চাদরটা আলনা থেকে তুলে নিয়ে বললাম—”শুধু আদেশের অপেক্ষা। কিন্তু কোথায় যাচ্ছো?”
“বাজার করতে।”–বলে করুণা হাসলে।
“বাজার করতে।”—অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম।
“আমি তো প্রায়ই যাই।” সে হেসে বললে—”এখানে ‘চেঞ্জার’ ছাড়া বাসিন্দাদের মেয়েরা বড়ো একটা নিজেরা বাজারে যান না বটে, কিন্তু আমি ও-সব মানি না; উনি না থাকলে আমি নিজেই চাকর নিয়ে বেরিয়ে পড়ি।”
“কিন্তু বিমলবাবু তো আজ আছেন!”
“ও, তোমায় বুঝি বলা হয়নি! উনি খবর পাঠিয়েছেন আজ আসতে পারবেন না, হঠাৎ বিশেষ জরুরি কাজে আটকে পড়েছেন।”
করুণা বেশ সহজভাবেই কথাটা বলে গেলো। কিন্তু আমি রাস্তার মাঝেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম-”তা হলে?”
“তা হলে আর ভাবনা কিসের! উনি না থাকলে কি তোমার যত্ন হবে না!”
করুণার চোখে মুখে কৌতুকের দুষ্টু হাসি!
“তুমি রাস্তায় দাঁড়িয়ে ভাবতে শুরু করলে আমায় একাই এগিয়ে যেতে হবে।”
অগত্যা নীরবে তার সঙ্গে এগিয়ে যেতে হলো। এদিকের পথটা বেশ নির্জন। দূরে দূরে দু-একটা বাড়ি। তারও অনেকগুলি খালি পড়ে আছে। রাস্তায় লোক নেই বললেই হয়।
খানিকদূর নীরবে চলার পর প্রশ্ন না করে পারলাম না—”বিমলবাবু আজ রাত্রে ফিরবেন তো?”
“বোধহয় না। এখন দু-চার দিন হয়তো সেখানে থাকতে হবে।”
আবার নীরবে অনেকটা পথ পার হয়ে গেলাম। করুণা কয়েকবার আমার দিকে ফিরে তাকাবার পর হেসে বললে—”কি ভাবছো অতো গম্ভীরভাবে?”
“ভাবছি আজই আমায় চলে যেতে হবে।”
“তোমার গাড়ি তো আজকের মধ্যে মেরামত হয়ে উঠবে না।”
“গাড়ি এরা পরে পাঠিয়ে দেবেখন। আমি ট্রেনেই যাবো।”
“এত ব্যস্ত কেন? তোমার এখানে ভয় কিসের?”
রাস্তার মাঝে আবার দাঁড়িয়ে পড়লাম-”বলেছি তো ভয় আমার নিজেকে। নিজেকে আমি বিশ্বাস করি না।”
করুণা এবার বেশ জোরেই হেসে উঠলো—”না-ই বা করলে, তাতে কারুর তো কোনো ক্ষতি নেই!”
না, এ বুঝি আর সওয়া যায় না। হঠাৎ সমস্ত সংযম হারিয়ে তার হাতটা ধরে ফেললাম–”ক্ষতি যদি তোমারই হয়…”
করুণা হাত ছাড়িয়ে নিলো না। কিন্তু পরিহাসের হাসিতে আমার সমস্ত আবেগকে নিষ্ঠুরভাবে হাকা করে দিয়ে বললে-” কেমন করে হবে? আমি তো নিজেকে বিশ্বাস করি!”
করুণার হাত ছেড়ে দিয়ে বললাম—”সে বিশ্বাস এখনো কি ভেঙে চুরমার হয়ে যেতে পারে না করুণা? সমস্ত নোঙর ছিঁড়ে তোমায় ভাসিয়ে নিয়ে যাবার ঢেউ কি আসতে পারে না?”
করুণার চোখে সেই দুর্বোধ সকৌতুক হাসি—”কি জানি, পরীক্ষা অবশ্য হয়নি।”
তারপর কি বলতাম ঠিক জানি না, কিন্তু রাস্তা এবার জনবহুল হয়ে এসছে। বাধ্য হয়েই চুপ করে গেলাম।
সকালবেলা বাইরে বার হবার পোশাকে করুণার একরূপ দেখেছিলাম। দুপুরবেলা সোড়শোপচার আহারের আয়োজনের আসনের সামনে বসে তার আর একরূপ দেখলাম। একটি সাদা সেমিজের ওপর লাল চওড়া কস্তাপাড় শাড়ি পরে আধ-ঘোমটার পাশ দিয়ে ভিজে এলোচুল পিঠে এলিয়ে সে কাছে এসে বসলো। এমন আশ্চর্য তাকে কোনেদিন লাগেনি।
পাখাটা নাড়তে নাড়তে হেসে সে বললে-”কি দেখছো? কখন দেখোনি নাকি!”
“মনে হচ্ছে সত্যি কখনও দেখিনি!”
“তা হতে পারে!”–বলে সে অদ্ভুতভাবে হাসলো, তারপর জিজ্ঞাসা মলে—”আচ্ছা, আমার বাজার করা দেখে কি ভাবছিলে বলো তো?”
“এই কথাই ভাবছিলাম যে তুমি আমার কাছে একটা নতুন আবিষ্কার!”
“তাই নাকি, কিন্তু, দোহাই, বেচারা কলম্বাসের দাবিটুকু উড়িয়ে দিও না।”
“কলম্বাসেরও আগেকার দাবি যদি থাকে?”
“দাবি থাকলেও দলিল নেই তো!”–নিজের রসিকতায় করুণা নিজেই হেসে মাত করে দিলে।
নিঃশব্দে অনেকক্ষণ খেয়ে যাবার পর বললাম—”দলিলের দাম সকলের কাছে নেই! ও তুচ্ছ জিনিস অনায়াসে পুড়িয়ে ফেলা যায়।”
এবার করুণা হাসলো না। আমার মুখের দিকে খানিক অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে থেকে—”তোমায় মিষ্টি দেওয়া হয়নি,” বলে হঠাৎ উঠে গেলো।
তারপর মিষ্টি করুণা নিয়ে এলো না, নিয়ে এলো ঠাকুর।
কিন্তু খানিক বাদে ঘরে সে নিজেই পান নিয়ে এলো এবং হঠাৎ বলে বসলো–”তুমি আজ সন্ধ্যের গাড়িতেই তাহলে যাচ্ছো?”
সবিস্ময়ে তার মুখের দিকে তাকালাম। আমারই মনের ভুল, না তার মুখে একটা অস্ফুট অস্থিরতার ছায়া?
বললাম—”বেশ, তাই যাবো।”
“বেশ তাই যাবো মানে? আমি যেন তোমায় জোর করে পাঠিয়ে দিচ্ছি। আমি তো তোমায় থাকতেই বলছি, তুমি নিজেই তো যাবার জন্যে অস্থির হয়ে উঠলে তখন।”
গলার ঝাঁঝটা এবার লুকোবার নয়।
হেসে বললাম—”আমি কি তোমায় দোষ দিচ্চি? আমার সত্যিই না গেলে নয়।”
একটু যেন লজ্জিত হয়ে করুণা হাসবার চেষ্টা করে বললে—”তা জানি, এমন জায়গায় তোমার মন টেকে? কিন্তু শোনো, সন্ধ্যায় ঐ একটি ছাড়া আর গাড়ি নেই তা জানো তো? ঠিক সাড়ে ছটায়, মনে থাকে যেন।”
গাড়ির সময় আমার মনে রাখবার প্রয়োজন ছিলো না। বিকেল না হতেই জিনিসপত্র বাঁধিয়ে, আমার মোটরের কারখানায় খবর দিতে পাঠিয়ে, স্টেশনে যাবার গাড়ি ডাকিয়ে করুণা নিজেই সব বন্দোবস্ত করে ফেললে এবং স্টেশনে যাবার পনেরো মিনিটের পথ যেতে পাছে কোনো গোলমাল হয় বলে এক ঘণ্টা আগে আমায়—গাড়িতে তুলে দিয়ে নিশ্চিন্ত হলো।
এতক্ষণ আমার সঙ্গে বিশেষ কিছু বলবার অবসর তার মেলেনি।
বাড়ি থেকে টাঙ্গায় ওঠবার সময় সে কাছে এসে দাঁড়িয়ে বললে—”তুমি আমায় কি ভাবছে কে জানে! যেন তোমায় বিদেয় করতে পারলেই বাঁচি মনে হচ্ছে, না?”
