জবাবটা অজয়ই দেয়, বিকেল তো…হয়ত এদিকে ওদিকে কোথাও আছে—
ঝপ করে পকেট থেকে খয়েরি রঙের একটা পারস্ টেনে আনে। টাকার খোপটায় আঙুল ঢুকিয়েই একটা দশটাকার নোট বের করে। তারপর নানীর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে, ছেলের জন্য কিছু আনা উচিত ছিল। কিন্তু এমন আচমকা দেখা হয়ে গেল..যা গে টাকাটা দিয়ে ওকে মিষ্টিমুখ করাবেন
যেমন এসেছিল তেমনিই আবার বেরিয়ে গেল। কিন্তু যাবার মুখে রেখে গেল একটা লোলুপ চাহনি। একটা বুককাঁপানো হাসি। আর টাটকা গোলাপের মতো কিছু মিষ্টি কথাবার্তা।
এ গলিতে চাপা হাসি উঠল। তবে হাসিটা আর দেখল না—বনানী ভাবছিল, কতক্ষণে অজয় ফিরবে। দশটা টাকা-! তার মানে দুদিন অন্তত নিশ্চিন্ত…অন্তত খানিকটা নিষ্কৃতি পাওয়া যাবে!
কিন্তু এত সহজে যে পাওয়া যায় না বনানী অন্তত সেটা জানত না। পরের দিন, দুপুরের দিকে বনানী সবে চান করে এসে ঘরে ঢুকে কাপড় ছাড়ছে এমন সময় সে এসে হাজির–।
অজয় আছিস নাকি?
গলার স্বরেই বনানী চমকে ওঠে। কোনোরকমে শাড়িটা পরেই ছুটে যায়। দরজা খুলে বলে, ও তো নেই…বেরিয়েছে একটু–
বেরিয়েছে—! কাল বলছিল একটা চাকরির কথা…কারখানা নাকি বন্ধ হয়ে পড়ে আছে…তা ব্যবস্থা একটা মোটামুটি করতে পেরেছি–
আসুন না ভেতের আসুন—
একরাশ গন্ধ নিয়েই সে ভেতরে ঢুকল।—ঐ বুঝি ছেলে?
হ্যাঁ—
নাম কি তোমার?
–বুম্বা, নাম বল–।
একটা কাগজের প্যাকেট নিয়ে খেলছিল এতক্ষণ সেটা সরিয়েই বুম্বা নামটা বলল। সে খুশি : বাহ বেশ নাম–
এবং খুশির সঙ্গে সঙ্গেই পকেটে হাত ঢোকাল। একটা টফির বাক্স বের করে এনে বুম্বার হাতে দিয়ে বলল, নাও…এটা কি বল তো?
ত….ফি! বুম্বার মুখ হাসিতে ভরে উঠল। বনানী মৃদু ক্ষোভ জানায়, আবার এসব আনতে গেলেন কেন বলুন তো…আমাদের ঘরে এসব মানায়—তাতে কী হয়েছে মানুষটি বলল, কাল এসে দেখা পাইনি—তা আজ দেখা হবে জেনেও কী খালি হাতে আসব নাকি!..যাক্ গে, এক গেলাস জল দিন তো দেখি—
বনানী বলে, চা খাবেন কি?
নানা এখন নয়…আরেক দিন বলে ঠোঁটের কোণে আচমকা এক বিচিত্র হাসি ফুটে ওঠে তার।
বনানীর বুকের রক্ত হিম হয়ে যায়। চটপট জল এনে দিতেই সে খেয়ে বলে, ঠিক আছে…তাহলে চলি…অজয়কে বলবেন যেন কালই দেখা করে।
বুম্বাকে বলে হাত নেড়ে মানুষটি উঠল।
হাসতে ইচ্ছে করে না বুও যেন জোর করেই হাসল বনানী; নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধেও যেন দরজা পর্যন্ত তাকে এগিয়ে দিল।
গলিতে আবারও আজ মুখ টেপাটেপি। চাপা হাসি।
.
বনানী দাঁড়িয়েছিল।
শেষ বেলার দিকে এ গলিতে যখন হুল্লোড়, চেঁচামেচি, ঠিক সে সময়ে অজয় ফিরল চুল উস্কোখুস্কো। সারা মুখে চকচকে ঘাম।
কী ব্যাপার…কোথায় গিয়েছিলে বল তা? আমি তো সেই থেকেই চিন্তায় মরি—
না না চিন্তার কিছু ছিল না—অজয়ের মুখে খুশির ঝিলিক, কাল বড়োমুখ করে কমলকে বলেছিলাম একটা চাকরির কথা…তো ও আজই একটা খবর নিয়ে এসেছে। বাড়ি ফিরছি, এমন সময় দেখা হয়ে গেল। বলল, এখানে এসেছিল..খানিকক্ষণ বসেছিল।
হ্যাঁ—আমি চা খেতেও বলেছিলাম…কিন্তু হুটপাট করে চলে গেল—
হাত তুলে জামা খুলতে খুলতে বলল অজয়, তো এই কমলই টেনে নিয়ে গেল রাস্তা থেকে। চাকরিটা যেখানে ঠিক করেছে একদম সেখানেই নিয়ে গেল–
কিসের চাকরি গো! বনানীর চোখেও খুশির ছোঁয়া; অজয়ের হাত থেকে ঘামে ভেজা জামাটা নিয়ে দেওয়ালের হুকে টানিয়ে দিয়ে বলল, আগের মতোই ওয়েল্ডারের চাকরি–
আরে না–না—! লুঙি গুটিয়ে ভেতরের মেঝেতে ততক্ষণে টান টান হয়ে পড়েছে অজয়; জানাল, এক কন্ট্রক্টারের কাজ দেখাশোনা করার কাজ। মাইনে কিন্তু মন্দ দেবে না…মাস গেলে এখন ছ শ করে…পরে বাড়াবে; তবে কমল বলছিল, কিছুদিন কর না তারপর আমি ভালো কিছু একটা করে দেব—
উঠে বসে অজয় একটা বিড়ি ধরায়। এক রাশ ধোঁয়া ছেড়ে বলে সত্যি ও না থাকলে আজ পথে বসতে হত। যা উপকার করল না আজ।
তা সত্যি বনানী সমর্থন জানায়, তবে তোমার বন্ধুটির একটু দোষ আছে। বড়ো বেশি গায়েপড়া স্বভাব….
ঠিক তা নয়—অজয় বিড়িতে টান মারে, বড়লোকের ছেলে..একটু বেশি খোলামেলা। আমি তো ভাবছি প্রথম মাইনে পেয়েই ওকে একদিন খেতে বলব…
একটা চিরুনি নিয়ে বসেছিল বনানী। চুল আঁচড়ে সেই চুলই ফিতে দিয়ে বাঁধতে অনেকদিন পর আজ মনের আকাশ থেকে খানিকটা মেঘ কেটে গেছে। মনটাও তাই সদ্য ওঠা রোদের মতোই ঝলমলে;
হঠাৎ খেয়াল হয় অজয়ের।—ভালো কথা বুম্বা কোথায় গেছে?
ঐ তো ও ঘরের মিনতি এসে নিয়ে গেল…
এই মেয়েটাকে আমি একদম সহ্য করতে পারি না—অজয়ের গলায় ঘেন্নার সুর-এরই মধ্যে দুদুবার পেট খসিয়েছে জানো–
বনানী চমকে ওঠে। শব্দটা খুচ করে গিয়ে ওর মাথার ভেতরে বসে যায়; এদিকে ওদিকে তাকিয়ে বলে, আঃ কী হচ্ছে কী-I কে কী করছে তা তোমার কী দরকার—
দাঁড়াও না একটু ঠিকঠাক হয়ে বসি তোমাদের নিয়ে আমি অন্য কোথাও উঠব। এই নরককুণ্ডে মানুষ থাকে–!
গামছাটা টেনে নিয়ে বনানী উঠল। অনেকদিন পর আজ একটু ভালো করে গা ধাবে।
বেরিয়ে যাচ্ছিল, অজয় বলল তাড়াতাড়ি এসো আমি যাব এরপর–
বনানী বেরোয়। গলার ভেতরে একটা গুনগুন আওয়াজ। চোখ জোড়া হাসছে। তরঙ্গের তা নজর এড়ায় না। কাছাকাছি আসতেই জিজ্ঞেস করে, কী ব্যাপার আজ এত খুশির জোয়ার…
