করুণা খাবার প্লেটটার দিকে চেয়ে বললে—”একি! কিছুই যে খাওনি!”
পাঞ্জাবির বোম আঁটতে আঁটতে তার দিকে ফিরে চাইলাম; একটু হেসে বললাম-”লৌকিকতার বদলে লৌকিকতাই করতে হয় যে, দুর্ভিক্ষপীড়িতের মতো cট সাফ করে ফেললে তুমি ভাবতে কি?”
“তুমি এখনো সেই এক কথা ধরে বসে আছো!”–করুণার স্বর একটু যেন ক্ষুণ্ণ।
“এক কথা ধরে বসে থাকা আমার একটা দুর্বলতা করুণা, এখনও এটা শোধরালো না।”—আমার স্বর বেশ গাঢ়।
করুণা অন্যদিকে ফিরে খাবার প্লেটটা সরিয়ে রাখছিলো, তার মুখ দেখতে পেলাম না। কিন্তু যে উত্তর সে দিলে তাতে সহজ কৌতুক ছাড়া আর কিছুই আভাস নেই।
“আর ঘ দুর্বলতা তাহলে শুধরে ফেলেছ!”—আমার দিকে ফিরে করুণা আবার বললে—”একি, এরই মধ্যে বেরুচ্ছো নাকি?”
“হাঁ, গাড়িটার কতদূর কি হলো একবার দেখতে তো হয়!”
“তুমি দেখলেই তো সেটা তাড়াতাড়ি মেরামত হয়ে যাবে না। উনি তো খোঁজ নিয়ে আসবেন বলেছেন। ওঁর ফিরতে আর দেরি নেই। তোমায় থাকতেই বলে গেছে।”
“সুতরাং ততক্ষণ তোমার সঙ্গে বসে গল্প করতে বলেছেন?”— হেসে বলবার চেষ্টা করলাম।
সকৌতুক মুখভঙ্গি করে করুণা বললে—”তা করতে পারো।”
আমার স্বর আপনা থেকে তখন বুঝি গাঢ় হয়ে এসেছে—”অনায়াসে বলে ফেললে যে করুণা!”
“এমন কি একটা কঠিন কথা সে অনায়াসে বলা যায় না?”করুণার মুখে একাধারে হাসি ও বিস্ময়।
“এমন কিছু কঠিন নয় করুণা? সত্যি বলছো? আমার সঙ্গে একা বসে গল্প করতে তোমার ভয় করে না? আমার যে নিজেকে এখনো ভয় করে।”
“তোমার মাথাটি বেশ খারাপ হয়েছে দেখছি।”–বলে হেসে আমায় বেশ একটু অপ্রস্তুত করে করুণা এবার বেরিয়ে গেলো। দরজার কাছ থেকে ফিরে আবার বললে—”তুমি কিন্তু যেও না, আমি এখুনি আসছি।”
কিন্তু অনেকক্ষণ করুণা তারপর আর আসে না। ঘরের ভেতর পায়চারি করে বেড়াতে বেড়াতে মনের মধ্যে কী একটা জ্বালা অনুভব করি। সেটা আমার নিজের না করুণার বিরুদ্ধে বোঝা শক্ত। হয়তো সেটা নিয়তির বিরুদ্ধে।
কী দরকার ছিলো এমন করে আবার তার সঙ্গে দেখা হবার! দেখা হওয়াটা দৈরে আয়োজিত পরিহাস ছাড়া আর কি?
ক-দিন ছুটি পেয়ে মোটরে একটু ঘুরতে বেরিয়েছিলাম। কাল রাত্রে এই শহরের মাঝখানে এসে যখন তার কল হঠাৎ বিগড়ে গেছিলো তখন জঙ্গলের পথে না হয়ে একটা ভদ্রগোছের শহরের মধ্যে দুর্ঘটনাটা ঘটেছে বলে ভাগ্যকে ধন্যবাদই দিয়েছিলাম। ভবিষ্যতটা তখন জানতে পারলে বোধহয় জঙ্গলের পথটাই শ্রেয়ঃ মনে করতাম।
একে রাত্রিকাল, তায় অচেনা শহর। ডাকবাংলো ও স্টেশনের ওয়েটিংরুম থেকে দরিদ্রতম হোটেলে পর্যন্ত টাঙ্গা করে ঘুরে আশ্রয় না পেয়ে শেষে, যে কারখানাতে মোটর মেরামত করতে দিয়েছিলাম, সেখানেই ফিরে গেছিলাম হতাশ হয়ে। সেখানেই বিমলবাবুর সঙ্গে পরিচয়। কাছাকাছি একটা কয়লার খনিতে তিনি কাজ করেন। সেখানকার কি প্রয়োজনে একারখানায় এসেছিলেন। প্রবাসে বিপন্ন বাঙালীর সাহায্যে তিনি নিজে থেকেই অগ্রসর হয়ে তার বাড়িতে রাত্রি কাটাবার প্রস্তাব করেছিলেন। সামান্য একটু আপত্তি হয়তো করেছিলাম, কিন্তু তিনি তা শোনেননি।
শহরের নির্জন এক প্রান্তে বিমলবাবুর বাড়ি। সেখানে পৌঁছে দেখা গেছিলো সমস্ত বাড়ি নিস্তব্ধ। দরজার কড়া নাড়তে নাড়তে বিমলবাবু বলেছিলেন–“আজ আমার আবার কথা ছিল ন কিনা! চাকর ব্যাটারা নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমোচ্ছে!”
খানিকক্ষণ পরে একটি মহিলাই লণ্ঠন হাতে এসে বাইরের দরজা খুলে নিদ্রাজড়িত স্বরে বলেছিলেন—”বড় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, কিন্তু তুমি যে বলে গেছিলে আজ আসবে না!”
বিমলবাবু হেসে বলেছিলেন—”ব্বাতে একটা পরোপকারের পুণ্য ছিলো, তাই বোধহয় আসার সুবিধে হয়ে গেল। আমি না এলে এই ভদ্রলোক একটু বিপদেই পড়তেন বোধহয় অজানা শহরে!”
করুণা এইবার আমায় দেখতে পেয়েছিল। মাথায় ঘোমটা দিয়ে সরে যেতে গিয়ে হঠাৎ সে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে।
বিমলবাবু তখনও বলে চলেছেন—”তুমি চাকরগুলোকে ডেকে দাও, বাইরের ঘরটা খুলে একটা বিছানা ঠিক করে দিক। ভদ্রলোকের একটু কষ্ট হবে–”
হঠাৎ তাকে করুণার কথায় সবিস্ময়ে থেমে যেতে হয়েছে। করুণা হেসে বলেছে–“বিদেশ-বিভূঁয়ে একটু কষ্ট হলেই বা ভদ্রলোকের!”
বিমলবাবু অবাক হয়ে আমাদের দুজনের মুখের দিকে চেঁচিয়ে ওঠেন—”তার মানে! এঁকে তুমি চেনো নাকি!”
“তা একটু চিনি বৈকি!”— করুণা হেসে উঠেছে।
“কী আশ্চর্য!”
“আশ্চর্যটা কিরে! তোমার অচেনা বলে আমার চেনা হতে নেই! তোমরা সঙ্গে তো মাত্র তিন বছর বিয়ে হয়েছে, তার আগে কুড়ি বছর আমি সলিটারি সেলে ছিলাম মনে করো!”
বিমলবাবু হেসে ফেলে বলেছেন—”কিন্তু ভদ্রলোককে বাইরে ঠাণ্ডায় দাঁড় করিয়ে রেখে আমাদের দাম্পত্য জীবনের নমুনাটা নাই দেখালে।”
করুণা গম্ভীর হবার ভান করে বলেছে—”ও আমি শুধু ঝগড়া করি এই তুমি বোঝাতে চাও!”
এবার একটা কিছু বলা উচিত বলেই হাদারচেষ্টা করে কথা বলেছি—”ব্যবসাই পেশা বিমলবাবু, নমুনা দেখে আমি ভুলি না।”
এতদিন বাদে করুণার প্রথম আলাপের ধরনে তখনই মনে কোথায় আমার একটা খটকা লেগেছে।
.
অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে যখন নিজেই বেরিয়ে পড়বে কি না ভাবছি তখন রুশা এলো। সাজ-পোশাকের পরিবর্তন দেখে যা বলতে যাচ্ছিলাম নিজে থেকেই তার উত্তর দিয়ে সে বললে—”একটু বাইরে যেতে হবে। আসবে আমার সঙ্গে?”
