-হ্যাঁ, হ্যাঁ, আপনি যান। আমি সুবিমলবাবুর সঙ্গে আলোচনা করে নিচ্ছি। সুনীল বোস বিনয়ের সঙ্গে বলেন। বলাবাহুল্য মিস্ পৌষালি ওনার নতুন ছবির নায়িকার জন্যে কনট্রাক্ট ফর্মে সই করেছে গতকালই।
.
২.
রণধীর চৌধুরী স্টুডিও ছেড়ে চলে যাবার পরই ওনারা দুজনে চুপচাপ বাইরে বেরিয়ে
এসে বাস ধরার জন্যে স্টান্ডে অপেক্ষা করেন। বাস আসতে দেরি হওয়ায় নীরবতা ভঙ্গ করে সুনীল বোস সুবিমলকে বলেন, আপনি কি ভুল করে অন্য গল্পের ম্যানস্ক্রিপ্ট নিয়ে চলে এসেছিলেন? তা না হলে—পরক্ষণেই নিজেকে সামনে নিয়ে, সুবিমল যা অভিমানী বলেন, আপনি গল্পটা নিয়ে একটু ভাবুন। ভাল টাকা পাবেন। বিশ হাজার তো বটেইউনি যা লোক, ছবি হিট হলে কিছু বাড়তিও পেয়ে যেতে পারেন।
–না, না, তা কেন হবে। আসলে আমার দ্বারা ওসব ধর্ষণ-উর্ষণ লেখা সম্ভব হয়ে ওঠে না।
—কেন-কেন? সুনীল বোস বিস্ময়ের সুরে ঘাড় ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করেন।
-কেন, তা আপনাকে ঠিক আমি বোঝাতে পারব না। ওসব সেক্স, ধর্ষণ, টর্ষণ লিখতে গেলেই কেমন একটা অস্বস্তি, বিষাদ, আমাকে গ্রাস করে ফেলে। আসলে মানবিকতা, মূল্যবোধ, ন্যায়নীতি-াতিগুলোকে লেখার চরিত্র থেকে আলাদা করে দেখাতে পারি না। তাই লিখতে বসলেই সামাজিক দায়বদ্ধতায় আটকে যায় কলম। বিশেষ করে ধর্ষণের কথা লিখতে গেলেই মাথাটা কেমন গুলিয়ে…।
সুবিমলের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে ক্যামেরাম্যান সুনীল বোস বলেন, তা হবে হয়ত। হয়ত আপনার মানবিকতাবোধ কিন্তু তাই বলে, সংসারের প্রতিও তো আপনার কিছু দায়িত্ব কর্তব্য আছে। তা তো অস্বীকার করতে পারেন না? তাছাড়া এ লাইনে প্রচার ও পয়সা দুই-ই আছে।
–না, তা পারি না ঠিকই। কিন্তু এভাবে অর্থ উপার্জন করতে আমার কেমন ইগোতে লাগে।
-তাহলে কি আর বলব বলুন। আপনি জ্ঞানী-গুণী লোক। তবু ভেবে দেখবেন আর একবার। সুনীল বোসের গলায় হতাশার সুর। বাস থেকে নেমে কথা বলতে বলতে দু’জনে গালির মুখে একদিকে সুনীল বোস, অন্যদিকে সুবিমল ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। একই পাড়ায় বাড়ি দু’জনের। কয়েকটা বাড়ির তফাৎ মাত্র। সম্পর্কে সুবিমল সুনীল বোসের দুরাত্মীয়।
সুবিমল বাড়িতে না ঢুকে একটু এগিয়ে রাস্তার অনতিদুরে শিবানন্দ পার্কে গিয়ে বসে। এখন রাত প্রায় দশটা। রাস্তা দিয়ে ঘরমুখো দু’চারজন অফিস ফেরতা লোকজন। নিঃশব্দ তাদের চলার গতি। বড় কৃষ্ণচূড়ার সান বাঁধানো গোল চাতালে সুবিমল এখন একা। মৃদু মৃদু বাতাসে দুলছে কৃষ্ণচূড়ার পাতা। পার্কের মাঝখানে চৌকো ঝিলে রুপোলি জ্যোৎস্না গলে গলে মিশে যাচ্ছে। জলের ওপরে দেবদারু, ইউক্যালিপটাশ, কাঠালি চাপার ছায়া। সেই জলছায়ায় জলপরীদের বিহার। আজ বিজয়াও এই দ্বীদের মধ্যে। বিজয়া হাসছে খিল খিল করে। তার স্নিগ্ধ হাসিতে ঝরে পড়ছে মুঠো মুঠো মুক্ত। সুবিমল নৈঃশব্দের বুকে ছড়িয়ে দিল নিজেকে। ভিন্ন জগরে অনুভূতিতে সে আপন করে পেতে চাইল বিজয়াকে। হাত বাড়িয়ে ডাকল। বিজয়া আলোর বন্যা ছড়িয়ে হাসতে হাসতে উঠে এল জল থেকে। বিজয়া কাছে এসে বসতেই সুবিমল তার দুটি কোমল হাত তুলে নিল নিজের হাতে। তারপর করতলে চাপ দিয়ে বলল, আমি তোর প্রতি অন্যায় করেছি বিজয়া অন্যায় করেছি, আমায় ক্ষমা কর তুই।
—কি যাতা বলছ সুবিদা। তোমার কি দোষ, সবই আমার নিয়তি।
–না না বিজয়া, তোকে নিয়ে যদি না সেদিন সিনেমা দেখতে যেতাম, তাহলে হয়ত…
–সিনেমাটা উপলক্ষ্য মাত্র। যা ঘটার সেদিন না ঘটলেও অন্যদিন ঘটত।
—বিজয়া!
বিজয়ার কথায় বিস্ময়ে সুবিমলের রোম খাড়া হয়। নিজেকে অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে বলে, মা বাবার কথায় সেদিন আমি কাপুরুষের মত পালিয়ে এসেছিলাম দেশ থেকে কলকাতার হোস্টেলে। যারা তোকে ধর্ষণ করেছিল, তাদের আমি চিনতে পেরেও ভয়ে নাম করিনি। ওরা আমাকে শাসিয়েছিল, নাম করলে আমার বোনকে ধর্ষণ করে..
–তুমি ঠিকই করেছ সুবিদা। আমার জন্যে অনিমাদির জীবনটাও হয়ত ফুরিয়ে যেত অকালেই। আমি তো ওদের চিনি। ওরা অনিদিকে ছেড়ে দিত না। আমার মত দুদে, সাহসী, বেপরোয়া মেয়েকে যদি ওরা…।
—তুই কি বলছিস বিজয়া আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। তাই বলে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো কি আমার উচিত ছিল না?
—হয়ত ছিল। কিন্তু রুখে দাঁড়িয়েই বা কি করতে? তোমার ও তোমাদের সংসারের অনেকের জীবন বিপন্ন হত। অনিদিরও কিছু একটা ঘটে যেতে পারত। তাছাড়া বাবা তো অত কিছু করেও কিছু করতে পারলেন না ওদের। পার্টি, পুলিশ কেউ তো কিছু করল না। এমনকি কেউ অ্যারেস্ট পর্যন্ত হল না। পার্টির ছত্রছায়ায় ওরা এখন দিব্বি বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। লজ্জায়, অপমানে বাবা নিরুদ্দেশ হয়ে গেলেন। আমি শেষ পর্যন্ত—তবে শেষটায় তোমাকে একবার দেখার জন্যে মন প্রাণ আকুল হয়ে উঠেছিল। তাই গোপনে মাকে একটা চিঠি লিখেছিলাম, সব শেষ হয়ে গেলেও, তুমি যেন এসে একবার আমাকে দেখে যাও।
–কিন্তু আমি যে নিরন্তর আজও যুদ্ধ করে চলেছি নিজের সঙ্গে। আমার তো উচিত ছিল, যেখানে তোর কোন কিছু দোষ ছিল না, সেখানে তোর পাশে গিয়ে দাঁড়ানো। বিয়ে করে….
—হাসালে সুবিদা। আমাদের দেশটা তো, ইউরোপ আমেরিকা নয়। তোমার বিবেক বললেও, প্রাণ চাইলেও, সমাজ, তোমার বাবা, মা, আত্মীয়স্বজন কেউ মেনে নিত না। এক জ্বালা জুড়ালেও হাজার জ্বালায় আমাকে জ্বলে পুড়ে মরতে হত। আমার যা ব্যক্তিত্ব, প্রতিমুহূর্তে অন্তসত্তায় আঘাত লাগত। শেষে গায়ে কেরোসিন ঢেলে কিংবা গলায় দড়ি দিয়ে…তখন তুমি বিপদে পড়তে।
