্তম্ভিত আমার বাক্যস্ফূর্তি হয় না।
পরদিন অভিজিৎ আমার অফিসে এল। চিন্তিতমুখে বলল, বিশেষ পরামর্শ রয়েছে, তোর সময় হবে? নিশ্চয়ই হবে। অভিজিতের এক কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা। মিনিট দশেক কাটল, অভিজিৎ মুখ খোলে না। আমি সদয় হলাম। নিজের থেকে যে কথা বলতে ও দ্বিধান্বিত, আমাকেই তা শুরু করিয়ে দিতে হবে। বলেই ফেললাম ‘শোন অভিজিৎ, বিক্রম যদি আবার শর্বরীকে বিয়ে করতে চায়, সেটুকু মেনে নেওয়ার মতন আধুনিক মন তার নিশ্চয় রয়েছে।‘
‘শুধু আধুনিক নয়, সর্বাধুনিক মন রয়েছে আমার। কিন্তু বিক্রমদা তো শর্বরীকে বিয়ে করবে না। ওর কাছ থেকেই তো আসছি। এখন তো বিক্রমদারই অ্যাডভানটেজিয়স পোজিশন। পুনর্মুষিক হতে চাইছে না। ভাগ্যহীন স্বামীর ভূমিকায় বিক্রমদা আর ফিরে যাবে না।‘ অভিমান ভরা প্রশ্বাস গ্রহণ করে, অভিজিৎ জানাল, ‘বিক্রমদার রোল এখন সার্থক প্রেমিকের’, বুকঠেলা নিঃশ্বাস ফেলে, শেষ বক্তব্য রাখল, শর্বরীর স্বামী অভিজিৎ ‘আমি এখন ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো, অভাজন স্বামী মাত্র।‘
দাম্পত্য – সুব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়
বাচ্চা ছেলেটা ঘুড়িটা ঠিক সামলাতে পারছে না। একটু উঠে লতপত করে নেমে আসছে। বেশ বড় ঘুড়ি। হলুদ গেঞ্জি নীল শর্টস পরা সিনেমার নায়কের মত সুদর্শন একজন বারবার ঘুড়িটা তুলে ধরতাই দিচ্ছে। দু-একবার ফরফর করেই গোত খেয়ে নেমে আসছিল ওটা। ভদ্রলোক তুলে আবার … ওপাশে ফুটবল ক্রিকেট চলছে। ফ্লাইং সসার ছুঁড়ে ধরার চেষ্টা চালাচ্ছে কেউ কেউ। শীতের নরম রোদ মিঠে আমেজ ছড়িয়ে দিচ্ছে। নীল আকাশে খণ্ড খণ্ড মেঘের উদাস ঘোরাফেরা। একপাশে রাখা জেন থেকে হর্ন বাজে আর তা শুনে সচকিত ভদ্রলোক তাড়াহুড়োয় ঘুড়ির কোণ বোধহয় ছিঁড়ে ফেললেন। বাচ্চাটা কান্না জুড়েছে। ওর বাবা, বাবাই মনে হয়, ভোলাবার জন্য বলে, আবার ঘুড়ি কিনে দেব, … আজই।
—ঠিক? ঠকাবে না কিন্তু, প্রমিস?
—প্রমিস। ভদ্রলোক ছেলেকে নিয়ে গাড়ির দিকে এগোল। সেদিকে চেয়ে থাকা জয়ন্তর মুখ ধার থেকে দেখে নন্দিনী বলে, অ্যাই তোমার সাইড প্রোফাইলটা ঠিক শুভেন্দুর মত। চৌরঙ্গী সিনেমায় যেন এমনি …
—আর তোমার মুখটা? জয়ন্ত মুচকি হাসছে।
–না আমারটা মোটেও তেমন সুন্দর নয় যে কারো সঙ্গে মেলানো যাবে।
—মানে তোমারটা ঠিক নন্দিনী রায়ের মত।
একথায় শব্দ করে হাসে দুজনে। নন্দিনী বলে, তুমি ভীষণ চালাক। শেষ মুহূর্তে শেন ওয়ার্নের মত ডেলিভারি বদলে দাও। কী দিয়ে শুরু করে কোথায় যে শেষ কর!
তাহলে তোমাতে শেষ নয় বলছ। আরো কেউ আছে কপালে। কে সে তাকে তো কখনো দেখিনি।
