পরদিন সকালে বাহু বেড়ে তাকে ধরল প্রিতম্। আদর করল। বলল, বড্ড একা একা লেগেছে তোমার! ঠিক হয়েছে, শ্রীলা আর তনুজা শিলিগুঁড়িতেই থাকবে।
সুজাতার সব অভিমান জল হয়ে গলে গেল যেন।
গান হচ্ছিল—ঘুচায়ে লাজ ফুটাও তারে নবীন উষাপানে, জুড়ায়ে তারে আঁধার সুধাজলে।
একদিন দুপুরে একা ছিল সুজাতা। কে যেন তার নাম ধরে ডাকল?
উঠে এলো গায়ে আঁচল জড়াতে জড়াতে একি! সুদর্শন! পাগল চেহারা। এলোমলো চুলদাড়ি। ময়লা ধুতি-পাঞ্জাবি। পায়ে নোংরা স্যান্ডেল।
সুদর্শন, তুমি এখানে?
তোমার হাজবেন্ড কিন্তু খুব ভাল লোক হয়েছে। তুমি আমাকে কিছু খেতে দেবে? দু-তিন দিন বোধহয় খাইনি।
মেঝেতেই বসল সুদর্শন। তাকে কাজের মেয়েটিকে ডেকে খেতে দিতে না বলে নিজেই খাওয়াল। মাছ-ভাত-ডাল-ডিম-দই-সন্দেশ।
তোমার স্বামীকে বলবে আমাকে একটা চাকরি দিতে?
এখানে তো টেকনিক্যাল কাজ। তাছাড়া তোমার সঙ্গে পরিচয় নেই। তোমার কয়েকটি চিঠি রেখেছিলাম–প্রিতম্ পড়েছে। বলেছিল, ভদ্রলোক ভাল আধুনিক কবিতা লিখতে পারেন। অসম্ভব ভাষায় কারিকুরি আর তীক্ষ্ণতা।
হাত-মুখ ধোবার পর ঝোলা থেকে চটি মততা পাঁচ ফর্মার একটি সদ্য প্রকাশিত কবিতার বই দিল। সৃষ্টি প্রকাশনীর ছাপা। উৎসর্গ : সুজাতা তোমাকে—
এসব কবিতা সুজাতা কতবারই না শুনেছে।
দাম্পত্য কলহ যেন আষারে আকাশ
রোদ ঝলমল এই তো এখন
আবার ঝরঝর বৃষ্টি ঝরে যায়…
তোমাকে হারালে আমি ভিখারিণী—
.
আবৃত্তি করে শোনাচ্ছিল সুদর্শন তার নোংরা পোষাকেই মেঝেয় বসে বিছানায় মাথা রেখে।
হঠাৎ বাসায় এলো প্রিতম্।
দেখ কে এসেছে–নাম বলো? সুজাতা বলল।
তোমার বর্ণনায় সুদর্শন। নমস্কার। উঠে চেয়ারে বসুন।
সুজাতা বইটা দিল প্রিতমকে।
আমার নামটা লিখে দিন। বলল প্রিতম।
সুদর্শনকে নিয়ে সারা বিকেল কাটল ভাল ধুতি পাঞ্জাবি পরাল নিজের। নদীর রে বেড়াতে নিয়ে গেল। কাজের কথা বলতে প্রিতম বলল, কি কাজ দোব? আচ্ছা, দেখছি।
সন্ধ্যায় যাবার সময় এক হাজার টাকা সুদর্শনের পকেটে গুঁজে দিয়ে দিল প্রিতম। বলল, আমাদের সন্তান আসবে— যদি পুত্র হয়, কি নাম রাখব বলে যান।
সুদর্শন! বলে হেসে পাগলের মতো চুল-দাড়ি ধুতি পাঞ্জাবি উড়িয়ে নদীর তীরের দিকে আধো অন্ধকারে চলে গেল সুদর্শন।
প্রিতম-সুজাতা পাশাপাশি শুয়ে রাতের বিছানায়। ঘুম নেই। কথা নেই। মাথায় কপালে হাত দেয় প্রিতম। চোখে জল কেন সুজাতার। পুত্রের নাম রাখবে সুদর্শন?
দাম্পত্য – অনিশা দত্ত
ত্রিকোণ প্রেম অথবা প্রেমের ত্রিভুজ গড়ে ওঠা প্রায়শই ঘটে যাওয়া, নিতান্তই স্বাভাবিক ঘটনা। তাই আমরা, মানে আমি, প্রদীপ্ত, সুষমা, রাধাপ্রসাদ, বনানী সকলেই বিক্রম, অভিজিৎ ও শর্বরীর একত্রিত প্রীতি-মধুর ঘনিষ্ঠতায় বিস্মিত বা উদ্বিগ্ন ছিলাম না। ইউনিভার্সিটির দিনগুলোতে, কোনও সমস্যার উদ্রেকও হয়নি। বিক্রম একবছরের সিনিয়র, শর্বরী ও অভিজিৎ আমাদের সহপাঠী। বিক্রম ও আমি আবার একই পাড়ায় থাকি, সেই সূত্রে বাল্যবন্ধু। তাই বিক্রমের সঙ্গে আমার একটা সহজ সখ্যতার সম্পর্ক ছিল। আবার, দীর্ঘ পাঁচ বছর, একই বেঞ্চে পাশাপাশি বসে, অভিজিতের সঙ্গেও আমার গভীর বন্ধুত্ব ছিল। উভয়েই তাদের শর্বরী সংক্রান্ত মনোভাবনা নির্দ্বিধায় আমার কাছে খোলাখুলি ব্যক্ত করত। প্রেমের লুকোচুরি খেলার আবেগঘন প্রেক্ষাপটে, যে সমস্ত ভাল লাগার ফুল ঝুরঝুরিয়ে ঝরে বিক্রম ও অভিজিতের মনের জমি ভরিয়ে তুলেছিল, সে সমস্ত ফুলের সৌন্দর্য ও সুবাস তাদের উভয়ের মাধ্যমে আমারও সুপরিচিত ছিল।
বিক্রম আমাদের এক বছর আগেই পাশ করে বেরোল, ফার্স্ট ক্লাস নিয়ে। ভাল রেজাল্টের জন্যই তোক বা তদ্বিরের খাতিরেই হোক অথবা ভাগ্যের দাক্ষিণ্যেই হোক, সরকারি মহাবিদ্যলয়ের এক অধ্যাপকের পদ অলঙ্কৃত করে ফেলল। অভিজিতের পাশ করে বেরোবার আগেই। তখন আমি শুধু বিক্ৰমরে বন্ধু নই, তার ব্যক্তিগত উপদেষ্টাও বটে। তাই, বিক্রম যখন আমাকে জিজ্ঞেস করল, দেখ তিমির, শর্বরীকে কি এখন বিয়ের কথা বলব? তুই কী বলিস?
ভেবে-চিন্তে, সুপরামর্শই দিলাম, আঘাত তো একজনকে পেতেই হবে। শর্বরীকে প্রস্তাবনা দিতে, এই-ই প্রশস্ত সময়। অভিজিৎ তখনও ছাত্র। বিক্রম যদি ধৈর্য ধরে বসে থাকে, কবে শর্বরী তার দিকে নিশ্চিতভাবে হেলবে, তবে ভুল করবে। শর্বরী, বিক্রম ও অভিজিৎকে দুপাশে নিয়ে, সোজা পথে হেঁটে চলেছে। যে আগে হাত ধরে কাছে টানবে, জিত তারই। বিক্রম এখন প্রতিষ্ঠিত ও পরিচয়যোগ্য ব্যক্তি। বেচারি অভিজিৎ। এখন সহজেই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হেরে যাবে। কিন্তু অভিজিৎ নিজের। পায়ে দাঁড়িয়ে গেলে, পরিস্থিতি কী হবে বলা মুস্কিল।
বিক্রম ও শর্বরীর মধ্যে পারস্পরিক কি ধরনের বাক্য বিনিময় হয়েছিল, ট্রফি জিতে যাওয়ার পর, বিক্রম তা আর আমাকে জানায়নি। আমাদের ফাইনাল পরীক্ষার পরপরই আমরা সকলে অভিজিৎ শুদ্ধ বিক্রম শর্বরীর বিয়েতে নেমন্তন্ন খেয়ে এলাম।
পরবর্তী এক বছরের ইতিহাসে, বিক্রমের সঙ্গে আমার বন্ধুত্বের ভাঁটা পড়ল, জোয়ারে ভেসে এল অভিজিৎ কারণ অভিজিৎ তখন উত্তীয়ের ভূমিকায়, ব্যর্থ প্রেমিক। এবং বিজয়ী বিক্রম বীর বিক্রমে পার্শ্ববর্তিনী শর্বরী সমভিব্যাহারে সারা কলকাতা বিনোদবিহার করে বেড়াচ্ছে। আমার সঙ্গে দেখা করার ফুরসৎ মিলছে না তার। বিক্রমের অবস্থা যেন গগনবিহারী পক্ষীরাজ। বন্ধুদের কথা সে সম্পূর্ণ বিস্মৃত। আমি তখন ক্রমে ক্রমে অভিজিতের ব্যক্তিগত পরামর্শদাতা হয়ে উঠছি। প্রথমদিকে অভিজিৎকে সান্ত্বনা দিয়ে, শর্বরীর কথা ভুলে যেতে পরামর্শ দিতাম। কিন্তু তাতে দেখি, বেচারা বেশি মনমরা হয়ে পড়ছে। বরং শর্বরীর সঙ্গে তার প্রাক্ মেলামেশার ইতিহাসে, সে আমার সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করে আনন্দ পায়। ইতিমধ্যে শর্বরী তার বিবাহবৎসর পূর্তি উপলক্ষে প্রাক্তন ঘনিষ্ঠ সহপাঠীদের নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানালে অভিজিৎ আমার কাছে উপদেশ নিতে এল, তার পক্ষে শর্বরীর বাড়ি যাওয়াটা শাভঙ্গ হবে, না কি না যাওয়াটা দৃষ্টিকটু হবে? আমার মনে হল, নিমন্ত্রণ রক্ষা করাই স্বাভাবিক ও সঙ্গত। বললাম, শর্বরীর সঙ্গে তুই পুরনো বন্ধুর মত সহজ হয়ে যা।
