একই নিয়মে কয়েকদিন মদ খাওয়া ছেড়ে দেওয়ার পরে হঠাৎ করে ডেভিড আবার নামচক্রে চলে আসে। অধিকতর উদ্যমের সঙ্গে মদ্যপান, হৈচৈ শুরু করে। হাবিলদার বাড়ির ঠেক বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরেও সে বাড়ি যেতে চায় না। আরো খাবে, আরো আরো খাবে।
এইরকম সময়ে বন্ধুরা অনেকেই তাকে বুঝে কিংবা না বুঝে তাল দেয় কিন্তু তারা সবাই ডেভিডের সঙ্গে যুঝে উঠতে পারে না। রাস্তায় বেরিয়ে করতালি সহযোগে নামগানের সঙ্গে ডেভিড যখন ‘হেলিয়া দুলিয়া’ নাচে, তারা তাল রাখতে গিয়ে রাস্তায় মুখ থুবড়ে পড়ে যায়।
রাত বাড়ে। দায় বাড়ে নামচক্র সঙেঘর ঠাণ্ডামাথা সদস্যদের। তারা এভাবে ডেভিডকে রাস্তায় ফেলে যেতে পারে না।
***
এককালে কলকাতার ট্রাফিক পুলিশে মাতাল স্কোয়ার্ড ছিল। এক অ্যাংলো সার্জেন্ট সাহেব লাল মোটর সাইকেলে রাত সাড়ে দশটার পর রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতেন। কোথায় কোন্ মাতাল বাড়ি ফেরেনি, তাকে বাড়ি পাঠানোই তাঁর ডিউটি। সেই সার্জেন্ট সাহেব কলকাতার পানশালার একটি অনবদ্য গল্প অমর হয়ে আছে।
(গল্পটা অন্যেরাও লিখেছেন বা বলেছেন। আমার কাণ্ডজ্ঞানেও সম্ভবত রয়েছে। তবু কাহিনীর খাতিরে আরেকবার উল্লেখ করা যেতে পারে।)
মোদো কলকাতার মধ্য নিশা। চৌরাস্তার মোড়ে দুই মাতাল পরস্পরকে জাপটিয়ে ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বহুদূর থেকে এই দৃশ্য দেখে সার্জেন্ট সাহেব তার সেই লাল মোটর সাইকেল যুগ্মমদ্যপের পাশে দাঁড় করিয়ে বললেন, বাবুরা বাড়ি যাও। Go Home–এর পরে বিবিরা পেটাবে।
সবাই চলে গেছে। শুধু ঐ দু’জন দাঁড়িয়ে রইলেন, চুরচুর অবস্থায় দু’জনায় দু’জনকে পরস্পর আলিঙ্গনাবদ্ধ করে রাস্তায় মধ্যখানে সম্পূর্ণ নিশ্চল। সার্জেন্ট সাহেব তার মোটর সাইকেল নিয়ে তাদের পাস ঘেঁষে দাঁড়িয়ে জোর করতে লাগলেন বাড়ি যাওয়ার জন্যে। কিন্তু তাদের তো বাড়ি যাওয়ার উপায় নেই, তাদের বক্তব্য, ‘United we stand, divided we fall’ অর্থাৎ একত্রে জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে থাকলেই তারা আছে, ছাড়াছাড়ি হলেই পড়ে যাবেন। বাড়ি যাওয়ার উপায় কি?
মিস্টার ডেভিড ওরফে শ্ৰীযুক্ত দেবীদয়াল ওরফে অমরের সমস্যা অনেক জটিল। অধিক মদ্যপান করলে ডেভিডের কদাচিৎ পদস্খলন হয়, সে তখন উদ্বাহু নৃত্য করে।
আর সে বাড়ি যাবেই বা কেন? সেখানে জারিনা বিবির উদ্যত ঝটা অপেক্ষা করছে।
বেচাল অবস্থায় রাত দুপুরে পাড়ার কুকুরদের বিচলিত না করে নিজের ঘরেও নিঃশব্দ প্রবেশ খুব সহজ নয়। সুতরাং যত রাতই হোক জারিনা জেগে উঠবেই এবং তারপর ওরকম অভ্যর্থনা, ঝাটা পেটা এবং অনাহার ডেভিড়ের মোটেই পছন্দ নয়। সুতরাং সে নানা কারণেই বাড়ি ফিরতে চায় না।
নামব্রত সঙেঘর বন্ধুরা উদ্যোগ নিয়ে আগে দুয়েকবার ডেভিডকে বাড়ি পৌঁছে। দিতে গেছে। কিন্তু তার পরিণতি সুখের হয়নি। অনাদি, অনরা সেই বিভীষিকাময় স্মৃতি এখনো বহন করে চলেছে।
একবার বাদলচন্দ্র জারিনার কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে ডেভিডকে ঘরের মধ্যে বুকে একেবারে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে আসার চেষ্টা করেছিল। জারিনা ঘরের মধ্যে অন্ধকারে, নিঃশব্দে ওঁৎ পেতে ছিল। সে মাতল ও অসতর্ক কেরামরে কোমরে আচমকা একটা হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে চোর-চোর বলে চেঁচাতে থাকে।
সঙ্গে সঙ্গে সেই ঘনবসতি ঘিঞ্জি ও হাফন্তি অঞ্চলের বিভিন্ন বাড়িঘর থেকে পিল পিল করে লোক লাঠিবল্পম-ভোজালি-চাবুক-হাতদাবটিদা ইত্যাদি নিয়ে রে রে করে বেরিয়ে আসে। পূর্বপুরুষের বহু পুণ্যে সে যাত্রায় বাদলচন্দ্র মত্ত অবস্থাতেও আত্মপরিচয় দিয়ে নিজেকে রক্ষা করতে পেরেছিল। বলা বাহুল্য, নামব্রত সঙেঘর সহযোগী যারা সেদিন তার সঙ্গে ডেভিডকে বাড়ি পৌঁছাতে গিয়েছিল, দুর্যোগের আভাস পাওয়া মাত্রই তারা দৌড়ে পালিয়েছিল।
এখনো শীতে বর্ষায় বাদলচন্দ্রের কোমরের গাঁটটা টনটন করে।
অবশ্য এর পরেও উপায়ান্তর না থাকায়, বন্ধুরা কখনো কখনো মধ্যরাতে কিংবা তারো পরে ডেভিডকে বাড়ি পৌঁছাতে গেছে। কোনোবারই অভিজ্ঞতা মনোরম হয়নি। জারিনার কেমন যেন বদ্ধমূল ধারণা হয়ে যায় ডেভিডের পদস্খলনের জন্যে। এরাই দায়ী। হিংস ভাষায় এবং হিংস্রর ভঙ্গিতে সে এই বন্ধুবৎসল এবং পরোপকারী বন্ধুদের তাড়া করে যেতো। একবার ‘ডাকাত ডাকাত’ করে চেঁচিয়ে একরাত্রি তালতলা। থানায় এদের হাজহ্বাসের ব্যবস্থাও করেছিল।
সে যা হোক, এখন নামব্রত সঙের সম্মুখে বিশাল সমস্যা। প্রত্যেকবার জন্মাষ্টমীর সময় তার ঢোল করতালি কাসি সহযোগে নামগান করে পথ প্রদক্ষিণ করে। বলতে গেলে এটাই নামগান সঙের বাৎসরিক প্রধান উৎ।
এই উৎব ডেভিডকে বাদ দিয়ে হতে পারে না। সবচেয়ে বড় খোলটা নিপুণ হাতে ডেভিড বাজায়। তার গানের গলাও খুবই সুরেলা। তাছাড়া দীর্ঘকায়, সুদর্শন, গৌরবর্ণ ডেভিড ওরফে দেবীদয়ালই নায়কেরই মত ওই শোভাযাত্রার নেতৃত্ব দেয়। তখন তার চন্দনচতি ললাট, গলায় জুইফুলের মালা, সাদা অঙ্গবস্ত্র ইত্যাদি দেখে কে বলবে যে এই লোকটিই জুতোর দোকানের টাইপরা সেলসম্যান।
তা সেই ডেভিডেরই দেখা নেই এবং এবার ব্রিতি খুব দীর্ঘদিনের। দেড় দুই মাস তো হবেই। হাবিলদার বাড়ির ঠেকে এত দীর্ঘদিন অনুপস্থিত ডেভিড কখনো হয়নি। কখনো কখনো বড়জোর তিন সপ্তাহ হয়েছে। কিন্তু এবার বিশেষ করে এই জন্মাষ্টমীর আগে ডেভিডের এত দীর্ঘকাল দেখা নেই, ভাবা যায় না।
