ওদিকে তিলকের বউ রান্নাঘর থেকে তখন হাঁক পাড়ছে, কি গো বাজার টাজার যাবে না?
তিলকও চেঁচায়, এই জল কাদায় যাই আর কি? খিচুড়ি আলু-পেঁয়াজ ভাজা আর ডিমভাজা করে দাও। ফার্স্ট ক্লাস। আজ তো খিচুড়ি খাবার দিন।
তিলক একেই কুঁড়ে। বাজারে যেতে চায় না। তারপর আবার বৃষ্টি হওয়ায় পোয়া বারো। কিন্তু বৌয়ের হাত থেকে কি আর রেহাই আছে? তেড়ে আর এক চোট বৃষ্টি নামে। তিলক মনে মনে খুশি হয়ে একটা সিগারেট ধরায়।
তিলকের বৌয়ের গলা শোনা যায় রান্নাঘরে। তিরিক্ষি মেজাজে কী নিয়ে যেন ঝিয়ের সঙ্গে চঁচামেচি করছে। তিলক জানে, আসল ঝালটা তিলকের ওপরেই ঝাড়ছে। ঝি উপলক্ষ্য মাত্র। তু তিলক নট নড়ন চড়ন।
ওর চোখের সামনে উঠোনের ওই প্যাঁচপেচে কাদা। আমের ডালটা যদি ভেঙে ওর মাথায় পড়ে?
তিলক মরলে বৌ বড়োলোক। কথাটা ভেবেই চাপা রাগে দাঁত কিড়মিড় করে তিলক। তিলকের বৌ কাপড়ে হলুদ মুছতে মুছতে ওর সামনে এসে দাঁড়ায়। হাত নেড়ে বাজখাঁই গলায় বলে, শুধু চালে ডালে চড়িয়ে দিলেই হবে? নুন আনবে না? পেঁয়াজ আদা লঙ্কা? ডিমভাজা, আলু ভাজার ফরমাশও তো আছে?
তিলকের মাথায় ধাঁই করে বেজে ওঠে পেঁয়াজ শব্দটা। তিলক ব্যঙ্গ মেশানো। গলায় বলে, আমাদের বাড়ি বাপু পেঁয়াজ টেয়াজ চলত না। পেঁয়াজ, মুরগি, এসব শব্দগুনো তুমি আসার পরই আমদানি…। তিলকের বৌ তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠে।
–কী কী বললে? আমি এসে? আমি এসে তোমার জিভের স্বাদ বাড়িয়েছি। বল? জানতে কিছু? পেঁয়াজ ছাড়া কি মশুর ডালের পাতলা খিচুড়ি হয়? পেঁয়াজ টমেটো..? এতদিন তো শুধু খেয়েছ তোমরা মুগডালের খিচুড়ি।
তিলক হেসে বলে, মুগডালের খিচুড়িতে কেমন পুজো পুজো ভাব বল তো?
–কী, কী বললে?
তিলক বিড়বিড় করে বলে, ড্যামভ্যান উইল।
–কী বললে?—এবার তিলকের বৌয়ের গলার স্বর আরও চড়া। তিলক কথা ঘুরিয়ে মুচকি হাসে। বলে, বলছিলাম ভোগের খিচুড়িই হোক না আজ।
তিলকের বৌ চোখ বড়ো বড়ো করে বলে, বললেই হল? কোথায় তোমার গরম মশলা ঘি নারকেল,পেস্তা বাদাম কিশমিশ?
তিলক বৌয়ের ফর্দ শুনে আঁতকে ওঠে।–এসব তোমার স্টকে নেই?
–কী করে থাকবে? বাজার যাও কদিন?
—তুমিও তো যেতে পার। তুমি তো বাপু পর্দানসীন যুগের বালিকা বধুটি নও?
–নই। কিন্তু কেন যাব? তুমি রান্নাঘরের হেঁসেলটি ধরবে? আজকাল তো ফিফটি ফিফটির যুগ, তাই না? দুজনেই দুজনের কাজ সমান ভাবে ভাগ করে নেব।
—বেশ, তুমি তবে অফিস যাও?
–অফিস তো যেতুম। চাকরিটা ছাড়িয়ে দিলে কেন? হেঁসেলটা ধরার জন্যে নয়?
—যে রাঁধে, সে চুলও বাঁধে।
–এখন একথা বলছ, কিন্তু সেদিন? আমি তো তাই চেয়েছিলুম?
কথা চলে যাচ্ছে অন্যদিকে। অশান্তির ঝড় উঠবে। তিলক চট করে বলে বসে, বৌ ট্রামে, বাসে, ঠেলাঠেলি তোণ্ডতি খেয়ে চাকরি করতে যাবে, আর আমি তাই বসে বসে দেখব?
—ওসব ছাড়ো, ঢের হয়েছে আদিখ্যেতা। এবার ভোগের খিচুড়ি না কী বলছিলে, তাই বল?
তিলক বলে, কী বলব? ঘরে কি মুগডাল, গোবিন্দভোগ নেই? নারকেল, কাজুর দরকার কী? আমার মাও তো খিচুড়ি করতেন!
তিলকের বৌ বলে, কী বললে। তোমার মা ঘি গরমমশলা পেস্তা ছাড়া ভোগের খিচুড়ি করতেন কী করে? ভোগের খিচুড়ি বলতে আমরা তাই বুঝি গো। তোমাদের বাড়ির সঙ্গে আমাদের বাড়ির ঘরানার এটাই ফারাক। আমি বনেদি বাড়ির মেয়ে বুঝলে? কথাগুলো বলেই তিলকের বৌ ব্যঙ্গের হাসি হাসে।
বৌয়ের কাছে হেরে গিয়ে তিলক মনে মনে লজ্জা পায়। কারণ, তিলক জানে, ওর বাপের বাড়ির গল্পের এখানেই শেষ নয়। তিলক তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, হ্যাঁ, হ্যাঁ, ভোগের খিচুড়ি আমার মাও অমনি করে করতেন। তবে এখানে মানুষের ভোগের প্রশ্ন উঠছে কিনা।
তিলকের বৌ ভেঙে পড়া এলোখোঁপা ঠিক করতে করতে বলে, দেবতার ভোগ শেষ পর্যন্ত কাদের পেটে যায় মানুষছাড়া?
তিলক বলে, আহা! থামবে? এই বৃষ্টির মধ্যে দোকানপাট কি তেমন খুলেছে। বল? তুমি বরং সস্তার খিচুড়ি টিচুড়ি কিছু একটা করে দাও।
তিলকের বৌ ফের জ্বলে ওঠে। বলে না, সস্তা নয়। সস্তার খিচুড়ি আমি জানি না। আমি তো সস্তা বাড়ির মেয়ে নই? জানব কী করে?
–মুশকিল! জানা উচিত ছিল। দ্যাখো দেখি, এই দুর্দিনের বাজারে…।
তিলকের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে ওর বৌ বলে, তোমার মায়ের তাহলে মেয়ে দেখতে যাবার সময় বলা উচিত ছিল, তুমি সস্তার রান্না কী শিখেছ মা? তা না বলে, উনি তো আমায় পোলাও, কালিয়া, চিংড়ির মালাইকারির রেসিপি জিজ্ঞেস করেছিলেন? ছেলের ক্ষমতার কথাটা ভেবে সস্তার রান্নার রেসিপি জিজ্ঞেস করলেই পারতেন?
বৌয়ের কাছে মুখ ঝামটা খেয়ে তিলক চুপ করে যায়। এমন সুন্দর বর্ষার সকাল! কোথায় রসের কথা বলবে তা নয়। কী ঠিকুজি মিলিয়েই না মা বিয়ে দিলেন আহা! কিন্তু সেই বা কম যাবে? তিলক বলে, ওসব রান্নার রেসিপি জিজ্ঞেস করলেই তুমি পারতে? এমন একটা ভাব দেখাচ্ছ যেন কোনো হাই ফাই ঘর থেকে আসছ তুমি।
তিলকের বৌ বলে, তাহলে কী আর তোমার সঙ্গে আমার বিয়ে হত?
–সক্কালবেলা তুমি কি থামবে? তিলকের বৌ বলে, তুমি যত জোরে চ্যাঁচাবে, আমিও ততজোরে চ্যাঁচাব। তিলক বলল, তা আর চ্যাঁচাবে না? জ্যোতিষীকে দিয়ে ফলস্ কুষ্ঠি করে তো তোমার মা বিয়ে দিয়েছিলেন।
