.
অতএব, যাওয়া হল। শর্বরীর ব্যাঙ্ক থেকে যে নতুন ঝকমকে ফ্ল্যাট ভাড়া করে দিয়েছে, আমরা সেখানেই পৌঁছে গেলাম। হাসি-হুল্লোড়ে সান্ধ্য মজলিস যখন সরগরম এবং নিমন্ত্রিরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্যালি জাহিরে ব্যস্ত, আমি সেই ফাঁকে খুঁটিয়ে শর্বরীকে লক্ষে রাখলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝতে পারলাম, শর্বরী সমস্ত অতিথিদের মধ্যে, অবশ্যই অভিজিতের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিচ্ছে। আমার অনুমান যে নির্ভুল, তা বিদায় মুহূর্তে অভিজিতের উদ্ভাসিত মুখ দেখে সুনিশ্চিত হওয়া গেল। শর্বরীকে আমি মনে মনে কৃতজ্ঞতা জানালাম। শর্বরী, অভিজিৎ সম্পর্কে নির্দয় ও নির্দায় হতে চায়নি। প্রাক্তন প্রীতির মর্যাদা দেওয়ার মতন উৎসুক উদার নরম মন তার রয়েছে।
যাই-ই হোক, শুরু হল দ্বিতীয় অঙ্ক। বিক্রমকে বদলি হয়ে যেতে হল মফঃস্বল কলেজে। শর্বরী ব্যঙ্কের চাকরি ছাড়তে চাইল না। কলেজে ছুটিছাটা প্রচুর। মফঃস্বল কলেজে আবার স্ন্যাক-সেশনে, দুটো অফ ডে। পুজো ও গ্রীষ্মবকাশ বাদ দিলেও, ছাত্র ধর্মঘট, অধ্যক্ষ ঘেরাও, অনির্দিষ্টকালের জন্য কলেজ বন্ধ, পরীক্ষার খাতা ছিঁড়ে-খুঁড়ে ছাত্রছাত্রীদের হল ছেড়ে বেরিয়ে আসা, ভাতা বৃদ্ধির দাবিতে নন-টিচিং স্টাফের হরতাল ইত্যাদি অনুষঙ্গের কারণে, কলেজে ক্লাস নেওয়ার হাত থেকে প্রায়ই অব্যাহতি মেলে। তাই কর্মস্থলে স্টাফমেসে থাকলেও, সেখান থেকে কলকাতা যাতায়াত, বিক্রমের পক্ষে এমন কিছু অনিয়মিত ব্যাপার ছিল না। তবে, শর্বরীকে সঙ্গদান করতে, বিক্রমের আগ্রহের অভাব ঘটেছিল কিনা, তা জানবার সুযোগ আমার না হলেও, এটুকু কানে এল যে, বিক্রমের অনুপস্থিতির দিনগুলো শর্বরীকে নিঃসঙ্গ বোধ করতে হয় না। কারণ অভিজিৎ তখন শর্বরীকে নিয়মিত সঙ্গদান করে।
মফঃস্বলে বদলি হওয়ার পর, বিক্রমের সঙ্গে আমার দেখা হওয়ার অবকাশ মেলেনি। অভিজিৎও, শর্বরীকে নিয়ে বিশেষ ব্যস্ত থাকায়, আমাকে স্মরণ করেনি। আমি নিজেও তখন বনানীকে খোলাখুলি প্রেম নিবেদনে কৃতকার্য হতে পারিনি। ‘বলি বলি করি-বলিতে না-পারি’ এই ধরনের মানসিক দ্বন্দ্বে হাবুডুবু খাচ্ছি। ভদ্রসম্মত চাকরি একটা জুটলেও, সেটি ছিল সম্পূর্ণ অস্থায়ী। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের মাঠে, বনানীর মুখোমুখি বসে চীনেবাদামের খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে রোজই মনে মনে প্রস্তুতি নিচ্ছি, ঝপ করে বলেই ফেলি, ঘর বাঁধলে কেমন হয়? কিন্তু হিম্মতে কুলোচ্ছে না। কয়েক মাস কেটেই গেল, বিক্রম, শর্বরী অভিজিৎ কারো খবর পাই না।
আচমকা এক সন্ধ্যায় বিক্রম ‘জরুরি কথা আছে’ইও বলে, বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে গেল। দুজনে পাশাপাশি হেঁটে চলেছি, বিক্রম বলছে না কিছুই। আমিও তাড়া মারছি। একটা ট্যাক্সি ডেকে ওঠাল। আমরা আকাশবাণী ভবন ছাড়িয়ে, খানিক এগিয়ে, ট্যাক্সি ছেড়ে দিলাম। কিছুক্ষণ পদচারণা পর, গঙ্গার ধারে বসা গেল। সিগারেটের পর সিগারেট ধ্বংস করে, পরোক্ষে আমাকে দূষিত বিষিত করে, মিনিট পাঁচেক অস্ফুট বাক্যালাপের প্রয়াসের পর, মিনিট দুয়েক বিরতি। অবশেষে, নিষ্কম্প সুস্পষ্ট অথচ অনুচ্চস্বরে, বিক্রম ঘোষণা করল, শর্বরীর অনুমতিক্রমে সে ডিভোর্স চায়।
আমি কী বলব, বা আদৌ কিছু বলা উচিত হবে কি না, বুঝে উঠতেই পারলাম। এরপর সে প্রেম ও বিবাহ সম্পর্কিত একটি সারগর্ভ নাতিদীর্ঘ ভাষণ সমাপনান্তে, যে উপসংহারে উপনীত হল, তা হল এইরকম : শর্বরীকে সে ভালবাসে। কিন্তু বর্তমানে শর্বরী, বিক্রমের মধ্যে ভালবাসা বা সুখ খুঁজে পাচ্ছে না। তখন, যার চোখের চাওয়ার শর্বরীর মনে দোলা লাগে, সে হল অভিজিৎ। শর্বরীর হৃদয়ের নিভৃতিতে বর্তমানে যে ঠাই নিয়েছে, সে হল অভিজিৎ।
বিক্রম মনে করেছিল, তার জীবনের প্রতিটি দিন শর্বরীর নিচ্ছিদ্র ভালবাসায় উদ্বেল হয়ে উঠবে। প্রতিটি রাত্রি মধুর হতে মধুরতর হবে শর্বরীর সুখ-সান্নিধ্যে। প্রতিটি আকাক্ষিত মুহূর্ত উপভোগ্য হয়ে উঠবে, দ্বৈত কামনায়। প্রতিটি দুঃখের ক্ষণ গরীয়ান হয়ে উঠবে, মিলিত অপাতে। বিক্রমের এবম্বিধ প্রেম-পরিণয়-পরিক্রমার রাবীন্দ্রিক বৃিত্রি পর, আমার বক্তব্য বাহুল্যই ছিল, তবু, একেবারে নীরব থাকলে, বিক্রম মনে করতে পারে, আমার উদাসীন এবং তার সমস্যায় অংশ নিতে অনাগ্রাহী।
তাই প্রকৃত শুভানুধ্যায়ী হিসাবে প্রশ্ন রাখলাম, শর্বরীর সঙ্গে কথা বলব? কখনই নয়, সার্টেনলি নট।
পরিবার-পরিকল্পনার যুগে, সন্তান-সন্ততির ঝুট-থামেলা না থাকায়, বিবাহবিচ্ছেদে কোনওরকম অবাঞ্ছিত পরিস্থিতির উদ্ভব হল না। অতএব বছর দেড়েকের মাথায়, আইনের পথ অনুসরণ করে, উভয়ের সম্মতি ও সমর্থনে বিক্রমের বিদায় পর্ব মসৃণ ও সরলপথে সঙঘটিত হল। রঙ্গমঞে অভিজিতের প্রবেশ পূর্বক শর্বরীর দ্বিতীয় বিবাহ অনুষ্ঠিত হল রেজিস্ট্রি অফিসে।
এখন, বিক্রম তার কর্মস্থলে। শর্বরী-বিক্রমের পুরান ফ্ল্যাটে, নতুন সংসার পাতল অভিজিৎ। আমরা ক’জন ঘনিষ্ঠ বন্ধু বান্ধব সাধারণ বুদ্ধিতে ধরেই নিয়েছিলাম পিতৃমাতৃহীন বাধাবন্ধ হারা বিক্রম বুঝি বা আর কলকাতামুখো হবে না। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটল না। সুখী ও জয়ী অভিজিৎ মহান ঔদার্যে বিক্রমকে সপ্তাহান্তিক অবকাশযাপনের সাদর আমন্ত্রণ জানিয়ে রাখল। এবং বিষম বিস্ময়ের বিষয়, বিক্রম আমন্ত্রণ রক্ষা করতে কুণ্ঠিত হল না। আমরাও সকৌতুক সিদ্ধান্তে এলাম, বেতাল পঞ্চবিংশতি কাহিনী অনুসরণে, বিক্রম ও অভিজিতের মধ্যে কে মহত্তর তারই মহড়া চলছে।
