শেষ যেদিন ডেভিড এসেছিল, সেদিন অবশ্য বেশ গোলমাল হয়েছিল। ডেভিডকে বাড়িতে পৌঁছা’তে যেতে হয়েছিল, সেটাও রাত দেড়টা নাগাদ প্রায় চ্যাংদোলা করে। সেদিনও অভ্যর্থনা মোটেই সুখের হয়নি। ঘরে ঢোকা মাত্র ডেভিডকে এক ঝাঁপটায় মেঝেতে চিৎ করে ফেলে জারিনা বিবি জানলার সামনে এসে দাঁড়ায়। সেখান থেকে পর পর চিনেমাটির পেয়ালা ছোড়ে। অব্যর্থ লক্ষ্য তার, প্রথম দুটি অনন্ত এবং অমরের কপালে লাগে, অবস্থা বুঝে বাকি দু’জন দৌড় দেয়। কিন্তু রক্ষা পায় না। অনাদির ঘাড়ে এবং অসীমের পিঠে লাগে। সবাই অল্পবিস্তর আহত হয়, অমরের কপাল কেটে যায়, নীলরতনে গিয়ে দুটো সেলাই দিতে হয়েছিল।
***
নামব্রত সঙেঘর ঠেকে বসে সবাই খুব চিন্তান্বিত। ক্যালেন্ডার দেখে হিসেব কষে বেরোলো আজ পঞ্চাশদিন ডেভিডের দেখা নেই।
এদিকে বার্ষিক উৎসবের সময় সমাগত। আর দেরি করা যায় না।
মদ্যপানে মানুষের মনে এক ধরনের অলীক সাহস সঞ্চয় হয়। রাত দশটার সময় হাবিলদার বাড়ির দোকান বন্ধ হলে রাস্তায় বেরিয়ে কিছুক্ষণ জটলা করে সবাই সঙঘবদ্ধ হয়ে ঠিক করল, ঐ দজ্জাল জারিনা বিবিকে ভয় পেলে চলবে না, আমাদের বৌয়েরাই বা ওর চেয়ে কম কিসে, ডেভিডের বাড়িতে আজ যেতেই হবে, ডেভিডকে ছাড়া তো আর নগর সঙ্কীর্তন হবে না।
কিন্তু ডেভিড কোথায়? এক মাস আগে ডেভিড মারা গেছে।
ঐ রকম লম্বাচওড়া, যুবক মানুষ। সকালবেলা বাজারে গিয়ে বাজার থেকে ফিরে থলে নামিয়ে বৌয়ের কাছে এক গেলাস জল চাইলো। জল আর খাওয়া হয়নি। সামনে বিছানার ওপরে লুটিয়ে পড়ে। আঘঘণ্টা পরে হাসপাতাল বলে হার্ট ফেল।
এ খবর তো আর অনাদি-অনন্তদের কাছে পৌঁছায়নি। মাতালদের আড্ডায় এরকম হয়। একেক জন একেক প্রান্ত থেকে আসে। তার মধ্যে কেউ একদিন হঠাৎ বরবাদ হয়ে গেলে সে খবর আড্ডায় অন্যদের কাছে এসে পৌঁছায় না।
আজ বলতে গেলে একটু সকাল-সকালই এসেছ এরা। রাত এগারোটা। পাড়ার অনেক বাড়িতেই আলো জ্বলছে। লোকজন দাওয়ায়, ফুটপাথে দাঁড়িয়ে আছে। এমন সময় চারমূর্তি গলির মধ্যে প্রবেশ করল।
এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক সামনের বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে নৈশাহার শেষে রাস্তার কুকুরদের রুটি দিচ্ছিলেন। তিনি এদের দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনারা কোথা থেকে এসেছেন? কাকে চান?
অনাদি বলল, আমরা ডেভিডের বন্ধু।
অনন্ত বলল, আমরা ঐ সামনের বাড়ির ডেভিডের কাছে এসেছি।
প্রৌঢ় ভদ্রলোক অবাক হয়ে বললেন, আপনারা কিরকম বন্ধু? জানেন না একমাস হল ডেভিড মারা গেছে।
এই সংবাদে হতভম্ব হয়ে অনাদি-অনপ্পো পিছু হটছিল। তাদের মনের মধ্যে দুটো জিনিস কাজ করছিল। একটা হল বন্ধুর মৃত্যুর জন্য শোক এবং অন্যটা হল জারিনা বিবির আক্রমণের মুখোমুখি হওয়ার থেকে নিষ্কৃতি জনিত স্বস্তি।
কিন্তু ইতিমধ্যে নিজের ঘরের জানালা দিয়ে এদের দেখে স্বয়ং জারিনা বিবি রাস্তায় নেমে এসেছে। এরা জারিনাকে দেখে দৌড় দিতে যাচ্ছিল। কিন্তু রাস্তার নেড়ি কুকুরগুলো এদের পর্যবেক্ষণে রেখেছিল এবং দৌড় দিলেই তাড়া করবে। বুঝতে পেরে, দ্রুত পা চালিয়ে পালাতে গেল।
এদের ভাবগতিক দেখে জারিনা দ্রুতপদে এগিয়ে এলো, যাবেন না। আপনারা যাবেন না। আপনাদের কাছে আমার দরকার আছে।
কিছুই বুঝতে না পেরে অনাদি-অনন্তরা দাঁড়িয়ে গেল। তবে খুব ভয় পাওয়ার কিছু আছে বলে মনে হচ্ছে না। জারিনা বিবির চোখেমুখে চেহারায় রাগের ভাব দেখা যাচ্ছে না।
জারিনা এদের ডেকে নিয়ে তার ঘরে বসাল। একপাশে একটা বড় খাট, তার ওপরে এক পাশে দুই পিতৃহীন নাবালক ঘুমোচ্ছে। এ পাশটায় জারিনা শোয়। সেখানে দু’জনে বসল। আর দু’জন দুটো চেয়ারে বসল, চেয়ার দুটো এবং খাটের মাঝখানে একটা ছোট গোল টেবিল।
জারিনা বলল, আপনারা একটু বসুন। আমি কতদিন ধরে আপনাদের কথা ভাবছি। এই বলে সে টেবিলের দেরাজ থেকে একটা চাবি বার করে ঘরের এক পাশের সাবেকি দিনের বড় কাঠের আলমারিটা খুলল।
অনাদি ফিসফিস করে অনন্তকে বলল, পিস্তল-টিস্তল বার করছে বোধহয়। অন্য দু’জনও মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগল।
কিন্তু পিস্তল-টিস্তল নয়। জারিনার হাতে একটা বোতল দুনম্বর বাংলা মদ। মৃত্যুর দিন বাজার করার পথে কিনে এনেছিল ডেভিড। যখন ঠেকে যেতো না, বাজার থেকে আসার সময় একেক দিন এইরকম কিনে আনতো।
বোতলটা অটুট রয়ে গেছে। জারিনা এসে বোতলটা টেবিলের ওপর রাখল। তারপরে পাশের রান্নাঘরে গিয়ে গোটা দুয়েক গেলাস আর তিনটে কাপ নিয়ে এল।
চারজনের জন্যে পাঁচটা পাত্র। অনাদি ধরে নিল জারিনাও খাবে। বোতলের ছিপিটা খুলতে খুলতে অনাদি মনে মনে বলল, সাবাস জারিনা।
বোতলটা ভোলা হয়ে যেতেই জারিনা সেটা নিজের হাতে নিয়ে চারটে পাত্রে সমান করে ভাগ করে দিল। আর পঞ্চম পাত্রে খুব কম ঢালল।
ভদ্রতা করে অনন্ত বলল, আপনি নিজে এত কম নিলেন?
জারিনা বলল, এটা আমার নয় ডেভিডের।
চারপাত্র নিঃশেষ করে চার বন্ধু উঠে পড়ল। দরজা দিয়ে বেরোনোর সময় পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখল ডেভিডের পাত্রের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে জারিনা তাকিয়ে রয়েছে। তার চোখে জল।
টেককা টেককি – কণা বসুমিত্র
ঠাণ্ডায় জবুথবু হয়ে চাদরটা গায়ে জড়িয়ে বসেছিল তিলক। ওর চোখের সামনে দিয়ে সকাল ফুরিয়ে যাচ্ছে। রোববার অথচ বেরোতে পারেনি। এই রোববারের সকালটাই সব থেকে দামি মনে হয় তিলকের কাছে। অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে। সামনের রাস্তাটায় রীতিমতো জল দাঁড়িয়ে গেছে। আকাশ এখন মেঘলা। তিলক শীতকাতুরে হলেও শীত ভালবাসে। গরম মোটেই সহ্য হয় না ওর। লোডশেডিংয়ের দাপটে প্রায়ই ও সদিগর্মিতে ভোগে। অসহ্য গরমের পর সবে বর্ষা নেমেছে। সেই সঙ্গে ঝোড়ো বাতাস। তিলক বারান্দায় বসে হি হি করে কাঁপতে কাঁপতে বাগানের আমগাছের ডালে কাকের বাসা দেখছে। কদিন ধরে ঠোঁটে করে খড়কুটো এনে কাকটা দিব্যি বাসা বানিয়েছে। তারপর ডিম পেড়েছে। এখন যত্ন করে সেই ডিমে তা দিচ্ছে। ঝড়ের বেগে সব ডালপালা তখন ওলোট পালোট খাচ্ছে, কাকটা অসহায় ভীত চোখে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। তিলক ভাবে, কাকটাকে যদি ও সাহায্য করতে পারত।
