কিন্তু সেই অভাবিত ব্যাপার যখন ঘটলো তখন দেখলাম, করুণাকে অনায়াসে ভুলে গেছি যখন মনে করেছি তখনও সে আমায় ভুলতে পারে না—মনের এ গোপন গর্বটুকু ত্যাগ করতে পারিনি।
এ রকম একটা গর্ব থাকা খুব অস্বাভাবিক বোধহয় নয়।
সে-সব দিনের কথা একেবারে ভোলা তো যায় না! বিশেষ করে সেই একটি বিকেল। সারাদিন বাইরে অবিশ্রান্তভাবেই বৃষ্টি পড়েছে, ইচ্ছে থাকলেও কোথাও আর বার হওয়া হয়নি। বিকেলে চাকর এসে খবর দিলে একটি মেয়ে দেখা করতে এসেছে।
এই হোটেলে আমার সঙ্গে দেখা করতে একটি মেয়ে। প্রথমটা সত্যিই একটু বিমূঢ় হয়ে গেছিলাম। চাকরের সঙ্গে করুণা যখন ঘরে এসে ঢুকলো তখনও আমার মুখের বিস্ময় নিশ্চয় অত্যন্ত স্পষ্ট।
চাকর চলে যাবা পর করুণা কাছে এগিয়ে এসে বললে— “খুব আশ্চর্য হয়েছো না?”
“তা একটু হয়েছি, কিন্তু তুমি যে একেবারে ভিজে গেছে!”— আমি সত্যই ব্যস্ত হয়ে উঠলাম।
করুণা কাছের একটা চেয়ারে বসে বললে— “বৃষ্টিতে বেরুলে ভিজতে হয়, তোমার ব্যস্ত হতে হবে না।”
তারপর হেসে উঠে বললে—”ব্যস্ত হয়ে করবেই বা কি! তোমাদের এ নারী বিবর্জিত রাজ্যে মেয়েদের পোশাক পাবে কোথায়? সখের থিয়েটার পার্টি তো নিশ্চয়ই তোমাদের নেই!”
একটু ভেবে বললাম—”ওপরে দশ নম্বরে একজনেরা আছেন— স্বামী-স্ত্রী!”
করুণা আবার আসলো—”তাঁদের কাছে শাড়ি ব্লাউজ চাইতে যাবে? কি বলে চাইবে?”
হাসি থামিয়ে গম্ভীর হয়ে বললে—”তার চেয়ে ভিজে কাপড়েই আমি বেশ আছি। আমার অসুখ করবে না, ভয় নেই।”
অগত্যা তার পাশে গিয়ে বসলাম। আমি কোনো প্রশ্ন করবার আগেই সে আবার বললে—”ভাবছো, এমনভাবে এখানে আসার মানে কি? কেমন?”
এবারও কোনো উত্তর দিলাম না। করুণা খানিকক্ষণের জন্যে কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে গেছে মনে হলো। তারপর সম্পূর্ণ রূপান্তর। এই দুর্বার আবেগ সে এতক্ষণ জোর করে ধরে রেখেছিল বুঝলাম।।
একেবারে আমার বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সে ব্যাকুল স্বরে বললো— “আমায় পাটনায় নিয়ে যাচ্ছে। মামা কাল চিঠি দিয়েছেন।”
বুঝতে কিছু পারলাম না এমন নয়। তবুও বেদনাময় সত্যটা যতক্ষণ সম্ভব অস্বীকার করে বললাম-”তোমাদের কলেজের তো ছুটি হচ্ছে?”
করুণা আরো ব্যাকুল স্বরে বললে—” না না, তা নয়। তুমি বুঝতে পারছে না। এখানে আমায় আর রাখবে না; এই যাওয়া আমার শেষ!”।
তার ঠাণ্ডা একটা হাত নিজের হাতের মধ্যে ধরে স্তব্ধ হয়ে বসে রইলাম। হ্যাঁ, বেদনা সেদিন আমার হৃদয়েও ছিলো, কিন্তু করুণার উদ্বেল আবেগের তুলনায় সে বুঝি কিছু নয়! আমার ভালোবাসার মধ্যে সে উদ্দামতা ছিলো না যা ভাগ্যের বাধার বিরুদ্ধে উদ্ধত বিদ্রোহ করতে পারে।
কিন্তু করুণা খানিক বাদে অশ্রুসজল মুখ তুলে দৃঢ়স্বরে বললে—”আমি যাবো, কিছুতেই যাবো না। কেন যাবো?”
কি উত্তর একথার দেবো ভেবে পেলাম না। মনের গভীরতায় হয়তো সেইদিনই তার এ বিদ্রোহে আমার সায় ছিলো না। তখনই আমি জানতাম যে এ বিদ্রোহ নিষ্ফল।
কথাটা একটু ঘুরিয়ে দেবার ষ্টোয় বললাম-”তুমি যা মনে করছে তা তো নাও হতে পারে করুণা; তুমি হয়তো মিছিমিছি ভয় পাচ্ছো।”
করুণা আবার অস্থির হয়ে উঠলো—”না না, আমি জানি; জোর করে তাঁরা আমায় সেখানে বন্দী করে রাখতে চান। তাদের ধারণা এ-সব ছেলেমানুষী সারাবার তাই অব্যর্থ ওষুধ।”
করুণা একটু তিক্ত হাসি হাসলো।
তারপর বললে—”আমি কলেজে যাবার নাম করে বেরিয়ে এসেছি। এখানে এসে তোমায় অসুবিধায় ফেলবার ইচ্ছে ছিলো না। কিন্তু না এসে যে উপায় নেই, পিসিমার বাড়িতে তোমার যাওয়া তো প্রায় বন্ধ হয়েছে। সেখানে এসব কথা তোমায় জানাতেও পারতাম না।”
একটু থেমে করুণা আবার অস্থির হয়ে উঠলো আবেগে—”সত্যি কি আমায় নিয়ে যাবো জোর করে! কিছুই আমরা করতে পারবো না?”
সেদিন কি আশ্বাস, কি সান্ত্বনা দিয়ে করুণাকে তার পিসিমার বাড়ি রেখে এসেছিলাম, তার বিবরণের এখানে প্রয়োজন নেই, কিন্তু মনে যত বড়োই ব্যথা পেয়ে থাকি না, কিছুই তারপর করতে পারিনি এটা ঠিক।
করুণাকে তার মামারা জোর করে কিনা জানি না তারপর পাটনায় নিয়ে গেছে; যাবার আগে দেখা করবার সুযোগও মেলেনি আমাদের।
নিমন্ত্রিত অবশ্য হইনি, কিন্তু একদিন কোথা থেকে করুণার বিয়ে হয়ে যাওয়ার সংবাদও কানে এসেছে। নির্লিপ্ত নির্বিকার মনে সে-সংবাদ শুনেছি এমন কথা বলতে পারবো না, কিন্তু আজ বিশ্লেষণ করে দেখে বুঝতে পারি এসংবাদ পাবার পর কয়েকটি দিন ও রাত যে আমার কাছে হতাশায় ধূসর হয়ে গেছে, তা প্রধানতঃ করুণার দুঃখের কথা ভেবে। ভালোবেসে না পাওয়ার ব্যর্থতা সেদিন নিজের দিক দিয়ে নয়, করুণার দিক দিয়েই উপলব্ধি করেছি, এবং সেই উপলব্ধির বেদনায় নিজের
আত্মপ্রসাদ কিছু মেশানো ছিলো কিনা তা বোঝবার শক্তি তখন ছিলো না।
করুণার স্মৃতি যখন ম্লান হয়ে এসেছে তখনও মনের কোন গোপন কোণে এ বিশ্বাস বুঝি ছিলো যে, আমি ভুললেও সে কোনোদিন ভুলতে পারবে না!
সে-বিশ্বাসে রূঢ় আঘাত পাওয়ার পরই মনের যে বিস্ময়কর প্রতিক্রিয়া শুরু হলো তাতে নিজের কাছেই নিজে কেমন একটু লজ্জিত বোধ করলাম, কিন্তু তবু আত্মসংযম করতে পারলাম না।
করুণা খানিক বাদে যখন আমার ঘরে এলো তখন আমার আচরণে ও কথায় একটা সূক্ষ্ম পরিবর্তন চেষ্টা করলে হয়তো সেও লক্ষ্য করতে পারতো।
