.
স্টপস্টপ-প্লিজ স্টপ। এটা প্রবন্ধ না নিবন্ধ? নাকি পাগলের প্রলাপ। গল্পের কোন মাথা নেই মুণ্ডু নেই। স্রেফ আত্মকথন। যত্ত সব রাবিশ। সেই প্রথম থেকে। ফার্স্ট পার্শেন—আমি আমি। আর আপনাকেও বলি সুনীল দা, দেশে কি লেখকের আকাল পড়ে গেছে? তাচ্ছিল্য, বিরক্তি, উপহাসে বলেন রণধীর চৌধুরী। প্রযোজক কাম পরিচালক। সুনীল বোসের চোখমুখ লজ্জা ও সংকোচে লাল হয়ে ওঠে। কপালের বিন্দু বিন্দু ঘাম রুমাল দিয়ে মুছে ঢোক গিলে বলেন, নামানে সুবিমলবাবুতো ভাল লেখেন টেখেন, তাই–
এটা ভাল লেখার নমুনা? ধর্ষণের গল্প এইভাবে নিজের কথা দিয়ে আরম্ভ হয়? পাগল নাকি? কি চরিত্র থাকবে আপনাকে তো আমি আগেই বলে দিয়েছিলাম। আপনি কি বলেননি সুবিমলবাবুকে? আবার বলছি শুনুন—
১) একজন ধনীর খেয়ালি জেদি ছেলে, যার দু’চারজন সমবয়সী বন্ধুবান্ধব, ড্রাগঅ্যাডিক্ট, কিন্তু ব্রেনি। লেখাপড়া শিখছে কলেজ অথবা য়ুনিভার্সিটিতে। ছেলেটি হবে নায়ক।
২) নায়িকা হবে সহপাঠিনী, সুন্দরী, একগুঁয়ে, মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে।
৩) মেয়েটিকে (নায়িকা) দু’জন ভালবাসবে, মানে টুয়াইস হিরো। ওই বড়লোকের ছেলেটি বাদে আর একজন ছেলে, যে শিক্ষিত, আদর্শবাদী কিন্তু গরিব।
৪) মেয়েটি বড়লোকের ছেলেটিকে, আই মিন, কি বলব, প্রেফার করবে, কিন্তু গরিব ছেলেটিকে বারবার অপমান করে ফিরিয়ে দেবে বাড়ির দরজা থেকে।
৫) একদিন ছেলেটি হুগলি সেতু-মানে ওই বিদ্যাসাগর সেতু কিম্বা আউট্রাম ঘাট অথবা রেসকোর্সে মেয়েটিকে বেড়াতে নিয়ে যাবে। সে সময় প্রকৃতির বর্ণনা থাকবে, ওই সন্ধে কিংবা সন্ধের পরপর, কয়েকজন গুণ্ডা তুলে নিয়ে গিয়ে মেয়েটিকে রেপ করে ঝোঁপের ধারে ফেলে রেখে চলে যাবে।
৬) থার্ড পার্শেন, মানে পাবলিক, মেয়েটিকে গোঙাতে দেখে (যন্ত্রণায় ছটফট করবে মেয়েটি, ঘেঁড়াখুঁড়ি পোষাক পরিচ্ছদ) তুলে নিয়ে গিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করবে।
৭) মেয়েটি—ওই যা হয় আর কি রেপ টেপ কেসে, প্রথমে একটু অ্যাবনরম্যাল, তারপর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে এসে বড়লোকের ছেলেটির সঙ্গে দেখা করতে যাবে, কিন্তু অপমানিত হয়ে ফিরে আসবে।
৮) গরিবের ছেলেটি ততদিনে পাশ-টাশ করে দামি চাকরিতে জয়েন করেছে, সেও আর মেয়েটিকে…নাকি কি করা যায়, আরে চুপ করে বসে আছে কেন সুনীল দা, কিছু বলবেন তো?
–না না, আমি না। আপনি তো প্লটটা বলছেন ভালই বলুন না।
৯) তারপর-তারপর হ্যাঁ, ততদিনে বড়লোকের ছেলেটির কিছুটা বিবেকবোধ জন্মেছে, বিবেক তাড়িত হয়ে মেয়েটির সঙ্গে পুনরায় দেখা করতে যাবে, কিন্তু মেয়েটি অপমান করে তাড়িয়ে দেবে। রাজনীতি-টাজনীতি কিছু রণবীর দা, সুনীল বোস বলেন।
১০) হ্যাঁ-হ্যাঁ, অফ কোর্স-সিওর। হসপিটালে রিপোর্টার মানে পেপার নিউজ, রুলিং পার্টি, বিরোধী পার্টি, আই মিন বিরোধী পার্টি মেয়েটিকে নিয়ে একটা বন্ধ দেখাতে পারলে খুব ভাল হয়, তাই না সুনীল দা?
—হ্যাঁ-তা ঠিক। তারপর একটু চিন্তা করে সুনীল বোস বলেন, তাহলে কিন্তু গল্পের মোড় অন্যদিকে ঘুরে যেতে পারে দাদা
-কেন-কেন?
—মেয়েটিকে নিয়ে বিরোধীপক্ষ রাজনীতি আরম্ভ করবে। চাকরি দেবে। মানে মেয়েটি এস্টাবলিস্ট হয়ে যাবে।
-হ্যাঁ, তাও তো বটে, তাহলে কি করা যায়…
—কেন হোমে পাঠিয়ে দিলে…আই মিন উদ্ধার আশ্রম?
–ধ্যাৎ, তাহলে স্টোরি একেবারে কেঁচে যাবে। দর্শক খাবে না। আচ্ছা সুবিমলবাবু এরপর আপনি আপনার বুদ্ধি আর লেখার চাতুর্য দিয়ে—মানে আমি বলছিলাম আপনারা লেখক মানুষ—সবকিছুই পারেন, মানে ওই কনক্লসানটুকু পারবেন তো?
সুবিমল বিষণ্ণ, হতাশ অথচ ন দৃষ্টিতে রণধীরবাবুর মুখের দিকে তাকায়। রণধীরবাবু কিছুটা হতাশ হন। সুনীল বোস সুবিমলের চোখের ভাষা ঠিক ঠিক পড়তে
পেরেও বুদ্ধি করে বলেন, হা হা নিশ্চয় পারবেন, কেন পারবেন না। উনি খুব ভাল লেখেন। একবার দেখুন না, ওনার গল্প বড় বড় পত্রিকায় ছাপা হচ্ছে। আসলে উনি একটু সিরিয়াস—মানে উঁচু মানের, যাকে বলে ক্লাসিক-টলাসিক…
—ওসব এখানে চলবে না। এখন যা ইন্ডাস্ট্রির অবস্থা, বলিউড মার্কা মানে বোম্বের মতঝাড়পিট-সেক্স-নাচ-গান… দেখছেন না ম্যাসিমা বাংলা ছবি ফ্লপ করছে…
সুনীল বোস রণধীরবাবুর কাছে কাজ করছেন বহুদিন। ওনার চরিত্র, মুড, সবকিছুই নখদর্পণে। লোকটি এখন টালিগঞ্জের নামকরা কমার্সিয়াল প্রযোজক কাম পরিচালক। ভদ্রলোক একসময় ভীষণ পরিশ্রম করেছেন। কেরিয়ারিস্ট মনোভাব নিয়ে। নিজেকে তৈরি করেছেন তিল তিল করে। তাই সাকসেস্ এখন হাতের মুঠোয়। ওইসব ক্লাসিক-লাসিক শিল্প-টিল্পর তেমন ধার ধারেন না উনি। ওনার দশ টাকা ইনভেস্ট করলে চাই একশ টাকা। উনি বলেন, সত্যজিৎ, মৃণাল, ঋত্বিক, গৌতম ওনারা সব অন্য জগতের। ট্যালেন্টেড। আমার জন্যে কমার্স। আমার ছবি মানে আনন্দ-ফুর্তি, যাকে বলে অ্যামিউজমেন্ট। আমি চা বইতে বইতে পরিচালক হয়েছি। অত জ্ঞান আমার কোথায়? ওনার থিওরি, মানি ফ্রম মানি। মানি ইজ গ্রেট। তবে ভীষণ আমুদে আর ফুর্তিবাজ লোক। দু’হাতে যেমন রোজগার করেন ওড়ানও তেমনি। বলেন, ‘ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ। যাবৎ জিবেৎ সুখং জিবেৎ।‘ আজকাল একটু আধটু অন্যরকম ভাবতে বাধ্য হচ্ছেন। পরিস্থিতির চাপে পড়ে। দর্শক লাইট জিনিষ নিচ্ছে না। তা না হলে নিজেই স্টোরি বানান, স্ক্রিপ্ট করেন। রণধীরবাবু কজি উল্টে ঘড়ি দেখে বলেন, ইস, বড্ড দেরি হয়ে গেল। নটায় পৌষালিকে টাইম দিয়েছিলাম। আমি উঠি সুনীল দা কথা বলতে বলতেই রণধীরবাবু ব্রিফ কে হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ান।
